চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং ১ শতাংশ করের প্রকল্পে ১ কোটি ১৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত বৃহস্পতিবার দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন বাদী হয়ে মামলা দুটি করেন। আসামিদের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক সদস্য ও সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী রয়েছেন।
দুদক সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১ নম্বর করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাস্তবায়িত অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) প্রকল্প এবং ২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরের ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ করের প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এই অর্থ আত্মসাতের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দুটি খাতের ৯০টি প্রকল্পে মোট ১ কোটি ১৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ইজিপিপির ৩৫টি প্রকল্পে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং ১ শতাংশ করের ৫৫টি প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ইজিপিপির মূল উদ্দেশ্য কর্মক্ষম অতিদরিদ্র মানুষের জন্য স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও তাঁদের আয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হলেও, করেরহাট ইউনিয়নের প্রকল্পগুলোতে শ্রমিক নির্বাচনের ক্ষেত্রেই ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। প্রকল্পের তালিকাভুক্ত প্রায় ৫৮ জন শ্রমিকের জবানবন্দি ও ব্যাংক হিসাব বিশ্লেষণ করে নানা অসংগতি পায় সংস্থাটি। মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও ইউপি সদস্যদের দিনমজুর শ্রমিক হিসেবে দেখিয়ে তাঁদের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়েছে বলে দুদকের অভিযোগ।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট নথিতে মৃত ব্যক্তি হিসেবে নাসির আহাম্মদ, মো. হারুন, মো. মোস্তফা, হাসনা বানু, রতন ত্রিপুরা, মো. খুরশেদ আলম ও হাসিনা বেগমের নাম রয়েছে। এ ছাড়া প্রবাসী হিসেবে পাওয়া গেছে মো. লিটন মিয়া, মো. তারেক ও ইলিয়াসের নাম। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের নামেও প্রকল্পের শ্রমিক হিসেবে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং টাকা জমা ও উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। ভুয়া চেক ও টিপসই ব্যবহার করে এসব হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন করা হয়।
দুদক জানায়, প্রকৃত শ্রমিকদের ব্যাংকে নিয়ে টিপসই দিয়ে হিসাব খোলা হলেও তাঁদের দিয়ে সর্বোচ্চ চার-পাঁচ দিন কাজ করানো হতো। শ্রমিকদের কেউ কেউ মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকা পেয়েছেন এবং অনেকেই সর্বোচ্চ দুবারের বেশি ব্যাংকে গিয়ে টাকা তোলেননি বলে জানিয়েছেন। ব্যাংক হিসাবের বিবরণী বিশ্লেষণে শ্রমিকদের ৯০ শতাংশের বেশি হিসাবের ক্ষেত্রে প্রায় ৭২ হাজার টাকা করে জমা ও উত্তোলনের তথ্য পেয়েছে দুদক। একটি মামলায় করেরহাট ইউনিয়নে বাস্তবায়িত ৩৫টি ইজিপিপি প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পগুলোর অনুমোদনকারী হিসেবে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান মো. এনায়েত হোসেন নয়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মিলন বড়ালের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি ছিল বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
অন্য মামলায় স্থানীয় সরকার বিভাগের স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্প ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত কাজ ইজিপিপি ও ইউনিয়ন পরিষদের করের প্রকল্পের কাজ হিসেবে দেখানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। ওই মামলায় ইজিপিপির পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ করের প্রকল্পেও অনিয়মের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক। মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত ৫৫টি প্রকল্পের প্রায় সবকটির ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
দুই মামলার আসামিরা হলেন করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. এনায়েত হোসেন নয়ন, সাবেক ইউপি সদস্য কল্পনা রানী চক্রবর্তী, শেলী মজুমদার, তাহেরা বেগম, মো. আবু তাহের (মাস্টার), মো. শহীদ উল্লাহ, মো. বেলাল উদ্দিন, ফেয়ার মিয়া মিন্টু, মো. মহিউদ্দিন, মো. সফি আহাম্মদ, মো. আজাদ উদ্দিন, কোরবান আলী এবং সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মিলন বড়াল।
মামলার বাদী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করা হয়েছে।
বিশেষ প্রতিনিধি 























