বাংলাদেশ রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীতে (আরএনবি) বদলি ও পদায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বাহিনীর সদস্যদের একাংশের অভিযোগ, পছন্দের কর্মস্থলে বদলি, গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে পদায়ন কিংবা বদলি ঠেকাতে অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে, এ ক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।
এসব অভিযোগের সঙ্গে আরএনবির চীফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের নামও উঠে এসেছে।
দপ্তরাদেশে অনুমোদনের বিধান
বদলি-পদায়ন নিয়ে আলোচনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয়ের ৫ ডিসেম্বর ২০২৪ সালের সংশোধিত দপ্তরাদেশ।
দপ্তরাদেশে আরএনবির গ্রেড ১০ থেকে ২০-এর কর্মচারীদের বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে। আন্তঃজোনাল বদলির ক্ষেত্রে মহাপরিচালকের অনুমোদন এবং পার্সোনেল-৩ শাখা থেকে অফিস আদেশ জারির বিধান রয়েছে।
একই বিভাগ বা আন্তঃবিভাগীয় বদলির ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) অনুমোদনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
এ কারণে সদস্যদের প্রশ্ন? প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া কোনো বদলি বা পদায়নের আদেশ দেওয়া হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে তার প্রশাসনিক ভিত্তি কী?
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম মামুনুল ইসলাম প্রিন্সের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে WhatsApp-এ বার্তা পাঠিয়েও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাত মাসেই বদলি, কোথাও প্রায় এক বছর
বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সদস্যরা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভৈরবের হাবিলদার মুসাকে দায়িত্ব পাওয়ার প্রায় সাত মাসের মধ্যেই বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিমানবন্দরের হাবিলদার জিয়া প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালনের পর বদলি হয়েছেন।
অশ্র শাখার হাবিলদার আনোয়ারকেও প্রায় সাত মাসের মাথায় বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁর জায়গায় অন্য একজনকে পদায়নের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে আনন্দ বড়ুয়াকে পটিয়া স্টেশনে দায়িত্ব দেওয়ার প্রায় দুই মাসের মাথায় পাহাড়তলী স্টেশনে পুনঃপদায়ন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
একই বাহিনীতে কারও সাত মাসের মধ্যে বদলি, আবার কারও প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ, এমন পার্থক্যের কারণ কী, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
সদস্যদের একাংশের অভিযোগ, বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে ৩০ হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেন হয়েছে। পছন্দের কর্মস্থলে যাওয়ার পাশাপাশি বদলি ঠেকাতেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের সঙ্গে চীফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের নাম উঠে এসেছে।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
ইমাম হোসেনকে ঘিরেও অভিযোগ
বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে আরএনবির সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাম হোসেন উজ্জ্বলের ভূমিকা নিয়েও সদস্যদের একাংশের অভিযোগ রয়েছে।
তাদের দাবি, বদলি-পদায়নসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কথিত অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রেও তাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সদস্য।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ইমাম হোসেন উজ্জ্বলকে একাধিক কল করেও তাকে পাওয়া যায় নি।
১৮ লাখ টাকা ফেরতের বিষয়
সংশ্লিষ্ট সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে জহিরুল ইসলামের বদলির আগে সদস্যদের পাওনা প্রায় ১৮ লাখ টাকা নিয়ে একটি আর্থিক বিষয় সামনে আসে।
পরে সদস্যদের প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেনের উদ্যোগে ওই অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এ বিষয়ে ইমাম হোসেন উজ্জ্বল ও সাদ্দাম হোসেনের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডের কথাও জানা গেছে। সেখানে সদস্যদের পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। তবে অডিওটির সত্যতা ও পূর্ণ প্রেক্ষাপট যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সাদ্দাম হোসেন বলেন, “এগুলো ডিপার্টমেন্টের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা সামান্য সদস্য, এর বেশি আমাদের কিছু করার নেই। আপনাদের কোনো কিছু জানার থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।”
৮০৬ সিপাহি নিয়োগ ও পুরোনো দুদক মামলা
জহিরুল ইসলামকে ঘিরে বদলি-পদায়নের বাইরেও পুরোনো কিছু বিষয় রয়েছে।
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের ৮০৬ জন সিপাহি নিয়োগের জন্য গঠিত কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন জহিরুল ইসলাম।
এর আগে ২০১৭ সালের ১৮৫ সিপাহি নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে ২০২২ সালের ২৮ আগস্ট জহিরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া নিয়মিত পদোন্নতি ছাড়াই র্যাঙ্ক দেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। এসব বিষয়েও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সদস্যরা।
সম্পদ নিয়েও দুদকের অনুসন্ধান
জহিরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী কাজী জিন্নাতুন নাহারের সম্পদ নিয়েও দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়টি আগে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাদের নামে প্রায় ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়। মিরপুরে জমি, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট ও গাড়িসহ বিভিন্ন সম্পদের কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জহিরুল ইসলামের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান ‘শেষ পর্যায়ে’ রয়েছে বলে দুদকের এক কর্মকর্তার বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে।
তদন্ত চান সদস্যরা
বদলি-পদায়নে অর্থ লেনদেন, অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ, দায়িত্ব পালনের মেয়াদ এবং স্বল্প সময়ে পুনঃপদায়নের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন আরএনবির সদস্যদের একাংশ।
তাদের দাবি, গত কয়েক বছরের বদলি-পদায়নের আদেশ, সংশোধিত আদেশ, দায়িত্ব পালনের সময় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের নথি যাচাই করা হোক।
অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সবশেষে প্রশ্ন একটাই আরএনবিতে বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই নিয়ম ও মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে কি না। নথি যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্তেই এর উত্তর মিলতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















