রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের হিসাব বিভাগের (এফএএন্ডসিও) দপ্তরকে ঘিরে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের পারিবারিক পেনশন সংক্রান্ত অর্থ পরিশোধে নানাবিধ দুর্নীতি, হয়রানি এবং ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পে-ফিক্সেশন থেকে শুরু করে পেনশনের অর্থ ছাড় করানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ঘুষ লেনদেন ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের দীর্ঘস্থায়ী অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে অবসরপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী কিংবা তার মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা যখন কল্যাণ তহবিল ও পেনশনের বকেয়া টাকা তুলতে যান, তখন হিসাব বিভাগের (এফএএন্ডসিও) সাইদুর রহমান এবং তার দপ্তরের হিসাব রক্ষক শেখ জামালসহ এই বিভাগের আরও কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফাইল আটকে রেখে মোটা অংকের ঘুষ দাবির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সাইদুর রহমান ও শেখ জামালের সিন্ডিকেটের লোকজন পারিবারিক পেনশন সহজীকরণের নামে কোনো ধরনের যথাযথ ওয়েলফেয়ার বা অন্যান্য কর্মকর্তার তদন্ত ছাড়াই নামে-বেনামে সরকারের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ যেন এক মগের মুল্লুক, যার প্রতিবাদ করার কেউ নেই।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলীয় হিসাব বিভাগের কিছু কর্মকর্তার হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে পেনশন দপ্তরটি সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) থেকে আকস্মিকভাবে টিএ পলোগ্রাউন্ডে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এর ফলে বয়োবৃদ্ধ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী পেনশনারদের ডাটা এন্ট্রি ও আইভাস প্লাস প্লাস সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছিল। পরে বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনা শুরু হলে দপ্তরটি পুনরায় সিআরবিতে স্থানান্তর করা হয়।
ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার চালুর পর অনেক প্রবীণ ও পারিবারিক পেনশনারদের মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত জটিলতার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা প্রদান বন্ধ হয়ে যায়। এসব টেকনিক্যাল সমস্যা সমাধান করতে গেলেও মাঠ পর্যায়ের হিসাব বিভাগের পক্ষ থেকে পেনশন দপ্তরের কর্তাদের দিকে ফাইল ঠেলে দিয়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করা হয়। ফলে পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে সেবাপ্রার্থীরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হন এবং সাইদুর ও জামাল সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে তাদের কাছে মোটা অংকের ঘুষ দাবি করা হয়।
সম্প্রতি দেশের সামগ্রিক পেনশন ব্যবস্থার অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তে সরকারি অর্থ জালিয়াতির যে প্রমাণ মিলেছে, তার সূত্র ধরে রেলওয়ের হিসাব বিভাগের বিভিন্ন অর্থবছরের বকেয়া পেনশন বিল এবং ফিক্সেশনের তথ্য পুনরায় নিরীক্ষার দাবি তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। এই অনিয়মগুলোর কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রেলওয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী এবং মৃত কর্মচারীদের বিধবা স্ত্রী ও প্রতিবন্ধী সন্তানেরা, যারা হিসাব বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খামখেয়ালিপনায় মাসের পর মাস ঘুরেও তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝে পাচ্ছেন না।
রেলওয়ের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের হিসাব বিভাগ ঘিরে পারিবারিক পেনশন সংক্রান্ত অর্থ পরিশোধে অনিয়ম বছরের পর বছর ধরে চলছে। এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পূর্বাঞ্চলের ফাইন্যান্স অ্যাডভাইজার অ্যান্ড চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার সাইদুর রহমান এবং তাঁর দপ্তরের হিসাবরক্ষক শেখ জামালসহ এই বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ কর্মচারীরা আজ পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছেন এবং তাদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, পারিবারিক পেনশন সহজীকরণের নামে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই যথাযথভাবে সম্পন্ন না করেই তারা বিভিন্ন ব্যক্তি বা পরিচয়ে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন। যারা প্রকৃত পেনশনার, তাদের দিনের পর দিন ঘোরানো হচ্ছে। মোটা অংকের ঘুষ দিলে সহজেই পেনশন মিলে যায়, কিন্তু দাবি করা টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা হয়। এভাবেই সাইদুর রহমান ও শেখ জামাল রেলের তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পারিবারিক পেনশন প্রক্রিয়ায় নিয়মানুযায়ী রেলওয়ের কোনো কর্মচারীর মৃত্যুর পর তাঁর বৈধ উত্তরাধিকারী বা নির্ধারিত সুবিধাভোগী যাতে পারিবারিক পেনশন ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা পান, সে জন্য নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে পরিচয়, উত্তরাধিকার, চাকরির নথি, প্রাপ্যতার হিসাব এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রক্রিয়ার কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের নাম করে মোটা অংকের ঘুষ দাবি করা হয়। আবার দাবিকৃত টাকা দিয়ে দিলে কোনো ধরনের তদন্ত, সুবিধাভোগীর পরিচয় নিশ্চিতকরণ কিংবা প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই ছাড়াই সব কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। অনেক সময় কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়া ভুয়া পরিচয়, অযোগ্য সুবিধাভোগী বা অননুমোদিত দাবির বিপরীতেও অর্থ পরিশোধ করা হয়ে থাকে, যা সরকারি অর্থের নিরাপত্তা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এফএএন্ডসিও দপ্তরের সব কার্যক্রম দুর্নীতি দমন কমিশন কিংবা যথাযথ কর্তৃপক্ষ দিয়ে তদন্ত করা হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
হিসাব বিভাগের এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানার জন্য এফএএন্ডসিও সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি। একই বিষয়ে হিসাবরক্ষক শেখ জামালের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম পিইঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনিও কল রিসিভ করেননি। রেলওয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এমন নীরবতা জনমনে আরও বেশি সন্দেহের সৃষ্টি করেছে এবং দ্রুত এই চক্রের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















