বাতিল হওয়া সরকারি প্লটের বরাদ্দ ২৮ বছর পর পুনরুজ্জীবন, বাংলাদেশ ব্যাংকে অস্তিত্ব না থাকা চালানকে বৈধ ধরে সনদ দেওয়া, ঘুষের টাকা কর্মচারীর মাধ্যমে গ্রহণ, নিয়োগ ছাড়াই লোক দিয়ে অফিসে কাজ করানো এবং সরকারি জায়গার দোকান ও স্থাপনা থেকে ভাড়া আদায়ের অভিযোগ—জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এস্টেট) মো. নাসির উদ্দিনকে ঘিরে উঠেছে এমন একাধিক গুরুতর অভিযোগ।
২০১১ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে বদলি হয়ে আসেন তিনি। তারপর অল্প সময়ের জন্য অন্যত্র দায়িত্ব পালন করলেও দীর্ঘ সময় ধরে চট্টগ্রামেই কর্মরত রয়েছেন। এসময়ে ঘুষ ও জাল-জালিয়াতি করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামিও হয়েছেন তিনি। কাগজে-কলমে তিনি এখন ওই মামলার পলাতক আসামি।
তারপরও বর্তমানে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি একাধিক হাউজিং এস্টেট ও প্রকল্পসহ মোট ৬টি দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। এই দীর্ঘ সময়কে ঘিরেই তার বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছে প্রভাবের একটি বলয়। জাগৃক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের প্লট ও ফ্ল্যাটের নামজারি, বরাদ্দ, সরকারি জমির ব্যবস্থাপনা সবই হয় তার ইশারায়।
জাগৃক চট্টগ্রাম দপ্তরে ঘুষ লেনদেনের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে এক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা গুনে নিতে দেখা যায় জাগৃকের এক অফিস সহকারীকে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নামজারির কাজের জন্য ওই টাকা নেওয়া হয়েছিল এবং নাসিরের হয়ে টাকা গ্রহণ করেছিলেন ওই অফিস সহকারী। সংশ্লিষ্টরা টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও দাবি করেছেন, সেটি ঘুষ নয়, চালানের টাকা।
শুধু এই ভিডিও নয়, নাসিরের বিরুদ্ধে রয়েছে আরও গুরুতর অভিযোগ। হালিশহর হাউজিং এস্টেটের প্রায় দেড় কোটি টাকা বাজারমূল্যের একটি বাণিজ্যিক প্লটের ১৯৯১ সালের বাতিল বরাদ্দ প্রায় ২৮ বছর পর পুনরুজ্জীবনের প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ওই প্লটের প্রথম কিস্তি পরিশোধের যে চালান দেখানো হয়েছিল, পরবর্তী যাচাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে তার কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যমানের সরকারি সম্পত্তির বিপরীতে মাত্র ১৩ লাখ ৪৭ হাজার ৬৬৭ টাকা পরিশোধের ভিত্তিতে দায়মুক্তির প্রক্রিয়া এগোয়। এ ঘটনায় নাসিরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
এর বাইরে জাগৃকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে নিয়োগ ছাড়াই কয়েকজনকে দিয়ে কাজ করানো, তাদের বেতন-ভাতা নিজের পক্ষ থেকে দেওয়ার অভিযোগ, সরকারি জায়গায় অনুমোদনহীনভাবে গড়ে ওঠা শতাধিক দোকান থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা ভাড়া আদায়, পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাসকারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া, নিজের ও আপন বোনের নামে কক্সবাজারে ফ্ল্যাট বরাদ্দ এবং নকশার বাইরে নির্মিত ভবনের নামজারি নিয়ে আশ্বাস দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ আছে, নাসিরের মনোনীত দালাল না ধরলে প্লটের নামজারি বা অন্যান্য সেবা পেতে সেবাগ্রহীতাদের দিনের পর দিন ঘুরতে হয়।
