ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের (ইন্সপেক্টর জেনারেল) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের বহু বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির প্রথম সরকারি হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় মার্কিন বাহিনীর ৪১৭ জন সদস্য আহত হয়েছেন। পাশাপাশি ১১ জন সামরিক সদস্য ‘যুদ্ধে নিহত’ এবং আরও সাতজন ‘অযুদ্ধজনিত ঘটনায়’ মারা গেছেন বলে প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধের সময় মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের ‘বটলনেক’ বা জট দেখা দিয়েছে। এর ফলে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত প্রায় সীমাহীন এবং দেশটি ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উন্নত অস্ত্র তৈরি করছে।
ক্ষতিগ্রস্ত বহু ধরনের মার্কিন বিমান
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হামলা ও যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান, নজরদারি বিমান, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার, হেলিকপ্টার এবং ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর মধ্যে অন্তত চারটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। কুয়েতের আকাশে ১ মার্চ নিজেদের বাহিনীর ভুল হামলায় তিনটি এবং এপ্রিলে ইরানের ওপর যুদ্ধের সময় আরেকটি বিমান ভূপাতিত হয়। এ ছাড়া অন্তত একটি এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমান ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত অন্তত একটি এ-১০ যুদ্ধবিমানও ইরানের হামলায় ভূপাতিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আকাশে যুদ্ধবিমানকে দীর্ঘ সময় উড্ডয়ন সক্ষম রাখতে ব্যবহৃত কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী অন্তত সাতটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে একটি ১২ মার্চ ইরাকে বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন ক্রু সদস্যের সবাই নিহত হন। সৌদি আরবে মাটিতে থাকা আরও কয়েকটি কেসি-১৩৫ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ছাড়া সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে একটি ই-৩ সেন্ট্রি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ হেলিকপ্টারও ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে রয়েছে এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নির্ভুল হামলায় ব্যবহৃত এই দীর্ঘসময় উড্ডয়নক্ষম সশস্ত্র ড্রোনের ৩০টি পর্যন্ত ধ্বংস হয়েছে।
এ ছাড়া অন্তত একটি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন নজরদারি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এর প্রতিটির মূল্য প্রায় ২৪ কোটি ডলার। হরমুজ প্রণালির কাছে ৮ জুন অন্তত একটি এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টারও ভূপাতিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে শত শত স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি
শুধু বিমানেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
তবে প্রতিটি স্থাপনায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের প্রতিবেদন।
ইরানের হামলার কারণে কয়েকটি মার্কিন স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কূটনৈতিক স্থাপনাতেও কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি
ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের চার দেশে—ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে—মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষতির আনুমানিক মূল্য ১৮ কোটি ৪ লাখ ডলার।
ইরাকে মার্কিন কূটনৈতিক মিশন ৩০ জুন পর্যন্ত ৬০০টির বেশি হামলার মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
এরবিলে নতুন মার্কিন কনস্যুলেট ভবনের একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত বাগদাদ ডিপ্লোম্যাটিক সাপোর্ট সেন্টার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কুয়েত সিটিতে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও হামলার কারণে ৫ মার্চ মার্কিন দূতাবাসের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এতে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার ক্ষতি হয়েছে।
সৌদি আরবের রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে ৩ মার্চ দুটি ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। এতে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেটের একটি ইউটিলিটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলার।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে বাগদাদ, জেরুজালেম, তেল আবিব, কায়রো, আম্মান, কুয়েত সিটি ও মাসকাটে বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে বিলম্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মাসে আনুমানিক ২ কোটি ৪৫ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের ফলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এত দিন প্রকাশ্যে থাকা সীমিত তথ্যের বাইরে আরও বিস্তৃত চিত্র সামনে এলো। বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক বিমান হারানো এবং মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য যুদ্ধের বাস্তব ব্যয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
























