ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা, দাপ্তরিক কার্যক্রমে দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহার, ঘুষ বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষ ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে চরম অসদাচরণ ও দুর্ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়েও নিজের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ করা এবং বিভিন্ন মহলে ক্ষমতার অপব্যবহার করায় পীরগঞ্জ উপজেলাজুড়ে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র, ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ, শিক্ষক সমাজ এবং সরকারি একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে।
অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদারের বিতর্কিত রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার দাপট প্রদর্শন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইউএনও বিভিন্ন দাপ্তরিক বৈঠক, জনসমক্ষে এবং সম্প্রতি এক গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে আলাপকালে নিজেকে প্রকাশ্যে ‘বিএনপির স্থানীয় নেতা’ বা ‘সরকারি দলের নেতা’ হিসেবে দাবি করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন। একজন প্রজাতন্ত্রের কর্মীর এমন দলীয় আনুগত্যের ঘোষণা প্রশাসনের নিরপেক্ষ চরিত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের অভিযোগ, দলীয় পরিচয়ের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন এবং দপ্তরে আসা বিচারপ্রার্থীদের নানাভাবে হয়রানি করছেন। কোনো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানতে চাওয়া হলে কিংবা ন্যায্য প্রতিকার চাইতে গেলে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ভয় দেখিয়ে তাদের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা করেন।
উপজেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মুর্তজা আলম এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ করে বলেন, “এই ইউএনও মানুষকে মানুষ হিসেবেই গণ্য করেন না। তাঁর দপ্তরে সেবা নিতে গেলে দরজার বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর রুমে প্রবেশের অনুমতি মিললেও চেয়ারে বসার অধিকার দেওয়া হয় না, বরং সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে জেরা করা হয়। বিশেষ করে ঘুষ বা আর্থিক লেনদেন ছাড়া তাঁর দপ্তরে কোনো ফাইল নড়ে না, অথচ টাকা পেলে তাঁর আচরণ হঠাৎ পাল্টে যায়।” একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির এক নেতা জানান, শিক্ষক সমাজের সঙ্গেও তিনি অত্যন্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে থাকেন, যা পুরো শিক্ষক সমাজকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। স্থানীয় সংবাদকর্মী বাদল হোসেনের ভাষ্যমতে, “এই ইউএনও সব সময় নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডার মনে করেন এবং কথায় কথায় মানুষকে জ্ঞান দেন। অথচ খোঁজ নিলে জানা যায়, তাঁর ছাত্রজীবন কেটেছে ভিন্ন ধারার ছাত্ররাজনীতিতে।”
মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ তুলে যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা খয়রাত আলী বলেন, “স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান ছাড়া এই ইউএনও কাউকেই পাত্তা দেন না এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না। তিনি আমার মতো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গেও একাধিকবার অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেছেন।” খয়রাত আলী আরও অভিযোগ করেন যে, স্থানীয় সংসদ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে সার ডিলার নিয়োগ, টিআর (টেস্ট রিলিফ), কাবিখা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সরকারি বরাদ্দ লুটপাট করা হচ্ছে। অন্যদিকে, উপজেলা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন দপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, যোগদানের পর থেকেই সহকর্মীদের সঙ্গে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ ও গালমন্দ করার সংস্কৃতি চালু করেছেন এই কর্মকর্তা। সামান্য ত্রুটিতে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং তাৎক্ষণিকভাবে বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত করার হুমকি দেওয়ায় পুরো উপজেলা কমপ্লেক্সে এক ভীতিপ্রদ পরিবেশ বিরাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিসিএস ক্যাডার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে কোনো পেশাদার পরিবেশ নেই, চলছে একক আধিপত্য। মানসিক চাপের কারণে অফিসার্স ক্লাবেও কেউ যান না।”
আইনগত ও সাংবিধানিক দিক বিবেচনা করে ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আবু সায়েম স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ অনুযায়ী দেশের কোনো সরকারি কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না কিংবা জনসমক্ষে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় জাহির করতে পারেন না। পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এই সুনির্দিষ্ট বিধিমালাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় আনুগত্যের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন বেপরোয়া আচরণ প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের মধ্যকার আস্থার সেতুবন্ধনকে চিরতরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এমতাবস্থায় পীরগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজ, ভুক্তভোগী শিক্ষক, প্রশাসন ক্যাডারের নিগৃহীত কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষ অবিলম্বে এই বিতর্কিত ইউএনওর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















