২০১৫ কিংবা ২০১৬ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে যোগদান। কয়েক বছরের মাথায় চলতি দায়িত্ব পেয়ে পদবি দাঁড়ায় ‘অথরাইজড অফিসার’। আর এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকা শহরের ইমারত নির্মাণ তদারকি ও নকশা অনুমোদনের দায়িত্বে থেকে ‘দিনকে রাত’ করে গড়ে তোলেন বিপুল সম্পদের পাহাড়। চাকরিজীবন মাত্র ১০ থেকে ১২ বছরের। কিন্তু যখনই অনিয়ম-দুর্নীতির থলে থেকে বিড়াল বের হতে শুরু করে, তখনই নানা কায়দা-কৌশলে বিদেশে পাড়ি জমান। আর ফেরেন না দেশে, যোগ দেন না কর্মস্থলে। আইনি ঝামেলা এড়িয়ে বাকি জীবন বিদেশে আয়েশে কাটানোই যেন তাদের মূল লক্ষ্য। রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। তবে রাজউক চেয়ারম্যান বলছেন, বিদেশ গিয়ে যারা আর ফেরেননি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এমন পরিস্থিতি হলে করণীয় সম্পর্কে সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে রাজউক দ্রুত বিভাগীয় মামলা করতে পারে। পাশাপাশি অভিযোগগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হলে তারা দুর্নীতির অনুসন্ধানের পাশাপাশি অর্থপাচারের বিষয়টি তদন্ত করতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটও (বিএফআইইউ) এ বিষয়ে পৃথক তদন্ত পরিচালনা করতে পারে।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজউকের গুরুত্বপূর্ণ জোন ৪/১-এর দায়িত্বে ছিলেন অথরাইজড অফিসার মাকিদ এহসান। তার বিদেশ ভ্রমণের ছুটির আবেদন দেখে তৎকালীন রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞার কিছুটা সন্দেহ হয় এবং তিনি ছুটি নামঞ্জুর করেন। কিন্তু মাকিদ এহসান থেমে থাকেননি। তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনকে ‘ম্যানেজ’ করে একপ্রকার চাপ সৃষ্টি করেন এবং ১৫ দিনের ছুটি বাগিয়ে নেন। এরপর আমেরিকা গিয়ে আর দেশে ফেরেননি রাজউকের এই কর্মকর্তা।
গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে প্রেষণে আসা অপর কর্মকর্তা নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ হোসেন ২০২০ সালের মার্চে তিন বছরের জন্য পিএইচডি করতে বিদেশে যান। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও আর চাকরিতে ফেরেননি।
একই কৌশলে ২০২৪ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমান অথরাইজড অফিসার মো. ইমরুল হাসান। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে যাওয়ার আগে তিনি কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমতি নেননি। সরকারি পাসপোর্টের পাশাপাশি তার কাছে থাকা অন্য একটি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ইমিগ্রেশন পার হন। বিদেশে যাওয়ার পর তৎকালীন রাজউক চেয়ারম্যান মো. ছিদ্দিকুর রহমানকে ফোন করে ইমরুল হাসান জানিয়ে দেন, তিনি আর দেশে ফিরবেন না এবং চাকরিতেও যোগ দেবেন না।
দীর্ঘদিন রাজউকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জোন-৩ ও জোন-৪-এর দায়িত্বে ছিলেন এই ইমরুল হাসান। তার অধীনে ছিল গুলশান, বনানী, বারিধারা, খিলক্ষেত, পূর্বাচল, বসুন্ধরা, মিরপুর, নিকুঞ্জ, ভাষানটেক ও পল্লবীর মতো অভিজাত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলেন। এছাড়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্বালানি খাতে প্রায় ১২ লাখ টাকার অডিট আপত্তিসহ একটি বিভাগীয় মামলা রয়েছে।
ইমরুল হাসানের খালাতো ভাই অথরাইজড অফিসার শেখ মাহাব্বির রনিও একই পথে হেঁটেছেন। ২০১৬ সালে রাজউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে যোগ দিয়ে কাজ করেছেন জোন-৮-এ। পরে অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জোন ৩/১-এ। তিনিও বিদেশ গিয়ে আর ফেরেননি।
সর্বশেষ ২০২৫ সালে জোন-৮/২-এর অথরাইজড অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম (সাইফ) বিদেশে পাড়ি জমান। জাপানে এক বছর মেয়াদি মাস্টার্স প্রোগ্রামের জন্য অফিসিয়াল অনুমতি নিয়ে গেলেও, জাপান থেকে তিনি এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দিয়েছেন। এ কর্মকর্তারও দেশে বা রাজউকের চাকরিতে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে, রাজউকের আরেক আলোচিত অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াস বিনা অনুমতিতে বিদেশে যান। মূলত অনুমতি ছাড়া যাওয়ার কারণ ছিল, তিনিও আর ফিরবেন না। তবে বিদেশে স্থায়ী হতে না পেরে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আবার চাকরিতে যোগ দেন। রাজউক তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে। তবে চতুর এই কর্মকর্তা তৎকালীন প্রভাবশালী প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) উজ্জ্বল মল্লিককে ম্যানেজ করে বিভাগীয় মামলা রফা-দফা করেন এবং পূর্ণ শক্তিতে চাকরিতে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি জোন-৭/১ (শ্যামপুর, কদমতলী, দনিয়া) এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে বিদেশে যাওয়ার সম্ভাব্য তালিকায় আছেন জোন-১/১-এর অথরাইজড অফিসার শেখ মুহাম্মদ এহসানুল ইমাম। তার বিরুদ্ধে ১১ বছরের চাকরিজীবনে জোন ১, ২, ৩, ৫ ও ৭-এ দায়িত্ব পালনকালে বড় বড় বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করে আইনের ব্যত্যয় ঘটানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে, সরকারি খাস জমি রূপায়ণ হাউজিং এস্টেটকে দেওয়ার ঘটনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুদক তাকে আসামি করে মামলা দেয়। মামলার কয়েকজন আসামি অব্যাহতি পেলেও তিনি পাননি। ফলে ঝুঁকি এড়াতে যেকোনো সময় তিনি বিদেশে পাড়ি দিতে পারেন বলে মনে করছেন রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা।
এছাড়া রাজউকের ‘প’ আদ্যক্ষরের দুই অথরাইজড অফিসারের বিদেশ পাড়ি দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক অনুসন্ধান চালাচ্ছে। অন্যজনের বিরুদ্ধে নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে ইমারত নির্মাণ তদারকির বিষয়ে নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে একজন রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। আরেকজন সম্প্রতি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অথরাইজড অফিসারের ক্ষমতা পেয়েছেন।
সূত্র জানায়, রাজউকে বর্তমানে ২৪টি জোন থাকলেও সব মিলিয়ে ১৮ থেকে ২০ জন অথরাইজড অফিসার মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ অবৈধ সুবিধা ছাড়া কোনো ফাইল এগিয়ে নেন না। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভবনের ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর), সেটব্যাক কিংবা অন্যান্য আইনি শর্ত উপেক্ষা করে নির্মাণের সুযোগ দেন তারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, একটি ১০ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এর চেয়ে উঁচু ভবনের ক্ষেত্রে সেই অঙ্ক ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকায় গিয়ে পৌঁছায়। আবার ৫ থেকে ৭ তলা ভবনের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা দাবি করা হয়। বড় প্রকল্প বা বিধিমালাগত জটিলতা থাকলে ঘুষের অঙ্ক বাড়ে বহুগুণ। আর নকশা অনুমোদনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরেই রাজউকের পদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের পরিদর্শকরাও কাজ করে থাকেন।
সার্বিক বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘যেসব কর্মকর্তা অনুমোদন না নিয়ে বিদেশে গেছেন বা নির্ধারিত ছুটির পর চাকরিতে ফেরেননি, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনকে ইতোমধ্যে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ চলমান রয়েছে।’
এ বিষয়ে সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, ‘চাকরি অবস্থায় অনুমোদন ছাড়া বিদেশে গেলে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কর্মকর্তাদের বিশেষ খাতির বা সখ্য থাকলে এসব বিষয় থেকে তারা রেহাই পেয়ে যান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















