বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান ‘পদ্মা অয়েল পিএলসি’-র এভিয়েশন বিভাগে দীর্ঘ দিন ধরে একটি প্রভাবশালী অনিয়ম, দুর্নীতি ও তেল চুরির সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেন্দ্রিক এই সিন্ডিকেটের মূল নেতৃত্বে রয়েছেন এভিয়েশন বিভাগের ম্যানেজার মো. হামিদুল্লাহ সাদেক এবং পদ্মা অয়েলের ঢাকা অঞ্চলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এম এম মজিবুর রহমান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পদ্মা অয়েলে প্রতি তিন বছর পর পর কর্মকর্তাদের বদলির নিয়ম বা বাধ্যবাধকতা থাকলেও মো. হামিদুল্লাহ সাদেক ২০০৫ সালের ১ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যোগদানের পর থেকে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে একই স্থানে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুদুর রহমানকে ব্যবহার করে তিনি এই দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
অভিযোগ রয়েছে, অসাধু ট্যাংকলরি চালকদের সাথে যোগসাজশ করে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার জেট এ-১ (উড়োজাহাজের জ্বালানি) তেল চুরি করছেন হামিদুল্লাহ সাদেক। দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়ার আগে যদি এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের পদায়ন না করা হয়, তবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। এমনকি সরবরাহ ব্যবস্থা জিম্মি করে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য চক্রান্ত চলছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
পূর্বে ৭২ হাজার লিটার জেট এ-১ ফুয়েল চুরির ঘটনার সময় ডিজিএম (এভিয়েশন) পদে দায়িত্বরত ছিলেন এম এম মজিবুর রহমান। একাধিক গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং গ্রেফতারকৃতদের জবানবন্দিতে তেল চুরিতে তার সরাসরি মদদের বিষয়টি উঠে আসে। তবে শাস্তি পাওয়ার বদলে ‘অদৃশ্য’ কারণে তাকে ডিজিএম (ঢাকা) হিসেবে বদলি করে কার্যত পুরস্কৃত করা হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ম্যানেজ করে এবং বিপিসি ও মন্ত্রণালয়ে তদবির চালিয়ে সাদেকের ঢাকার বাইরে বদলি আটকে দেন তিনি। এমনকি সম্প্রতি বদলি ঠেকাতে শাহজালাল বিমানবন্দর অফিসের ভেতরেই এক সেকশন থেকে অন্য সেকশনে দায়িত্ব অদলবদল করা হয়েছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজার বিমানবন্দরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইন্সে জ্বালানি সরবরাহ করে পদ্মা অয়েল। কিন্তু এভিয়েশন বিভাগের প্রয়োজনীয় রিফিউলিং হোস পাইপ, রিফিউলিং কাপলিং, গেইট ভালভ এবং বিভিন্ন ফিল্টার সরবরাহে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন সাদেকের ব্যবসায়িক অংশীদার আরিফ হোসাইন।
এছাড়া, বিভিন্ন মামলার আসামি ও স্থানীয় ক্যাডার বাহিনীর সাথেও মো. হামিদুল্লাহ সাদেকের তেল চুরি সিন্ডিকেটের সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে বলে জানা যায়। এই চক্রের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে যারা প্রতিবাদ করেছেন, তাদের চট্টগ্রাম, সিলেট বা কক্সবাজারে বদলি করে হয়রানি করা হয়েছে।
এভিয়েশন বিভাগে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সাদেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অপারগতা প্রকাশ করছেন। বর্তমান ডিজিএম (এভিয়েশন) প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মকর্তাদের দাবি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করে আইনানুগ ব্যবস্থা না নিলে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















