ঢাকা ০৪:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নড়াইলে আদালতে হাজিরা দিতে এসে অস্ত্রসহ ১১ জন আটক ইবনে সিনা ফার্মা এমডির বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আইফোন ছিনিয়ে নিতেই অপ্রতিমকে হত্যা, পুরো ঘটনার বর্ণনা পুলিশ সুপার শিবগঞ্জ সীমান্তে ৫০ বোতল ফেন্সিডিল ও মোটরসাইকেল জব্দ, পালাল মাদক কারবারি বড়লেখার পিআইও মিজানুরের বিরুদ্ধে ১২% কমিশনের অভিযোগ, বাদ যায়নি মসজিদ-মন্দিরও ৬০০ কোটি টাকার জমি ৭১ লাখে! তেজগাঁওয়ের দুই প্লট ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অপ্রতিম হত্যার বিচার দ্রুত করতে আদালতকে সহযোগিতা করবো : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আ.লীগ নেতার বাড়িতে ভূরিভোজ, প্রত্যাহার সেনবাগের ওসি কালিহাতীতে জমি নিয়ে বিরোধ, বৃদ্ধকে কুপিয়ে হত্যা
৬৩ কোটির জমি ১৭ কোটিতে!

ইবনে সিনা ফার্মা এমডির বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ

জমির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু দলিলে দেখানো হয়েছে মাত্র ১৭ কোটি টাকা। বাকি ৪৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে নগদে বেআইনি লেনদেনের মাধ্যমে! এভাবে জাল-জালিয়াতি করে কোম্পানির সম্পত্তি আত্মসাৎ, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি ও অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অধ্যাপক ড. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

উল্লেখ্য, রাজধানীর দারুস সালাম থানার মিরপুর হাউজিংয়ের পাইকপাড়া এলাকার প্লট নম্বর ২/বি-এর ২০.৮৩৩২৫ কাঠা জমির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ৬৩ কোটি টাকা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলিলে তা মাত্র ১৭ কোটি টাকা দেখিয়ে বাকি ৪৬ কোটি টাকা নগদে বেআইনি লেনদেনের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে। তবে শুধু জমির মূল্য কম দেখানোই নয়, মৃত শেয়ারহোল্ডারদের উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য শেয়ার না দিয়ে ৫৪ হাজার ৫৩৬টি শেয়ার অন্যদের নামে অন্তর্ভুক্ত, সম্পত্তি বিক্রির জন্য ২০ জনের মধ্যে ১৫ জনের স্বাক্ষর জাল করে বোর্ড রেজল্যুশন তৈরি, ভুয়া হলফনামা ও জাল অডিট রিপোর্ট তৈরির প্রমাণও পেয়েছে সিআইডি। চকবাজার থানায় করা একটি মামলার তদন্ত করার পর সিআইডির দেওয়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইবনে সিনার এমডিসহ ছয় আসামি পারস্পরিক যোগসাজশে জাল কাগজপত্র তৈরি ও ব্যবহার করে কোম্পানির সম্পত্তি আত্মসাৎ, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং অবৈধ লেনদেন করেছেন—এমন অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।

সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামের সঙ্গে আলাউদ্দিন সুইটমিট লিমিটেডের একটি লিখিত চুক্তি হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন নথি তৈরি এবং সম্পত্তি বিক্রির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু কোম্পানিটির শেয়ার সংখ্যা ১১ লাখ ১০ হাজারে উন্নীত করার পর মৃত শেয়ারহোল্ডারদের উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য শেয়ার দেওয়া হয়নি। বরং জালিয়াতিপূর্ণ কাগজপত্র ব্যবহার করে ৫৪ হাজার ৫৩৬টি শেয়ার ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ জেরিন আহমেদ ও মো. ফাহমিদের নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ-সংক্রান্ত কোম্পানির গঠনতন্ত্র, রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) নথিসহ বিভিন্ন কাগজপত্র পর্যালোচনা করেই এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

