ঢাকা ১২:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সাংবাদিক সুরক্ষা ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে তেজগাঁও রেলস্টেশন ও কারওয়ান বাজারে ৩০০ অসহায় মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ ফুয়াদ হাসান আকন্দের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অপপ্রচারের প্রকৃত সত্য প্রকাশ হোলিস্টিক হোম বিল্ডার্সের বিরুদ্ধে ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নির্বাচন সামনে রেখে ইউনিয়ন পরিষদ পুনর্গঠন স্থগিত রাজউকের ১,৪১৩ প্লট নিয়ে তদন্ত, স্থগিত ১,০৭৪টির কার্যক্রম ‘বিরিয়ানির ভাগ’ দিতে নারাজ বিএনপি: রাশেদ খাঁন দুই বছর লভ্যাংশ নেই মার্কেন্টাইল ব্যাংকে, ব্যাংকের টাকায় বিদেশ ঘুরছেন এমডি মতিউল হাসান চট্টগ্রামে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতি সভাপতি রানা, সম্পাদক বারী, যুগ্ম সম্পাদক কামাল নারায়ণগঞ্জে কুবি শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার, আটক স্বামী

‘বন্দিদের পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলতেন জিয়া স্যার’

সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক গুম-খুনের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী ট্রলার মাঝি আব্বাস মল্লিক। তিনি জানিয়েছেন, ২০১০ ও ২০১১ সালে র‍্যাবের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান মাঝরাতে বন্দিদের নিয়ে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় যেতেন। পরে তাদের গুলি করে পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে বলেশ্বর নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে মামলাটির দশম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আব্বাস মল্লিক।

সাক্ষ্যে আব্বাস মল্লিক বলেন, অভিযানের দিন বিকেলে সাদা পোশাকে দুই র‍্যাব সদস্য স্থানীয় দোকানদারদের সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ করে বাতি নিভিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিতেন। এরপর রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে র‍্যাবের চার থেকে পাঁচটি মাইক্রোবাস বরফ মিলের সামনে আসত। ঢাকা থেকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় বন্দিদের এনে ট্রলারে তোলা হতো।

তার দাবি, ট্রলার ছাড়ার সময় র‍্যাব সদস্যরা রশি ও সিমেন্টের বস্তা সঙ্গে নিতেন। বন্দিদের নিয়ে ট্রলারটি বলেশ্বর নদীর গভীর পানিতে যাওয়ার পর গতি কমিয়ে দেওয়া হতো। এরপর চোখ ও হাত বাঁধা বন্দিদের একজন একজন করে ট্রলারের বাইরে আনা হতো।

আব্বাস মল্লিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রলারের দুই পাশে থাকা সাপোর্টের মধ্যে দুই র‍্যাব সদস্য বন্দিকে চেপে ধরে রাখতেন। এরপর জিয়াউল আহসান নিজে গিয়ে বন্দির মাথা, কান অথবা বুকে গুলি করতেন।

‘মরদেহ ভেসে ওঠা ঠেকাতে পেট কেটে দিতেন’
সাক্ষ্যে আব্বাস মল্লিক আরও দাবি করেন, গুলি করে হত্যার পর মৃতদেহের গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। মরদেহ যাতে পানিতে ভেসে না ওঠে, সে জন্য নদীতে ফেলার আগে পেট কেটে দেওয়া হতো বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, অনেক বন্দিকে সুন্দরবনে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হতো। পরে সাংবাদিকদের ডেকে এনে ঘটনাকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে দেখানো এবং মরদেহ থানায় হস্তান্তর করা হতো।

হত্যাকাণ্ড শেষে বরফ মিলে ফিরে এলে মাঝিদের খামে করে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হতো বলেও সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন আব্বাস মল্লিক।

নিখোঁজ ভাইয়ের কথাও বললেন আব্বাস
সাক্ষ্যে নিজের ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন আব্বাস। তার দাবি, আলকাছের দুটি ট্রলার ছিল এবং তিনি র‍্যাবের সঙ্গে কাজ করতেন। পরে র‍্যাবের কর্মকাণ্ডের কথা স্থানীয় বাজারে আলোচনা করায় অন্য বোটের মালিকেরা তাকে সতর্ক করেছিলেন যে, র‍্যাব তার ওপর ক্ষুব্ধ।

আব্বাসের ভাষ্য, ২০১১ সালের মাঝামাঝি একদিন দুপুরের খাবার খেয়ে আলকাছ বাড়ি থেকে বের হন। তাকে ফোন করে বলা হয়েছিল, ‘জিয়া স্যার’ তাকে বটতলা-মানিকখালী এলাকায় ডেকেছেন। ওই দিন সন্ধ্যার পর থেকেই আলকাছের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর আর তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

ভাইয়ের সন্ধানে খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকার র‍্যাব কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কোনো তথ্য পাননি বলে জানান আব্বাস। পাথরঘাটা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে জিয়াউল আহসান ও র‍্যাবের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পুলিশ অস্বীকৃতি জানায় বলেও সাক্ষ্যে দাবি করেন তিনি।

জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে কাঠগড়ায় থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে শনাক্ত করেন আব্বাস মল্লিক। একই সঙ্গে নিখোঁজ ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের বিষয়ে বিচার দাবি করেন তিনি।

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাটি চলছে। বুধবার মামলায় আব্বাস মল্লিকের সাক্ষ্যগ্রহণ চলছিল।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সাংবাদিক সুরক্ষা ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে তেজগাঁও রেলস্টেশন ও কারওয়ান বাজারে ৩০০ অসহায় মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ

‘বন্দিদের পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলতেন জিয়া স্যার’

আপডেট সময় ০৮:৪৬:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক গুম-খুনের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী ট্রলার মাঝি আব্বাস মল্লিক। তিনি জানিয়েছেন, ২০১০ ও ২০১১ সালে র‍্যাবের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান মাঝরাতে বন্দিদের নিয়ে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় যেতেন। পরে তাদের গুলি করে পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে বলেশ্বর নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে মামলাটির দশম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আব্বাস মল্লিক।

সাক্ষ্যে আব্বাস মল্লিক বলেন, অভিযানের দিন বিকেলে সাদা পোশাকে দুই র‍্যাব সদস্য স্থানীয় দোকানদারদের সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ করে বাতি নিভিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিতেন। এরপর রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে র‍্যাবের চার থেকে পাঁচটি মাইক্রোবাস বরফ মিলের সামনে আসত। ঢাকা থেকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় বন্দিদের এনে ট্রলারে তোলা হতো।

তার দাবি, ট্রলার ছাড়ার সময় র‍্যাব সদস্যরা রশি ও সিমেন্টের বস্তা সঙ্গে নিতেন। বন্দিদের নিয়ে ট্রলারটি বলেশ্বর নদীর গভীর পানিতে যাওয়ার পর গতি কমিয়ে দেওয়া হতো। এরপর চোখ ও হাত বাঁধা বন্দিদের একজন একজন করে ট্রলারের বাইরে আনা হতো।

আব্বাস মল্লিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রলারের দুই পাশে থাকা সাপোর্টের মধ্যে দুই র‍্যাব সদস্য বন্দিকে চেপে ধরে রাখতেন। এরপর জিয়াউল আহসান নিজে গিয়ে বন্দির মাথা, কান অথবা বুকে গুলি করতেন।

‘মরদেহ ভেসে ওঠা ঠেকাতে পেট কেটে দিতেন’
সাক্ষ্যে আব্বাস মল্লিক আরও দাবি করেন, গুলি করে হত্যার পর মৃতদেহের গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। মরদেহ যাতে পানিতে ভেসে না ওঠে, সে জন্য নদীতে ফেলার আগে পেট কেটে দেওয়া হতো বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, অনেক বন্দিকে সুন্দরবনে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হতো। পরে সাংবাদিকদের ডেকে এনে ঘটনাকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে দেখানো এবং মরদেহ থানায় হস্তান্তর করা হতো।

হত্যাকাণ্ড শেষে বরফ মিলে ফিরে এলে মাঝিদের খামে করে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হতো বলেও সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন আব্বাস মল্লিক।

নিখোঁজ ভাইয়ের কথাও বললেন আব্বাস
সাক্ষ্যে নিজের ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন আব্বাস। তার দাবি, আলকাছের দুটি ট্রলার ছিল এবং তিনি র‍্যাবের সঙ্গে কাজ করতেন। পরে র‍্যাবের কর্মকাণ্ডের কথা স্থানীয় বাজারে আলোচনা করায় অন্য বোটের মালিকেরা তাকে সতর্ক করেছিলেন যে, র‍্যাব তার ওপর ক্ষুব্ধ।

আব্বাসের ভাষ্য, ২০১১ সালের মাঝামাঝি একদিন দুপুরের খাবার খেয়ে আলকাছ বাড়ি থেকে বের হন। তাকে ফোন করে বলা হয়েছিল, ‘জিয়া স্যার’ তাকে বটতলা-মানিকখালী এলাকায় ডেকেছেন। ওই দিন সন্ধ্যার পর থেকেই আলকাছের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর আর তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

ভাইয়ের সন্ধানে খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকার র‍্যাব কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কোনো তথ্য পাননি বলে জানান আব্বাস। পাথরঘাটা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে জিয়াউল আহসান ও র‍্যাবের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পুলিশ অস্বীকৃতি জানায় বলেও সাক্ষ্যে দাবি করেন তিনি।

জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে কাঠগড়ায় থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে শনাক্ত করেন আব্বাস মল্লিক। একই সঙ্গে নিখোঁজ ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের বিষয়ে বিচার দাবি করেন তিনি।

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাটি চলছে। বুধবার মামলায় আব্বাস মল্লিকের সাক্ষ্যগ্রহণ চলছিল।