নাসির উদ্দিন অবশ্য এসব অভিযোগের বেশির ভাগই অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, অফিসে জনবল সংকট থাকায় কয়েকজন সহযোগিতা করেন, দোকান থেকে ভাড়া আদায়ের সঙ্গে তিনি জড়িত নন, ফ্ল্যাট বরাদ্দে তিনি নিয়ম মেনেছেন এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।
ঘুষ লেনদেনের ভিডিও
জাগৃক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের একটি কক্ষ। সেখানে বসে এক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা গুণে নিচ্ছেন অফিস সহকারী হেলাল উদ্দিন। কয়েক মাস আগের ওই দৃশ্যের ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে টাকা প্রদানকারী ব্যক্তি জয়নাল। সংশ্লিষ্টদের কাছে তিনি ওই হাউজিং কার্যালয়ের দালাল হিসেবে পরিচিত। আর টাকা গ্রহণকারী হেলাল উদ্দিন জাগৃক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের অফিস সহকারী।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি নামজারির কাজের জন্য ওই টাকা নেওয়া হয়েছিল। তাদের দাবি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এস্টেট) নাসির উদ্দিনের হয়ে টাকাটি গ্রহণ করেন হেলাল। ভিডিওটির বিষয়ে হেলাল উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, এটা কোনো ঘুষের টাকা নয়। জয়নালের চালানের টাকা তিনি জমা দিয়েছিলেন। ওই টাকা জয়নাল পরিশোধ করেছেন।
তবে সরকারি কর্মচারী হয়ে অন্য ব্যক্তির চালানের টাকা কেন তিনি জমা দিয়েছেন—এ প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি হেলাল। এরপর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। আর টাকা লেনদেনের বিষয়ে জয়নালকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল ধরেননি।
নিয়োগ নেই, তবু নাসিরের অফিসে কাজ করেন তারা
জাগৃকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের এস্টেট শাখায় সান্টু নামে একজন কয়েক বছর ধরে সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। তবে তার কোনো নিয়োগ হয়নি। সরকারি কোষাগার থেকেও তিনি কোনো বেতন-ভাতা পান না। অভিযোগ রয়েছে, তার বেতন পরিশোধ করেন নাসির উদ্দিন। একই অফিসে উজ্জ্বল ও পিল্টন নামে আরও দুজন এবং কৈবল্যধাম হাউজিং এস্টেট কার্যালয়ে অনিক, সাজ্জাদ, আবু ও মিনহাজ নামে আরও চারজন নিয়োগ ছাড়াই কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের বেতন-ভাতাও নাসির বহন করেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
নিয়োগ ছাড়াই লোকজনকে দিয়ে কাজ করানোর বিষয়ে নাসির উদ্দিন বলেন, আমাদের অফিসে জনবল সংকট রয়েছে। তারা কাজে সহযোগিতা করেন। সান্টুর বিষয়টি আলাদা। তার নানি আগে ওই অফিসে কাজ করতেন। সেই সুবাদে অনেক আগে থেকেই তিনি অফিসে আসা-যাওয়া করেন এবং কাজ করেন। অন্যদের কেউ কেউ বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়মিত অফিসে আসেন।
জাগৃকের জায়গায় অবৈধ দোকান, পরিত্যক্ত ভবন মাসে লাখ লাখ টাকা ভাড়ার অভিযোগ
নগরের আকবর শাহ থানার বিশ্বকলোনি এলাকায় জাগৃকের জায়গায় সেভেন মার্কেট নামে শতাধিক দোকান গড়ে উঠেছে। কিছু কাঁচা, কিছু পাকা এসব দোকান থেকে মাসে অন্তত তিন লাখ টাকা ভাড়া ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জাগৃক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের ফটকের পাশে রয়েছে একটি দোকান।
এসব দোকানের অনুমোদন না থাকায় ভাড়ার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। অভিযোগ রয়েছে, দুই ব্যক্তির মাধ্যমে প্রতি মাসে এসব টাকা আদায় করা হয় এবং সেই টাকা নাসির উদ্দিনের কাছে পৌঁছে। বাজারটির অদূরে জাগৃকের একটি পরিত্যক্ত ভবনও রয়েছে। কয়েক বছর আগে ভবনটি ভেঙে ফেলার
নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা এখনো ভাঙা হয়নি। বর্তমানে সেখানে অন্তত ৩০টি পরিবার বসবাস করছে। ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারী এসব পরিবারের কাছ থেকেও নাসির টাকা আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিজের ও বোনের নামে কক্সবাজারে ফ্ল্যাট
কক্সবাজারের কলাতলী মোড়ে সরকারি জায়গায় জাগৃক নির্মিত একটি ভবনে ৪৬৯টি আবাসিক ফ্ল্যাট রয়েছে। ওই ভবনের ৭৫০ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট (এফ/৫) নীলা রহমান নামে এক নারীকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি নাসির উদ্দিনের আপন বোন।
অভিযোগ রয়েছে, অন্যান্য কোটায় তাকে ফ্ল্যাটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সহজ কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগও দেওয়া হয়। একই ভবনে একটি ফ্ল্যাট নাসির উদ্দিন নিজেও বরাদ্দ পেয়েছেন। অথচ তিনি ওই ফ্ল্যাট বরাদ্দ কমিটির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এ ছাড়া রাঙামাটির নানিয়ারচর সদর উপজেলার থানার পাশে নাসির উদ্দিন একটি অত্যাধুনিক বাড়ি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার শ্বশুরবাড়ি দিনাজপুর সদর উপজেলার রানীগঞ্জ এলাকায়ও তিনতলা বাড়ি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
নকশার বাইরে ভবন, পরবর্তীতে যোগসাজশে হয় নামজারি
চট্টগ্রাম নগরের পূর্ব ফিরোজশাহ আবাসিক এলাকার এ ব্লকের ৫৫ নম্বর প্লটে হেভেন মাউনটেন নামে গৃহায়ণের জায়গায় একটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। সিডিএ অনুমোদিত নকশায় ভবনটির প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন ১ হাজার ১২৩ বর্গফুট। কিন্তু ভবনের সামনে ঝোলানো সাইনবোর্ডে ১ হাজার ৭১৫, ১ হাজার ৭৩৫ ও ১ হাজার ৮২৫ বর্গফুটের ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নাসির উদ্দিনের কাছে নামজারির আশ্বাস পেয়ে নকশাবহির্ভূত এসব ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছে। এর আগে পাশের ৫৪ নম্বর প্লটে চারতলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। পরে ভবনটির নামজারিও করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
হালিশহর হাউজিং এস্টেটের ‘এ’ ব্লকের ২ নম্বর রোডের ২ নম্বর লেনের ৬ নম্বর বাণিজ্যিক প্লটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। ১৯৯০ সালের ২৭ আগস্ট প্লটটির নিলামে অংশ নেন মোহাম্মদ আলম। সাতজনের মধ্যে তিনি সর্বোচ্চ দরদাতা হন। পরে ১৪ নভেম্বর তার নামে বরাদ্দপত্র জারি হয়। এককালীন মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ৮০ হাজার ৮৭৭ টাকা এবং কিস্তিতে ৩ লাখ ৩ হাজার ৩৪৮ টাকা। প্রথম কিস্তি ছিল ৯৩ হাজার ৬২৬ টাকা।
বরাদ্দপত্রের শর্ত অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে ওই টাকা পরিশোধ না করলে বরাদ্দ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ করা হয়নি। এ কারণে ১৯৯১ সালের ২০ ডিসেম্বর হাউজিং বরাদ্দকরণ কমিটির সভায় প্লটটির বরাদ্দ বাতিল এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।