সিআইডির ভাষ্য, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটির তদন্ত করা হয়েছে এবং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সম্পত্তিটি হস্তান্তর ও দখলের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের জাল নথি তৈরি করা হয়েছে। সম্পত্তি বিক্রির জন্য ২০ জনের মধ্যে ১৫ জনের স্বাক্ষর জাল করে একটি বোর্ড রেজল্যুশনও তৈরি করা হয়। পরে ওই রেজল্যুশনের ভিত্তিতেই সম্পত্তি বিক্রি ও ক্রয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপত্রও ব্যবহার করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট ৬৯৮৫ নম্বর সাফ কবলার মাধ্যমে সম্পত্তিটি হস্তান্তর করা হয়। জাল ও প্রতারণামূলক নথি ব্যবহার করে সম্পত্তিটি আত্মসাৎ ও অবৈধভাবে দখলে রাখা হয়।

সিআইডির প্রতিবেদনে জমিটির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৮ সালের ১৬ আগস্টের সাফ কবলায় জমির মূল্য দেখানো হয় ১৭ কোটি টাকা। গোপন করা বাকি ৪৬ কোটি টাকা নগদে বেআইনি লেনদেনের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে। এভাবে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি ও রাজস্ব পরিহার করা হয়েছে বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই জমির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে করা দলিলে মূল্যের এমন নাটকীয় পরিবর্তনও তদন্তে ধরা পড়েছে।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি তারিখের দলিলে জমির মূল্য দেখানো হয় ৪০ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৮ সালের ৮ মার্চ তারিখের দলিলে মূল্য দেখানো হয় ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। একই বছরের ১৬ আগস্ট তারিখের দলিলে মূল্য দেখানো হয় ১৭ কোটি টাকা। পরে ২০২১ সালের ৩০ মে তারিখের দলিলে একই জমির মূল্য দেখানো হয় মাত্র ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সিআইডি তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে সম্পত্তির সর্বনিম্ন বাজারমূল্য নির্ধারণ-সংক্রান্ত বিধিমালার কথাও উল্লেখ করে জানিয়েছে যে, প্রকৃত লেনদেন মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দলিলে দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

শুধু জমি হস্তান্তরের নথিতেই নয়, কোম্পানির অভ্যন্তরীণ কাগজপত্রেও জালিয়াতির অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি ও কালো টাকা লেনদেনের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল জাল হলফনামা এবং ভুয়া ও জাল অডিট রিপোর্ট তৈরি করা হয়। এসব নথি ব্যবহার করে ২০১৮ সালের ২৮ জুন কোম্পানিটি বন্ধও করে দেওয়া হয়। এ সময় মামলার বাদী কানিজ ফাতেমা অনুপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তার স্বাক্ষর জাল করা হয়। একইভাবে কোম্পানির আটজন শেয়ারহোল্ডার ও মামলার সাক্ষীদের স্বাক্ষর জাল করার প্রমাণও পেয়েছে সিআইডি।

ঘটনাটি নিয়ে গত বছর চকবাজার থানায় একটি সিআর মামলা হয় (নম্বর ৪৭৩/২০২৫)। মামলাটির তদন্ত করেন সিআইডির ঢাকা মেট্রো-দক্ষিণের পরিদর্শক শাহজালাল মুন্সী। তিনি তদন্তের সময় লিখিত চুক্তি, কোম্পানির গঠনতন্ত্র, শেয়ার-সংক্রান্ত নথি, জাল ও ভুয়া সাফ কবলা, হলফনামা, অডিট রিপোর্ট, কোম্পানি বন্ধের নথি, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল পর্যালোচনা করে তদন্ত শেষে প্রতিবেদনও তৈরি করেন। চলতি বছরের ২৯ জুলাই ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩১-এ প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়।

ওই প্রতিবেদনের ১১ নম্বর পাতায় বলা হয়েছে, মামলার ছয় আসামির মধ্যে আলাউদ্দিন সুইটমিট লিমিটেডের চার পরিচালক সুফিয়া বেগম, জেরিন আহমেদ, মো. ফাহমিদ ও মো. মারুফ আহম্মদ, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলাম ও প্যানসিয়া সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান প্রফেসর চৌধুরী মাহমুদ হাসান পারস্পরিক যোগসাজশে কোম্পানির নগদ অর্থ ও সম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেন।

মামলার তদন্ত শেষে সিআইডির দেওয়া প্রতিবেদন বর্তমানে বিচারিক কার্যক্রমের পর্যায়ে রয়েছে। গত ৩ আগস্ট ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩১-এ প্রতিবেদনটি নিয়ে শুনানি হয়। আদালত সিআইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পরবর্তী আদেশ দেওয়ার কথা জানায়। নথিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে। পরে আরও শুনানির জন্য গত ২ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়; তবে মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. একরামুল হক মজুমদার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় ওই তারিখে আদালতের সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।

