ক্যান্সার, হৃদ্রোগ ও চোখের চিকিৎসায় অসহায় মানুষ; গণশুনানিতে ১২ জনকে আর্থিক সহায়তা
কারও ক্যান্সারের চিকিৎসা অর্থের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কেউ চোখের ছানি অস্ত্রোপচার করাতে পারছেন না। কেউ অসুস্থ স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আবার কারও দুশ্চিন্তা ছোট বোনের বিয়ের খরচ। নানা সংকট নিয়ে তাঁরা এসেছিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানিতে। তাঁদের প্রত্যেকের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। অসহায় মানুষের দুর্দশার কথা শুনে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে আবেদনপত্রের আনুষ্ঠানিক ভাষার আড়ালে উঠে আসে অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। চিকিৎসা, সংসারের ব্যয় ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনে বিপর্যস্ত এসব মানুষের কাছে গণশুনানিটি হয়ে ওঠে নিজেদের সংকট সরাসরি তুলে ধরা এবং সহায়তা পাওয়ার একটি সুযোগ।
জন্মগতভাবে দুই পায়ে ত্রুটি নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন শেফালীকা নাহার। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না, চলাফেরায় অন্যের সাহায্য নিতে হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর সংকট আরও বেড়েছে। ছেলে অসুস্থ ও বেকার। পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় অন্যের সহযোগিতায় দিন কাটে তাঁর। নিজের চিকিৎসার জন্য ২০ হাজার টাকা সহায়তা চেয়ে আবেদন নিয়ে গণশুনানিতে হাজির হয়েছিলেন তিনি।
একই শুনানিতে এসেছিলেন বাউলশিল্পী নান্টু দেবনাথ। গান গেয়ে যে আয় হতো, তা দিয়েই চলত তাঁর সংসার। এখন ক্যান্সারের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ধারদেনায় জর্জরিত তিনি। অর্থের অভাবে পরবর্তী চিকিৎসা বন্ধ থাকার কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে সহায়তা চেয়েছেন নান্টু। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা সম্পন্ন করতে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন।
সন্তানের ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য আবেদন নিয়ে এসেছিলেন দিনমজুর মো. সুজনও। ধারদেনা করে ছেলেকে দুই দফা কেমোথেরাপি দিলেও পরবর্তী চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে পারছেন না তিনি। বিধবা দিলোয়ারার উদ্বেগ চার ছেলেকে নিয়ে সংসার চালানো এবং এক ছেলের পেটের টিউমারের চিকিৎসা। আর্থিক অনটনে সন্তানের চিকিৎসা করাতে না পেরে তিনিও জেলা প্রশাসকের দ্বারস্থ হন।
গণশুনানিতে আসা মোহাম্মদ হারুনুর রশিদের জীবনেও রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। ২১ বছর ওমানে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন তিনি। দেশে ফিরে এখন নিজের হৃদ্রোগ ও স্ত্রীর ডায়াবেটিসের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। পাঁচ সদস্যের সংসারে পর্যাপ্ত আয় না থাকায় চিকিৎসা ও দৈনন্দিন খরচ একসঙ্গে সামলাতে পারছেন না।
এ কে এম ফজলুল হকের দুর্ভোগের শুরু ২০১৩ সালের একটি সড়ক দুর্ঘটনায়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর ডান পায়ে স্টিলের পাত বসানো হয়েছিল। এখন সেই পাত অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নেই। পায়ের যন্ত্রণা ও কাজ করতে না পারার কষ্ট নিয়ে তিনিও এসেছিলেন সহায়তার আশায়।
বয়োবৃদ্ধ পারুল বেগমের প্রয়োজন চোখের ছানি অস্ত্রোপচার ও লেন্স প্রতিস্থাপন। তাঁর স্বামীও অসুস্থ। ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করা এই নারীর পক্ষে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, আলসারে আক্রান্ত শয্যাশায়ী স্বামীর চিকিৎসার সহায়তা চাইতে এসেছিলেন মনোয়ারা বেগম। দুই সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের ভরণপোষণ ও স্বামীর চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি।
নিজের অসুস্থতা ও চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে না পেরে সহায়তার আবেদন নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন ও মুহাম্মদ দস্তগীর চন্দনপুরীও।
চিকিৎসার আবেদনের পাশাপাশি ছিল পারিবারিক দায়িত্ব পালনে সহায়তার আবেদন। রিকশাচালক নাজমুল হকের ছোট বোনের বিয়ে আগামী ৬ নভেম্বর। অল্প আয়ে সংসার চালানোর পর বিয়ের প্রয়োজনীয় খরচ জোগাড় করতে না পেরে তিনিও সাহায্য চেয়েছেন।
এসব আবেদনকারীর প্রয়োজন ও সংকট আলাদা হলেও তাঁদের সবার প্রত্যাশা ছিল একই—কেউ তাঁদের কথা শুনুক, দুর্দিনে পাশে দাঁড়াক। জেলা প্রশাসক আবেদনকারীদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে তাঁদের দুর্ভোগের বিবরণ শোনেন এবং অসুস্থ ও অসহায় ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বুধবারের গণশুনানিতে সরাসরি ২৪ জন এবং অনলাইনে পাঁচজন প্রবাসী অংশ নেন। তাঁদের অভিযোগ ও আবেদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। এদিন অসুস্থ ও অসহায় ১১ জনকে এবং মেয়ের বিয়ের জন্য একজনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
ক্যান্সারের দীর্ঘ চিকিৎসা কিংবা একটি অসচ্ছল পরিবারের সব সংকট এককালীন সহায়তায় মিটে না গেলেও জরুরি মুহূর্তে পাওয়া সহযোগিতা অসহায় মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। গণশুনানিতে মানুষের দুর্দশার কথা শোনা এবং তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ প্রশাসনের জনসেবামূলক ভূমিকারই একটি দৃষ্টান্ত।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