এরপর প্লটটি অনিবণ্টিত হিসেবে নথিতে ছিল। ২০০৭ সালের জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের তালিকাতেও প্লটটি অনিবণ্টিত ও অবৈধ দখলে থাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১০ সালে প্লটটি পুনরায় বরাদ্দের জন্য সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়। এর মধ্যেই ২০০৯ সালে মোহাম্মদ আলম আবার প্লটটির বিষয়ে আবেদন করেন। বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল থাকা অবস্থায় পুরোনো ফাইলের মাধ্যমে বরাদ্দটি পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ সময় ১৯৯০ সালের প্রথম কিস্তির ৯৩ হাজার ৬২৬ টাকা পরিশোধের একটি কথিত চালানের তথ্য সামনে আসে। ২০১০ সালে প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এস্টেট) মোহাম্মদ একরামুল কবীর চালানটি যাচাই করে বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রামে টাকা জমা হয়েছে বলে প্রতিবেদন দেন। নির্বাহী প্রকৌশলী এ.কিউ.এম. শাহজালাল মজুমদারও ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন। কিন্তু ২০২০ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের যাচাইয়ে ১৯৯০ সালের ১৬ নভেম্বরের ওই চালানের কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই তারিখ ছিল শুক্রবার। ফলে চালানটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
২০১৮ সালে চট্টগ্রাম হাউজিং এস্টেটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এস্টেট) ছিলেন নাসির উদ্দিন। অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, তিনি মোহাম্মদ আলমকে নথিপত্রসহ হাজির হতে বলেন। পরে জাতীয়তা সনদ যাচাই করেন। সবশেষে ৭ অক্টোবর ২০১৮ তিনি মোহাম্মদ আলমকে মূল্য পরিশোধের দায়মুক্তির ছাড়পত্র দেন। ওই ছাড়পত্রে প্লটের কিস্তির টাকা ও সুদ পরিশোধ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। একই নথিতে ১৯৯০ সালের কথিত প্রথম কিস্তির ৯৩ হাজার ৬২৬ টাকা পরিশোধের তথ্যও গ্রহণ করা হয়।
এরপর ১৩ নভেম্বর ২০১৮ নাসির উদ্দিন নির্বাহী প্রকৌশলীকে মোহাম্মদ আলমের অনুকূলে প্লটটির দখল হস্তান্তরের ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেন। পরে বকেয়া কিস্তি ও সুদ হিসাব করে মোট ১৩ লাখ ৪৭ হাজার ৬৬৭ টাকা পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি টাকা বাজারমূল্যের সরকারি সম্পত্তির বিপরীতে ১৩ লাখ ৪৭ হাজার ৬৬৭ টাকা পরিশোধের ভিত্তিতে দায়মুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।
এ ঘটনায় ২০২২ সালে নাসিরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই মামলায় সরকারি সম্পত্তির বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা, কথিত জাল চালান এবং ১৩ লাখ ৪৭ হাজার ৬৬৭ টাকা পরিশোধ দেখিয়ে দায়মুক্তির সনদ দেওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়োগের পর থেকেই চট্টগ্রামে, একাই অন্তত ৬ পদের দায়িত্বে
২০১১ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষে চাকরি শুরু করেন নাসির উদ্দিন। প্রথমে তার পোস্টিং হয় দিনাজপুর হাউজিং এস্টেটে। ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ চট্টগ্রামে বদলি হন তিনি। এরপর ঢাকা ও কুমিল্লায় অল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করলেও ঘুরেফিরে চট্টগ্রামেই কর্মরত রয়েছেন।
বর্তমানে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি নোয়াখালীর মাইজদী হাউজিং এস্টেট, শেরশাহ হাউজিং এস্টেট, হালিশহর হাউজিং এস্টেট, ফিরোজশাহ হাউজিং এস্টেট ও কক্সবাজার ফ্ল্যাট প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করেন নাসির উদ্দিন। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কৈবল্যধাম হাউজিং এস্টেট ম্যানেজারের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি।
সেবাগ্রহণে ভোগান্তি চরমে
