বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তর। দেশের হাসপাতাল, সংসদ ভবন, সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত কাজের দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের হাতে। অথচ এখানেই দীর্ঘদিন ধরে চলছে অনিয়ম, ঘুষ ও দুর্নীতির মহোৎসব। এর অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছেন শেরেবাংলা নগর-১ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী লতিফুল ইসলাম।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ছিলেন প্রভাবশালী ও দাপুটে কর্মকর্তা। ঘুষ, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। একাধিক মামলার আসামি হলেও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। সহকর্মীরা তাঁকে ডাকেন “মিস্টার ১৫%” নামে।
সরকারি কর্মকর্তা হয়েও লতিফুল ইসলাম ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ। আওয়ামী লীগের পতিত সরকারের সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের ছত্রছায়ায় তিনি হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবেই তাঁকে শেরেবাংলা নগর-১ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে বসানো হয়।
তাঁর উত্থানকে ঘিরে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, “এখানে যোগ্যতা নয়, ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্যই পদোন্নতির আসল মাপকাঠি ছিল।”
২০২৫ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় দেশজুড়ে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করা হলেও, পর্দার আড়াল থেকে অর্থ ও রসদ সরবরাহ করেন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা। তাদের একজন ছিলেন লতিফুল ইসলাম।
সূত্র জানায়, তিনি কোটি কোটি টাকা খরচ করে আন্দোলনকারীদের দমনে সহায়তা দেন। শুধু অর্থ নয়, বিভিন্নভাবে হামলাকারীদের লজিস্টিক সহায়তাও জোগান দেন। এর প্রমাণ হিসেবে আদালতে ৯৭ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় তাঁর নাম সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
রাজধানীর বাড্ডা থানায় সি আর ৬৩/২৫, এফআইআর নং-০৬, তারিখ ০৩ মার্চ ২০২৫ মামলায়ও তাঁর নাম রয়েছে। কিন্তু মামলার পরও তিনি গ্রেপ্তার তো দূরের কথা, এখনো দাপটের সঙ্গে অফিস করছেন।
লতিফুল ইসলামের অধীনে শেরেবাংলা নগর এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর সংস্কার ও নির্মাণ কাজ হতো। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং সংসদ ভবন।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পে তিনি টেন্ডার কারসাজি করেছেন নিয়মিতভাবে। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্রের তথ্য গোপন রাখা, অতিরিক্ত দামে প্রাক্কলন তৈরি এবং জুনিয়র কর্মকর্তাদের জোর করে স্বাক্ষর করানো ছিল তাঁর কাছে স্বাভাবিক ঘটনা।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানান, “যেখানে প্রকল্পের খরচ ১০ কোটি টাকা হওয়ার কথা, সেখানে ১৫ কোটি টাকার প্রাক্কলন বানানো হতো। সেই অতিরিক্ত টাকার বেশিরভাগ চলে যেত তাঁর পকেটে।”
লতিফুল ইসলাম শুধু ঢাকাতেই নয়, খুলনায় দায়িত্বে থাকাকালেও একই ধরনের অভিযোগে জড়িত ছিলেন। স্থানীয় প্রকৌশলীরা জানান, তিনি সেখানে নানা প্রকল্পে অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন।
তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কারণ, তিনি ছিলেন “উপর মহলের” আস্থাভাজন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় লতিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে কেউ ব্যবস্থা নিতে সাহস পান না। অভিযোগ রয়েছে, শামীম আখতারের সঙ্গে তাঁর সখ্যতার কারণে সব অনিয়ম ধামাচাপা পড়ে যায়।
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদেরও তিনি বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে রেখেছেন। ফলে তাঁর অপকর্মগুলো গোপন থাকে, আর তিনি নির্বিঘ্নে ঘুষ–দুর্নীতি চালিয়ে যান।
রাজধানীর পল্টন, রামপুরা ও সাভার থানায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও তাঁর নামে মামলা চলছে। তবুও তিনি বহাল তবিয়তে অফিস করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাশালী মহলের সঙ্গে আঁতাত থাকার কারণেই তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
সহকর্মীরা জানান, গণপূর্তের ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রতিটি কাজের অন্তত ১৫% কমিশন না নিলে কোনো নথি এগোত না। এজন্যই তিনি “মিস্টার ১৫%” নামে কুখ্যাত হন।
একজন কর্মকর্তা বলেন, “কোনো কাজের বিল ছাড় করতে হলে প্রথমেই হিসাব করতে হতো—কত টাকা মিস্টার ১৫% কে দিতে হবে।”
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন আবার ভিন্ন রাজনৈতিক আনুগত্য দেখাচ্ছেন লতিফুল ইসলাম। সূত্র জানায়, বর্তমানে তিনি বিএনপি ঘেঁষা হয়ে উঠেছেন এবং নিজেকে নতুন ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করছেন।
এমন রাজনৈতিক রঙ বদলের অভিযোগ আগেও তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আনুগত্যও বদলে যায়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা নিয়ম মেনে কাজ করি, কিন্তু লতিফুল ইসলামের মতো দাপুটেরা সবকিছু নষ্ট করে দেন। দুর্নীতি না করলে এখানে টিকে থাকা যায় না।”
তাঁদের দাবি, দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের বিচার না হলে পুরো অধিদপ্তরই ভেতর থেকে ভেঙে পড়বে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, লতিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা আছে। তদন্তও চলছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে তলব করা হয়নি।
দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, “তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ জোরালো। তবে আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগছে।”
এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী লতিফুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায়ও কোনো উত্তর দেননি।
গণপূর্ত অধিদপ্তর রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। অথচ এখানকার কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে দুর্নীতি ও অনিয়মকে পদ্ধতিগতভাবে চালু করেছেন।
নির্বাহী প্রকৌশলী লতিফুল ইসলাম তার অন্যতম উদাহরণ। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে তিনি শুধু সম্পদের পাহাড় গড়েননি, ছাত্র আন্দোলন দমন থেকে শুরু করে হত্যা মামলায়ও জড়িয়ে পড়েছেন। অথচ তিনি এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এমন প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজরা কবে বিচারের মুখোমুখি হবেন?
সংবাদ শিরোনাম ::
একাধিক মামলার আসামি হয়েও বহাল তবিয়তে
গণপূর্ত প্রকৌশলী লতিফুল ইসলাম ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদের মালিক
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৮:৩৪:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- ৭০৪ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ























