লক্ষ্মীপুরের চররমনী মোহন ইউনিয়নে অস্তিত্বহীন ৭৪ শিশুর নামে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করার গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বর্তমান নিবন্ধন সহকারী আবুল বাছেরের বিরুদ্ধে এই ঘটনায় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের নামেই এ ধরনের ভুয়া তথ্য যুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিডিআরআইএস (Birth and Death Registration Information System) ব্যবস্থায় চররমনী মোহন ইউনিয়নের ৭৪টি অস্তিত্বহীন শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যেই মৃত্যু দেখিয়ে তাদের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়। এতে সরকারি তথ্যভাণ্ডারের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনাটি সামনে আসার পর জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ডেপুটি রেজিস্ট্রার জেনারেল (যুগ্ম সচিব) মো. লুৎফুর রহমানের স্বাক্ষরিত ৯ সেপ্টেম্বরের একটি চিঠিতে আবুল বাছেরের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের (সমন্বয় ও সংস্কার) সচিব, লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সাতটি দপ্তরে এই চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, আবুল বাছেরের নিবন্ধন সহকারীর ক্ষমতা প্রত্যাহার করে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এর ৪(১)(গ) ধারা এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিধিমালা, ২০১৮-এর ১৯(৪) বিধি অনুযায়ী অন্য ব্যক্তিকে নিবন্ধন সহকারীর দায়িত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া ভুয়া নিবন্ধনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষিত বিডিআরআইএসের তথ্যের শুদ্ধতা নষ্ট করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এর ২১(১) ও ২১(৩) ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সরকারি কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও অসদাচরণের অভিযোগে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০১১-এর ৩৪ বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে গত ২৭ আগস্ট উপস্থিত হয়ে আবুল বাছের এ ঘটনার বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। লিখিত বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অতিরিক্ত চাপের কারণে ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে ৭৪টি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নিবন্ধনগুলো সঠিক নয় এবং সেগুলো বাতিল করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধন ব্যবস্থায় অস্তিত্বহীন শিশুর তথ্য যুক্ত করার বিষয়টি তার নিজের লিখিত বক্তব্যেও উঠে এসেছে।
তবে শুধু ‘লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ’ দেখিয়ে কেন অস্তিত্বহীন শিশুর জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করা হলো, এ প্রক্রিয়ায় কোনো আর্থিক লেনদেন বা অন্য কোনো সুবিধা নেওয়া হয়েছিল কি না, কিংবা সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে কেউ এতে সহযোগিতা করেছে কি না— এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
জন্মনিবন্ধন একটি শিশুর নাগরিক পরিচয় ও ভবিষ্যতের নানা অধিকার নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি। শিক্ষা, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণে জন্মনিবন্ধনের তথ্য প্রয়োজন হয়। সেখানে অস্তিত্বহীন শিশুর নামে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তৈরি হলে সরকারি তথ্যভাণ্ডারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। একই সঙ্গে প্রকৃত কোনো শিশুর তথ্যের সঙ্গে এসব ভুয়া তথ্য মিশে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মতো মৌলিক তথ্যভাণ্ডারে অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রভাব থাকতে পারে। তাই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে নজরদারির বাইরে থাকল, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারি তথ্যভাণ্ডারে ভুয়া তথ্য সংযোজন কোনোভাবেই ছোটখাটো প্রশাসনিক ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে এমন অনিয়ম হলে ভবিষ্যতে আরও বড় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অস্তিত্বহীন ৭৪ শিশুর জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ঘটনা সামনে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে— শুধু একজন নিবন্ধন সহকারীকে দায়ী করেই কি বিষয়টি শেষ হবে, নাকি এই অনিয়মের পেছনে থাকা পুরো প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখা হবে? তাদের দাবি, ৭৪টি নিবন্ধনের প্রতিটির তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা বের করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব নির্ধারণ এবং অনিয়মের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন বা কোনো ধরনের দুর্নীতির যোগসূত্র থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
চররমনী মোহন ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শুভ্রজিত রায় বলেন, “বাছের চররমনী মোহন ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন। এখন তিনি টুমচর ইউনিয়নে কর্মরত আছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি শুনেছি।”
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা বলেন, “অভিযোগটি নিয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে বাছেরের লিখিত জবাব দেওয়ার কথা ছিল। জবাব দিয়েছেন কি না, তা এখনো আমাদের জানা নেই। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে আমাদের কাছে কোনো চিঠি আসেনি। তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেবেন জেলা প্রশাসক। চিঠি এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