গৃহায়ণের এস্টেট শাখায় কাজ করতে গিয়ে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়েছে—এমন অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তা ফজলুর রহমানের স্ত্রীর একটি প্লটসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাদের এস্টেট শাখায় একাধিকবার যেতে হয়েছে। কখনো একটি কাগজ, কখনো অন্য কাগজের সমস্যা দেখিয়ে ফাইল পড়ে থাকত নাসিরের দপ্তরে।
ফজলুর রহমান বলেন, “২০২৫ সালে গৃহায়ণের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমি দেখা করি। এরপর উনার দপ্তর বলে দেওয়ার পর আমার ফাইলের চূড়ান্ত অনুমোদন হয়।”
মীর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চট্টগ্রামের বিশ্ব কলোনী এলাকার একটি প্লটের রেজিস্ট্রিকরণের জন্য অন্তত ১০ মাস ধরে ঘুরছেন এস্টেট শাখা অফিসে। তিনি বলেন, আমার কাজটি মাত্র একদিনের। যাচাই-বাছাই করলেও সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের। ব্যাংকের চালান যাচাই করে ফাইল ফরোয়ার্ড করার কথা। কিন্তু একাজের জন্য আমি প্রায় সময় যাচ্ছি। কোনো দিন নাসির নিজে থাকে না, থাকলেও ফাইল ধরেন না, ফাইল ধরলেও কাগজের এই সমস্যা, ওই সমস্যা। সবমিলিয়ে ফাইল নড়ে না নাসিরের দপ্তর থেকে। আমার মনে হয় বাংলাদেশে এত হয়রানি করা হয় আর কোনো দপ্তর নেই।
টাকা লেনদেনের বিষয়ে মো. নাসির উদ্দিন বলেন, আমি শুনেছি, সেটি চালান জমা দেওয়ার টাকা। হেলাল আমার স্টাফ নন। তাই বিষয়টি তার কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন।
কুয়াড প্রকল্পের জরাজীর্ণ দোকান সম্পর্কে তিনি বলেন, তৎকালীন সময়ে কেন দোকানগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি, তা আমার জানা নেই। এস্টেট ম্যানেজারের দায়িত্ব পালনকালে জানতে পেরেছি, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ১০ থেকে ১১ বার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমিও জরিপ করে টেন্ডারের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছি। বড় জায়গাটিতে প্রকৌশল শাখা থেকে প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে উচ্ছেদ করে তা বাস্তবায়ন করা হবে। কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ ছাড়া কোনো জায়গা ভাড়া দেওয়ার বিধান নেই, তাই অবৈধ দখল করা স্থাপনা থেকে ভাড়া নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
‘ডি-টাইপ কোয়ার্টারের বকেয়া ভাড়া আদায়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ও মাইকিং করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত ভিডিও ও পত্রিকার কাটিং সংরক্ষিত আছে। বস্তির লোকজনের দখল ঠেকাতে গিয়ে আমি, নির্বাহী প্রকৌশলী ও অন্য প্রকৌশলীরা আহত হয়েছি। এর ফুটেজও আছে।’
কক্সবাজারে নিজের নামে ফ্ল্যাট থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, আমার নামে কোনো ফ্ল্যাট নেই। সেখানে প্রায় পাঁচ দফায় লটারি হয়েছে। গ্রাহকেরা বরাদ্দ পাওয়ার পর ফ্ল্যাট পছন্দ না হওয়ায় জামানতের টাকা তুলে নেওয়ায় পুনরায় লটারি করতে হয়েছে। এখনো প্রায় পাঁচ থেকে সাতটি ফ্ল্যাট খালি আছে। আমার বোনের ফ্ল্যাট আমি বরাদ্দ দিইনি। আমার কাউকে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির পর নিয়মতান্ত্রিকভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ পক্রিয়ায় আমার বোনও পেয়েছেন।
ভবন নির্মাণ ও ফ্ল্যাটের আয়তনসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, এস্টেট শাখা মূলত জমির মালিকানা দেখে। নির্মাণের অনুমতি ও তদারকির দায়িত্ব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল শাখার। নামজারি আমরা করি না; লিজ দেওয়া সম্পত্তির নামজারির জন্য অনাপত্তি দিই।
