বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ঘিরে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও বিভাগীয় শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংস্থাটির রাঙ্গামাটি বীজ বিপণন দপ্তরের সাবেক গুদামরক্ষক এবং সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম খলিলের বিরুদ্ধে ২০২৪-২৫ বিতরণ বর্ষে বোরো ধানবীজ বিক্রির ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ৪৬৫ টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা নথিতে উল্লেখ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু সেই বরখাস্তের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তার আবেদন বিবেচনায় নিয়ে শর্তসাপেক্ষে চাকরিতে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয় বিএডিসি কর্তৃপক্ষ।
এ ঘটনায় সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে-বিভাগীয় তদন্তে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর কোন বিধানের আওতায় গুরুদণ্ড পরিবর্তন করে তাকে চাকরিতে ফেরানো হলো এবং এর প্রশাসনিক যৌক্তিকতাই বা কী।
বিএডিসির সংশ্লিষ্ট নথিতে ইব্রাহীম খলিলকে সাবেক গুদামরক্ষক এবং বর্তমানে সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বিএডিসি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, মধুপুর, টাঙ্গাইলে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে তিনি রাঙ্গামাটি বীজ বিপণন দপ্তরে সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও গুদামরক্ষকের দায়িত্বসহ অন্যান্য শাখার দায়িত্ব পালন করেন।
নথি অনুযায়ী, রাঙ্গামাটি দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে ২০২৪-২৫ বিতরণ বর্ষে বোরো ধানবীজ বিক্রির অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা করে সদর দপ্তরে স্থানান্তরের জন্য তাকে একাধিকবার লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়। যুগ্মপরিচালক (বীজ বিতরণ), বিএডিসি, চট্টগ্রাম দপ্তরের স্মারক নম্বর ৫৯৯, ৬২৯ ও ৬৭৩-এর মাধ্যমে যথাক্রমে ২০ এপ্রিল, ৮ মে ও ২৪ মে ২০২৫ তারিখে তাকে এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়। একইভাবে উপপরিচালক (বীজ বিতরণ), বিএডিসি, রাঙ্গামাটি দপ্তরের স্মারক নম্বর ৩৪১, ৩৯৩ ও ৪৪২-এর মাধ্যমে ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০ এপ্রিল ও ২৭ মে ২০২৫ তারিখেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে সমুদয় অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ বিতরণ বর্ষে বোরো ধানবীজ বিক্রি শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বিক্রয়লব্ধ অর্থের একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়নি। ১৫ মে ২০২৫ তারিখে মোজাদ্দেদ নাজির হোসেন, উপব্যবস্থাপক (বীজ বিতরণ), বিএডিসি, ঢাকা পরিদর্শনে গিয়ে চূড়ান্ত হিসাব পর্যালোচনা করেন। তখন ২০২৪-২৫ বিতরণ বর্ষে বিক্রি করা বোরো ধানবীজের বিক্রয়লব্ধ অর্থের ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ৪৬৫ টাকা অজমাকৃত থাকার বিষয়টি উঠে আসে।
শুধু অর্থ জমা না দেওয়ার বিষয়ই নয়, একই পরিদর্শনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বীজ গুদামসহ বীজ-সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ডপত্র, রেজিস্টার ও হিসাব-নিকাশ যথাসময়ে বুঝিয়ে না দেওয়ার বিষয়ও নথিতে উল্লেখ করা হয়।
এরপর বিএডিসির সংস্থাপন বিভাগের স্মারক নম্বর ১২.০৬.০০০০.২০৩.২৭.০৬৭.২১-১৭৫২, তারিখ ২৫ জুন ২০২৫-এর মাধ্যমে ইব্রাহীম খলিলকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়। পরবর্তীতে সংস্থাপন বিভাগের স্মারক নম্বর ১২.০৬.০০০০.২০৩.২৭.০৬৭.২১-১৯৭৭, তারিখ ১৫ জুলাই ২০২৫-এর মাধ্যমে তাকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে সংস্থার প্রাপ্য ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ৪৬৫ টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ জমা না দিলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, পরবর্তীতে অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (বীজ বিতরণ), বিএডিসি, ঢাকা বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইব্রাহীম খলিল ২৯ জুন ২০২৫ তারিখে ৫ লাখ টাকা এবং ২০ জুলাই ২০২৫ তারিখে আরও ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা—মোট ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা দেন। তবে অবশিষ্ট অর্থ তখনও জমা দেওয়া হয়নি।
এরপর বিএডিসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর প্রবিধি ৩৯-এর (ক), (খ) ও (চ) অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসদাচরণ ও আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। মামলাটির নম্বর ১২/২০২৫। ১২ আগস্ট ২০২৫ তারিখে স্মারক নম্বর ১২.০৬.০০০০.২০৩.২৭.০৬৭.২১-২২৬৯-এর মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী প্রণয়ন করে তাকে দেওয়া হয়।