জাল-জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালের এমডি আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে মামলার নম্বর ও অভিযোগের বিষয়বস্তু উল্লেখ করে বার্তা পাঠানো হয়। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো উত্তর দেননি।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নড়াইলে আদালতে হাজিরা দিতে এসে অস্ত্রসহ ১১ জন আটক

৬৩ কোটির জমি ১৭ কোটিতে!

ইবনে সিনা ফার্মা এমডির বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ

আপডেট সময় ০৩:২৮:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জমির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু দলিলে দেখানো হয়েছে মাত্র ১৭ কোটি টাকা। বাকি ৪৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে নগদে বেআইনি লেনদেনের মাধ্যমে! এভাবে জাল-জালিয়াতি করে কোম্পানির সম্পত্তি আত্মসাৎ, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি ও অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অধ্যাপক ড. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

উল্লেখ্য, রাজধানীর দারুস সালাম থানার মিরপুর হাউজিংয়ের পাইকপাড়া এলাকার প্লট নম্বর ২/বি-এর ২০.৮৩৩২৫ কাঠা জমির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ৬৩ কোটি টাকা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলিলে তা মাত্র ১৭ কোটি টাকা দেখিয়ে বাকি ৪৬ কোটি টাকা নগদে বেআইনি লেনদেনের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে। তবে শুধু জমির মূল্য কম দেখানোই নয়, মৃত শেয়ারহোল্ডারদের উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য শেয়ার না দিয়ে ৫৪ হাজার ৫৩৬টি শেয়ার অন্যদের নামে অন্তর্ভুক্ত, সম্পত্তি বিক্রির জন্য ২০ জনের মধ্যে ১৫ জনের স্বাক্ষর জাল করে বোর্ড রেজল্যুশন তৈরি, ভুয়া হলফনামা ও জাল অডিট রিপোর্ট তৈরির প্রমাণও পেয়েছে সিআইডি। চকবাজার থানায় করা একটি মামলার তদন্ত করার পর সিআইডির দেওয়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইবনে সিনার এমডিসহ ছয় আসামি পারস্পরিক যোগসাজশে জাল কাগজপত্র তৈরি ও ব্যবহার করে কোম্পানির সম্পত্তি আত্মসাৎ, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং অবৈধ লেনদেন করেছেন—এমন অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।

সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামের সঙ্গে আলাউদ্দিন সুইটমিট লিমিটেডের একটি লিখিত চুক্তি হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন নথি তৈরি এবং সম্পত্তি বিক্রির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু কোম্পানিটির শেয়ার সংখ্যা ১১ লাখ ১০ হাজারে উন্নীত করার পর মৃত শেয়ারহোল্ডারদের উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য শেয়ার দেওয়া হয়নি। বরং জালিয়াতিপূর্ণ কাগজপত্র ব্যবহার করে ৫৪ হাজার ৫৩৬টি শেয়ার ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ জেরিন আহমেদ ও মো. ফাহমিদের নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ-সংক্রান্ত কোম্পানির গঠনতন্ত্র, রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) নথিসহ বিভিন্ন কাগজপত্র পর্যালোচনা করেই এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

সিআইডির ভাষ্য, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটির তদন্ত করা হয়েছে এবং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সম্পত্তিটি হস্তান্তর ও দখলের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের জাল নথি তৈরি করা হয়েছে। সম্পত্তি বিক্রির জন্য ২০ জনের মধ্যে ১৫ জনের স্বাক্ষর জাল করে একটি বোর্ড রেজল্যুশনও তৈরি করা হয়। পরে ওই রেজল্যুশনের ভিত্তিতেই সম্পত্তি বিক্রি ও ক্রয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপত্রও ব্যবহার করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট ৬৯৮৫ নম্বর সাফ কবলার মাধ্যমে সম্পত্তিটি হস্তান্তর করা হয়। জাল ও প্রতারণামূলক নথি ব্যবহার করে সম্পত্তিটি আত্মসাৎ ও অবৈধভাবে দখলে রাখা হয়।

