ছাগলে ক্ষেত খাওয়া নিয়ে বিরোধের জেরে আদিতমারীতে একটি পরিবারের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বসতবাড়িতে দলবদ্ধভাবে প্রবেশ করে মা ও ছেলের বউকে মারধর, লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আহত করা এবং এক গৃহবধূর গালে কামড় দিয়ে মাংস ছিঁড়ে নেওয়ার অভিযোগে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া হামলার সময় ঘরের তোষকের নিচে দোকান কেনার জন্য গচ্ছিত রাখা নগদ আড়াই লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
আজ বুধবার (৪ নভেম্বর ২০২৬) লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব ভেলাবাড়ী গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। গত ২ নভেম্বর, সোমবার সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য মো. মমিনুল হক (৩৪), পিতা মৃত আনোয়ার হোসেন, পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর লিখিত এজাহার দাখিল করেছেন।
ছাগলের ক্ষেত খাওয়া নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত
থানায় দাখিল করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্তদের পালিত ছাগল প্রায়ই অভিযোগকারীর পরিবারের রোপণ করা শাকসবজির ক্ষেত নষ্ট করত। এ নিয়ে একাধিকবার নিষেধ করা হলেও ছাগল বেঁধে না রাখায় দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে ছাগলে ক্ষেত খাওয়াকে কেন্দ্র করে অভিযোগকারীর মা মোছা. মোছহেলা বেগমের সঙ্গে অভিযুক্তদের কয়েকজনের কথা-কাটাকাটি ও তর্কবিতর্ক হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
সন্ধ্যায় লাঠিসোঁটা নিয়ে বাড়িতে প্রবেশের অভিযোগ
এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, বিকেলের বিরোধের জের ধরে একই দিন সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে অভিযুক্তরা লাঠিসোঁটা নিয়ে দলবদ্ধভাবে অভিযোগকারীর বসতবাড়ির উঠানে অনধিকার প্রবেশ করেন।
এ সময় অভিযোগকারীর মাকে উদ্দেশ করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে গালিগালাজের প্রতিবাদ করায় অভিযোগকারীর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী মোছা. জান্নাতি বেগমের (২৪) ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
গৃহবধূকে মারধর ও গালে কামড় দেওয়ার অভিযোগ
এজাহারে বর্ণিত অভিযোগ অনুযায়ী, জান্নাতি বেগমকে পরনের কাপড় ধরে টানাহেঁচড়া করে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে তাঁকে বাঁশের লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। এতে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছিলাফোলা ও আঘাতের সৃষ্টি হয়।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, গৃহবধূ মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় একজন অভিযুক্ত তাঁর ডান পাশের ঠোঁটসংলগ্ন গালে কামড় দেন। এতে তাঁর গাল রক্তাক্ত জখম হয় এবং মাংস ছিঁড়ে যায় বলে অভিযোগকারী উল্লেখ করেছেন।
ছেলের বউকে বাঁচাতে গিয়ে আহত শাশুড়ি
চোখের সামনে ছেলের বউকে মারধর করতে দেখে তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন অভিযোগকারীর মা মোছা. মোছহেলা বেগম। অভিযোগ, তিনিও হামলার শিকার হন।
এজাহারে বলা হয়েছে, একজন অভিযুক্ত বাঁশের লাঠি দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে দুই হাত দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করলে তাঁর হাতের তালুর বিপরীত পাশে গুরুতর ফাটা ও রক্তাক্ত জখম হয়।
এভাবে একই পরিবারের মা ও ছেলের বউ দুজনই হামলায় আহত হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তোষকের নিচে রাখা আড়াই লাখ টাকা চুরির অভিযোগ
মারধরের ঘটনার পাশাপাশি এজাহারে অর্থ চুরির অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগকারী মমিনুল হকের দাবি, হামলার একপর্যায়ে একজন অভিযুক্ত তাঁদের বসতবাড়ির উত্তর পাশের ঘরে প্রবেশ করে তোষকের নিচে রাখা দোকান কেনার জন্য গচ্ছিত নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে যান।
পরিবারের দাবি, ভবিষ্যতে দোকান কেনার পরিকল্পনার জন্য তাঁরা ওই টাকা জমিয়ে রেখেছিলেন। তবে টাকা চুরির অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
চিৎকার শুনে এগিয়ে আসেন প্রতিবেশীরা
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আহতদের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
পরে অভিযোগকারী বাড়িতে এসে তাঁর মা ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর আহত অবস্থা দেখতে পান। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাঁদের মোটরসাইকেলে করে আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করেন।
এজাহার দাখিলের সময় দুই নারীই চিকিৎসাধীন ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে পাঁচজনের নাম উল্লেখ
লিখিত অভিযোগে যাঁদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাঁরা হলেন—মো. এরশাদ হোসেন (৩০), মো. আব্দুর রহমান বাবুল (৫০), মোছা. ছাবিনা বেগম (২৮), মোছা. দুলালী বেগম (৪৫) ও মোছা. আরজিনা বেগম (২২)।
এজাহারে তাঁদের সবার ঠিকানা পূর্ব ভেলাবাড়ী গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ড, ভেলাবাড়ী ইউনিয়ন, আদিতমারী, লালমনিরহাট উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সাক্ষী হিসেবে মো. শাহারবানু বেগম (৫০), মোছা. রহিমা বেগম (৪৫) ও মো. বাদশা মিয়ার (৪২) নাম উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারী।
বিচারের অপেক্ষায় ভুক্তভোগী পরিবার
অভিযোগকারী মমিনুল হক এজাহারে উল্লেখ করেছেন, আহত মা ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর চিকিৎসার কাজে ব্যস্ত থাকায় থানায় অভিযোগ দায়ের করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। পরে তিনি আদিতমারী থানার ওসি বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান।
ভুক্তভোগী পরিবারের প্রত্যাশা, ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, হামলা ও অর্থ চুরির অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের বক্তব্যের অপেক্ষা
এ বিষয়ে আদিতমারী থানা পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য এখনো জানা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া গেলে সংবাদে তা যুক্ত করা হবে।
একটি ছাগল শাকসবজির ক্ষেত খাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ, এরপর বাড়িতে প্রবেশ করে হামলা, দুই নারীকে আহত করা এবং আড়াই লাখ টাকা চুরির অভিযোগ—পুরো ঘটনাটি এখন এলাকায় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: সংবাদটি থানায় দাখিল করা লিখিত এজাহারে উল্লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তৈরি। অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো তদন্তসাপেক্ষ। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়ার আগে অভিযুক্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।
মো. মিজানুর রহমান-লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি 



