অভিযোগনামা পাওয়ার পর ইব্রাহীম খলিল তার জবাব দাখিল করেন। তবে তিনি ব্যক্তিগত শুনানির ইচ্ছা প্রকাশ না করায় তার ব্যক্তিগত শুনানি গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্তের জন্য বিএডিসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর প্রবিধি ৪৩(৩) অনুযায়ী ড. মো. মাহবুবুর রহমান, যুগ্মপরিচালক (বীজ বিতরণ), বিএডিসি, সেচ ভবন, ঢাকা-কে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইব্রাহীম খলিল সংস্থার প্রাপ্ত অর্থ নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা দেননি। ফলে তার বিরুদ্ধে বিএডিসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর ৩৯-এর (ক), (খ) ও (চ) অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসদাচরণ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এই তদন্ত প্রতিবেদনই পরবর্তী শাস্তিমূলক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এরপর আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বিএডিসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর ৪০(১) অনুযায়ী কেন তার বিরুদ্ধে এক বা একাধিক দণ্ড আরোপ করা হবে না—সে বিষয়ে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। সংস্থাপন বিভাগের ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখের ৪৫২ নম্বর স্মারকের মাধ্যমে এ নোটিশ জারি করা হয়। ইব্রাহীম খলিল ওই দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশেরও জবাব দেন।
বিভাগীয় মামলার অভিযোগনামা, অভিযোগ বিবরণী, সাময়িক বরখাস্তের আদেশ, অভিযুক্তের জবাব, তদন্ত প্রতিবেদন, দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ, দ্বিতীয় নোটিশের জবাব এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে কর্তৃপক্ষের নথিতে বলা হয়, ২০২৪-২৫ বিতরণ বর্ষে বিক্রি করা বোরো ধানবীজের বিক্রয়লব্ধ ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ৪৬৫ টাকা সরকারি হিসাবে জমা না দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়েছে।
নথিতে আরও বলা হয়, সরকারি অর্থ জমা দেওয়ার জন্য ইব্রাহীম খলিলকে একাধিকবার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তিনি তা যথাসময়ে পরিশোধ করেননি। পরবর্তীতে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দিলেও বড় একটি অংশ তখনও অজমাকৃত ছিল।
কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনায় তার দায়িত্বহীনতাকে ‘অবিশ্বাস্য ও অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন ও যাবতীয় রেকর্ডপত্র পর্যালোচনার পর তাকে বিএডিসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর ৩৯-এর (ক), (খ) ও (চ) অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসদাচরণ ও তহবিল তসরুপ/আত্মসাতের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
এরপর প্রবিধি ৪০(১)(খ)(এ) অনুযায়ী ইব্রাহীম খলিলকে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা ‘ডিসমিসাল’ গুরুদণ্ড দেওয়া হয় এবং বিভাগীয় মামলা নম্বর ১২/২০২৫ নিষ্পত্তি করা হয়।
বিএডিসির সংস্থাপন বিভাগের ৭ জুন ২০২৬ তারিখের অফিস আদেশে তার সাময়িক বরখাস্তকাল বিনা বেতনে অসাধারণ ছুটি হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই সময়ে প্রদেয় খরপোষ ভাতা ফেরতযোগ্য হবে না বলেও উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু এখানেই ঘটনার নতুন মোড়। বরখাস্ত হওয়ার পর ইব্রাহীম খলিল আত্মসাত/অজমাকৃত সরকারি অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ চেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন। তার আবেদন বিবেচনার সময় তিনি সরকারি অর্থ জমা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ভুল স্বীকার করেন বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তার আপিল/পুনর্বিবেচনার আবেদন শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ আগে যে গুরুদণ্ডে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল, পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্তের পরিবর্তে নির্দিষ্ট শর্তে তাকে চাকরিতে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়।
পুনর্বহালের শর্ত অনুযায়ী, সংস্থার হিসাবে জমা দেওয়ার জন্য অবশিষ্ট ২৯ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৫ টাকার মধ্যে এককালীন ৫ লাখ টাকা ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখের মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা দিয়ে তার প্রমাণক দাখিল করার অঙ্গীকার করেন ইব্রাহীম খলিল।
বাকি ২৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৫ টাকা চাকরিতে পুনর্বহাল হওয়ার পর তার মূল বেতনের অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ শতাংশ হারে মাসিক কর্তনের মাধ্যমে সমন্বয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের জন্য বিএডিসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর ৪০(১)(ক)(অ) অনুযায়ী ‘তিরস্কার’ দণ্ড দেওয়া হয় এবং তা তার সার্ভিস বুকে লিপিবদ্ধ থাকবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রথমে যে বিভাগীয় তদন্তে ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ৪৬৫ টাকা সরকারি হিসাবে জমা না দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল এবং যার ভিত্তিতে চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তীতে সেই একই ঘটনার ক্ষেত্রে দণ্ড পরিবর্তন করে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, অর্থ জমা দেওয়ার অঙ্গীকার ও ভুল স্বীকারের ভিত্তিতে গুরুদণ্ড পরিবর্তনের আইনগত সুযোগ কী এবং বিএডিসি কর্তৃপক্ষ ঠিক কোন বিধান ও প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ ঘটনায় আরও একটি হিসাবগত বিষয় সামনে এসেছে। প্রাথমিকভাবে অজমাকৃত অর্থের পরিমাণ ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ৪৬৫ টাকা উল্লেখ করা হলেও পরবর্তীতে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ দাঁড়ায় ২৯ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৫ টাকা। পুনর্বহালের শর্তে এই ২৯ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৫ টাকার মধ্যে ৫ লাখ টাকা এককালীন জমা এবং অবশিষ্ট ২৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৫ টাকা বেতন থেকে কেটে সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, নথিতে থাকা হিসাব অনুযায়ী, পুরো ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ৪৬৫ টাকার মধ্যে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা আগে জমা দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তে অবশিষ্ট ২৯ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৫ টাকা আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিএডিসির এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে সংস্থার সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি। তাদের প্রশ্ন, বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর এবং চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদণ্ড দেওয়ার পর মাত্র অর্থ পরিশোধের অঙ্গীকারের ভিত্তিতে কীভাবে সেই দণ্ড পরিবর্তন করে পুনর্বহাল করা হলো।
কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, ইব্রাহীম খলিল রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিএডিসিতে প্রভাব বিস্তার করছেন এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে তিনি কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের কেউ কেউ তাকে বিএনপির দক্ষিণাঞ্চলের একজন নেতার ঘনিষ্ঠ বা অনুসারী বলেও দাবি করেছেন। তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা চাপ প্রয়োগের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যদি কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে চলমান বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করে থাকে, তাহলে তা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতার জন্য গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তারা বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, বিএডিসির সিদ্ধান্তের নথিতে পুনর্বহালের কারণ হিসেবে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ নেই। সেখানে ইব্রাহীম খলিলের আবেদন, সরকারি অর্থ জমা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, ইতোমধ্যে অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়, ভুল স্বীকার এবং প্রযোজ্য বিধিমালার আলোকে পুনর্বিবেচনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে-বিএডিসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর কোন বিধানের অধীনে বরখাস্তের গুরুদণ্ড পরিবর্তন করে পুনর্বহাল করা হলো; ওই বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে কী কী শর্ত পূরণ করা হয়েছে; কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সম্পূর্ণ সরকারি অর্থ জমা হয়েছিল কি না; এবং বিভাগীয় তদন্তে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কেন চাকরিচ্যুতির পরিবর্তে ‘তিরস্কার’ দণ্ডে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হলো।
আরও একটি প্রশ্ন হলো, ৩০ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা জমা দেওয়ার যে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, তা ইব্রাহীম খলিল পূরণ করেছেন কি না এবং পরবর্তী সময়ে ২৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৫ টাকা বেতন থেকে কর্তনের প্রক্রিয়া বাস্তবে শুরু হয়েছে কি না। এসব তথ্য নিশ্চিত হলে পুনর্বহালের পর সরকারি অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতি সম্পর্কে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে।
এ বিষয়ে বিএডিসির চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফলে সরকারি অর্থ জমা না দেওয়ার অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া, চাকরি থেকে বরখাস্ত, পরবর্তীতে পুনর্বিবেচনার আবেদন এবং শর্তসাপেক্ষে পুনর্বহাল—পুরো ঘটনাপ্রবাহ এখন বিএডিসির প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকারি অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি বিভাগীয় শাস্তির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আইনগত ভিত্তি এবং ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা হলে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