সিআইডির প্রতিবেদনে জমিটির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৮ সালের ১৬ আগস্টের সাফ কবলায় জমির মূল্য দেখানো হয় ১৭ কোটি টাকা। গোপন করা বাকি ৪৬ কোটি টাকা নগদে বেআইনি লেনদেনের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে। এভাবে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি ও রাজস্ব পরিহার করা হয়েছে বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই জমির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে করা দলিলে মূল্যের এমন নাটকীয় পরিবর্তনও তদন্তে ধরা পড়েছে।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি তারিখের দলিলে জমির মূল্য দেখানো হয় ৪০ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৮ সালের ৮ মার্চ তারিখের দলিলে মূল্য দেখানো হয় ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। একই বছরের ১৬ আগস্ট তারিখের দলিলে মূল্য দেখানো হয় ১৭ কোটি টাকা। পরে ২০২১ সালের ৩০ মে তারিখের দলিলে একই জমির মূল্য দেখানো হয় মাত্র ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সিআইডি তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে সম্পত্তির সর্বনিম্ন বাজারমূল্য নির্ধারণ-সংক্রান্ত বিধিমালার কথাও উল্লেখ করে জানিয়েছে যে, প্রকৃত লেনদেন মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দলিলে দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

শুধু জমি হস্তান্তরের নথিতেই নয়, কোম্পানির অভ্যন্তরীণ কাগজপত্রেও জালিয়াতির অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি ও কালো টাকা লেনদেনের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল জাল হলফনামা এবং ভুয়া ও জাল অডিট রিপোর্ট তৈরি করা হয়। এসব নথি ব্যবহার করে ২০১৮ সালের ২৮ জুন কোম্পানিটি বন্ধও করে দেওয়া হয়। এ সময় মামলার বাদী কানিজ ফাতেমা অনুপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তার স্বাক্ষর জাল করা হয়। একইভাবে কোম্পানির আটজন শেয়ারহোল্ডার ও মামলার সাক্ষীদের স্বাক্ষর জাল করার প্রমাণও পেয়েছে সিআইডি।

ঘটনাটি নিয়ে গত বছর চকবাজার থানায় একটি সিআর মামলা হয় (নম্বর ৪৭৩/২০২৫)। মামলাটির তদন্ত করেন সিআইডির ঢাকা মেট্রো-দক্ষিণের পরিদর্শক শাহজালাল মুন্সী। তিনি তদন্তের সময় লিখিত চুক্তি, কোম্পানির গঠনতন্ত্র, শেয়ার-সংক্রান্ত নথি, জাল ও ভুয়া সাফ কবলা, হলফনামা, অডিট রিপোর্ট, কোম্পানি বন্ধের নথি, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল পর্যালোচনা করে তদন্ত শেষে প্রতিবেদনও তৈরি করেন। চলতি বছরের ২৯ জুলাই ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩১-এ প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়।

ওই প্রতিবেদনের ১১ নম্বর পাতায় বলা হয়েছে, মামলার ছয় আসামির মধ্যে আলাউদ্দিন সুইটমিট লিমিটেডের চার পরিচালক সুফিয়া বেগম, জেরিন আহমেদ, মো. ফাহমিদ ও মো. মারুফ আহম্মদ, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলাম ও প্যানসিয়া সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান প্রফেসর চৌধুরী মাহমুদ হাসান পারস্পরিক যোগসাজশে কোম্পানির নগদ অর্থ ও সম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেন।

মামলার তদন্ত শেষে সিআইডির দেওয়া প্রতিবেদন বর্তমানে বিচারিক কার্যক্রমের পর্যায়ে রয়েছে। গত ৩ আগস্ট ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩১-এ প্রতিবেদনটি নিয়ে শুনানি হয়। আদালত সিআইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পরবর্তী আদেশ দেওয়ার কথা জানায়। নথিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে। পরে আরও শুনানির জন্য গত ২ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়; তবে মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. একরামুল হক মজুমদার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় ওই তারিখে আদালতের সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।

জাল-জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালের এমডি আবুল কালাম মোহাম্মদ সদরুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে মামলার নম্বর ও অভিযোগের বিষয়বস্তু উল্লেখ করে বার্তা পাঠানো হয়। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো উত্তর দেননি।