একাধিক এস্টেটের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ আমাকে যেখানে দায়িত্ব দিয়েছে, সেখানে কাজ করেছি। কুয়াড প্রকল্পে নিজস্ব জনবল না থাকায় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমি ও আরও দুজন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি। চাকরির শুরুতে দিনাজপুর, মোহাম্মদপুর, প্রধান দপ্তরের প্রশাসন শাখা ও কুমিল্লায় কাজ করেছি।
সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তির বিষয়ে তিনি বলেন, কাগজপত্রের জটিলতার কারণে কাজ বিলম্বিত হতে পারে। মালিকানাসংক্রান্ত সমস্যা, অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা, অতিরিক্ত জমি দখল, মামলা, দ্বৈত বরাদ্দ, বয়স জালিয়াতি বা নাম পরিবর্তনের মতো কারণে বিলম্ব হতে পারে। ইতিমধ্যে অতিরিক্ত জমি দখল, দ্বৈত বরাদ্দ ও ভুয়া বরাদ্দের কয়েকটি নথি বাতিলের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এসব কারণে কেউ কেউ আমাকে নাম-পরিচয় গোপন করে চিঠি দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করছেন।
হালিশহর হাউজিং এস্টেটের বাণিজ্যিক প্লটসংক্রান্ত দুদকের মামলা বিষয়ে তিনি বলেন, আমি চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই প্লটটি বরাদ্দ হয়েছিল। ১৯৯০ সালে যখন প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তাম। আমি শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নির্ধারিত তিনটি কিস্তির টাকা আদায় করেছি। ১৯৯০ সালের কোনো কিস্তি আমি আদায় করিনি। দুদকের মামলার পর আমি পুনঃতদন্তের আবেদন করেছি। বর্তমানে বিষয়টি তদন্তাধীন এবং মূল নথি জব্দ করা হয়েছে। আশা করি, তদন্তে সঠিক সিদ্ধান্ত আসবে।
সার্বিক বিষয়ে জাগৃক চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, “ঘুষ লেনদেনের যে ভিডিওর কথা এসেছে, ঘটনাটি আমি যোগদানের আগে হয়েছে। এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত মন্তব্য করতে পারব না। নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা আছে এবং তিনি কাগজে-কলমে পলাতক—এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে বিষয়টি আমি খোঁজ নেব। আর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, মার্কেট ও দোকান থেকে ভাড়া আদায়ের বিষয়গুলো আমার জানা নেই। ভোগান্তির বিষয়ে কেউ অভিযোগ দিলে আমরা ব্যবস্থা নেব।”
নাসিরের বিরুদ্ধে হওয়া দুদকের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সংস্থাটির উপপরিচালক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, “মামলায় নাসিরসহ কোনো আসামিই জামিন নেননি। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। বিভিন্ন নথি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।”
দুদক চট্টগ্রামের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম ঢাকা বলেন, “দুদকের দায়ের করা মামলাগুলো আমলযোগ্য। এ ধরনের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা আইন অনুযায়ী আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। অথবা আসামিকে আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিতে হয়। না হয় কাগজে-কলমে তারা পলাতক হিসেবে গণ্য হন। তবে অনেক সময় দুদকের জনবল সীমাবদ্ধ কিংবা তদন্ত কর্মকর্তা গ্রেপ্তার করেন না। আসামিরা সরকারি কর্মকর্তা মানে সচেতন লোক। তাদের উচিৎ নিজেদেরকে আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেওয়া।”
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















