বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে গ্রহণ করা বিপুল পরিমাণ অপরিকল্পিত ঋণ এবং প্রায় ১,৩০০টি উন্নয়ন প্রকল্পের অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিশাল আর্থিক দায়ভার বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে জবাব দিতে গিয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদে কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য জনাব রেজা আহাম্মেদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এখন ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ দশমিক ১৯ টাকায় দাঁড়িয়েছে। জনগণের ওপর থেকে এই ঋণের সুনির্দিষ্ট চাপ কমাতে বর্তমান সরকার নানামুখী সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা সুনিশ্চিত করা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক মানে ও সুশৃঙ্খল ধারায় ফিরিয়ে আনা। এছাড়া করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব বাড়ানোর মাধ্যমে নিজস্ব আয় বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া হয়েছে যাতে সরকারের নতুন ঋণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। পাশাপাশি অহেতুক ব্যয় সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ করতে অগ্রাধিকারবহির্ভূত প্রকল্প সম্পূর্ণ বন্ধ বা স্থগিত রাখা হচ্ছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অভ্যন্তরীণ ঋণ বাজার সুসংহতকরণ ও সরকারি সিকিউরিটিজের বাজার কার্যকর করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ ঠেকাতে নির্দিষ্ট সীমা বা সিলিং প্রয়োগসহ এর সুদের হারকে বাজারভিত্তিক করার প্রক্রিয়া চলছে। ফলে উচ্চ সুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে। এছাড়া হঠাৎ অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত অর্থায়ন এড়াতে ‘অ্যানুয়াল বরোয়িং প্ল্যান’ ও নগদ প্রবাহের নিখুঁত হিসেব রাখতে ‘ক্যাশ ফোরকাস্টিং’ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষায় ‘পাবলিক মানি অ্যান্ড বাজেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৯’ কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ সময় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বিগত সরকারের অর্থনৈতিক দূরভিসন্ধি ও প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন অর্থমন্ত্রী।
সংসদ সদস্য রানু তার প্রশ্নে উল্লেখ করেন, বর্তমান ঋণের ৭৮ শতাংশই বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে নেওয়া হয়েছে, যা সাড়ে ১৫ লাখ কোটি টাকারও বেশি এবং এর বড় অংশই পাচার করা হয়েছে।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে নেওয়া অপচয়মূলক ঋণের খেসারত ও বিশাল দায় আজ বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। স্বল্প সময়ে নেওয়া এসব ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে জাতীয় অর্থনীতি চরম চাপের মুখে পড়েছে এবং সরকারকে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে।
বিনিয়োগের মূলনীতি প্রসঙ্গে দুঃখপ্রকাশ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যেকোনো টেকসই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভ্যালু ফর মানি, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত দিক- এই চার নীতি অনুসরণ করা আবশ্যক। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে অধিকাংশ প্রজেক্টেই এর কোনোটিই তোয়াক্কা করা হয়নি।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের ওপর প্রায় ১৩০০টি প্রকল্পের দায় চাপিয়ে দেওয়া রয়েছে। আমরা প্রতিটি প্রজেক্টের আলাদা ইভ্যালুয়েশন করছি। ইতোমধ্যেই বহু অপ্রয়োজনীয় প্রজেক্ট বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে, যেগুলো সমাপ্তির কাছাকাছি, সেগুলো শেষ করা ছাড়া উপায় নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থনৈতিক ভিশন ও দিকনির্দেশনায় আমরা সব অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনব।
বিদেশফেরত কর্মী ও প্রবাসীদের দেশের বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে দুই পর্যায়ে মোট ২ হাজার কোটি টাকার প্রাক-অর্থায়ন ঋণ দিয়েছে বলে জাতীয় সংসদকে জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী সংসদকে আরও জানান, প্রবাসীদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সম্মানজনক পুনর্বাসনে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অনুকূলে দুই দফায় ১,০০০ কোটি টাকা করে মোট ২,০০০ কোটি টাকার এই বিশেষ তহবিল ১০ বছর মেয়াদে মাত্র ৪ শতাংশ ব্যাংক রেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে গ্রাহক বা সুবিধাভোগী পর্যায়ে এ ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ শতাংশ।
এই ঋণের সুফল তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বিদেশফেরত প্রবাসীরা এখন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, সেবা ও বাণিজ্যসহ নানা উৎপাদনশীল খাতে এই অর্থের বিনিয়োগ করছেন। এর ফলে তারা নিজেরাই উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, ৩১ জুলাই ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত প্রাক-অর্থায়ন কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে ৪২ হাজার ৭৬২ জন এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৪২ হাজার ৩০৩ জন সুবিধাভোগী প্রত্যক্ষভাবে ঋণ গ্রহণ করেছেন। প্রথম পর্যায়ের সফল বাস্তবায়নের পর দ্বিতীয় ধাপের বিতরণ কাজও এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























