ঢাকা ০২:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
“বন কর্মকর্তা সামছু উদ্দিনের দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তে দুদক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পি এসের কক্ষে বসাকে কেন্দ্র করে পিয়ন সুমনকে শোকজ ৩০ দিনের মধ্যেই অন্য বিভাগে পদায়ন নদীবন্দর শাখার সাবেক কর্মকর্তা আরিফ উদ্দিনের এমপির স্বাক্ষর জাল করে ১০০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার চেষ্টা অভিযোগের কেন্দ্রে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক আকতার জাহান কাঁকন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশনের কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক ইউসুফের অঢেল সম্পদের পাহাড় ইউএইচএফ টেন্ডারে ‘মটোরোলা ফাঁদ’ বিপাকে ডিপিডিসি ময়মনসিংহের ডেপুটি রেঞ্জার ইসমাইলের বিরুদ্ধে ‘ঘর বাণিজ্যের’ অভিযোগ ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারেও থামেনি সাজ্জাদ বাহিনী, চিন্তায় পুলিশ

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশনের কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ

সারাদেশের মতো নানাভাবে চাঁদাবাজির শিকার রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সহস্রাধিক ঠিকাদার। রেলওয়ে দপ্তর থেকে প্রাপ্ত প্রতিটি টেন্ডারের মূল বাজেটের ২%-৩% কমিশন দিতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে। অন্যথায় টেন্ডার কার্যক্রমে অংশ নেওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে ঠিকাদারদের।

ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপি ও নেতার নাম ভাঙিয়ে গঠিত ঠিকাদার এসোসিয়েশন এই চাঁদাবাজিতে লিপ্ত। যার মুলে রয়েছেন মাফিয়া ডন খ্যাত রেলখেকো ঠিকাদার শাহ আলম। যার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের কর্মী স্টুয়ার্ড মাহবুর রহমানকে (২০) গত ৪ আগস্ট ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে ৪ হাজার ৮৫০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

বর্তমানে সেই কর্মী জেলে থাকলেও অধরা রয়ে গেছেন এস এ কর্পোরেশনের কর্ণধার শাহ আলম। ঠিক একইভাবে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে রেলওয়ে ঠিকাদার এসোসিয়েশনের মাধ্যমে সদর্পে চাঁদাবাজি করে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। যা দেখার কেউ নেই। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের।

ঠিকাদাররা জানান, রেলওয়ে ঠিকাদার এসোেিসয়শনের মাধ্যমে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে প্রতিটি টেন্ডার থেকে কমিশন আদায় করতেন চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের নেতা হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত সন্ত্রাসী হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। তখন তার অন্যতম সহযোগী ছিলেন শাহ আলম। যিনি তখন খাটি আওয়ামী লীগার ছিলেন।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি ও নেতার সাথে গা ঢাকা দেয়। ওই সময় থেকে পালিয়ে তিনি দুবাই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। এরপর ঠিকাদারদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসলেও তা বেশিদিন ঠিকেনি। কারণ বাবরের চাঁদাবাজি পুরোটাই দখলে নেন শাহ আলম।

এক্ষেত্রে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি নেতা শফিকুর রহমান স্বপনকে রেলওয়ে ঠিকাদার এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক হিসেবে সামনে নিয়ে আসেন। আর শাহ আলম হয়ে যান সদস্য সচিব। এ নিয়ে ঠিকাদারদের মাঝে অসন্তুষ দেখা দিলেও কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। এই সুযোগে ঠিকাদার এসোসিয়েশন দখলে রাখতে কোনরকম নির্বাচনের পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি।

ঠিকাদারদের মতে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ঢাকা ও চট্টগ্রামে মিলে প্রায় এক হাজার ২০০ এর মতো রেলওয়ে নিবন্ধিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু নিবন্ধিত ঠিকাদার নিয়ে গঠিত ঠিকাদার এসোসিয়েশন সম্পূর্ণ অবৈধ। এই সংগঠনের কোন রেজিষ্ট্রেশন নেই। ফলে সংগঠন পরিচালনার কোন নিয়ম-নীতিও নেই। রেজিস্ট্রেশনের উদ্যোগও নেওয়া হয়নি কোন সময়। এর মুল কারণ লুটেপুটে খাওয়া।

সূত্র মতে, ঠিকাদারদের প্রাপ্ত টেন্ডার থেকে হাতিয়ে নেওয়া ২%-৩% কমিশনের অর্থ কোথায় যায়, কোন খাতে ব্যয় হয় তা ঠিকাদারদের কেউ জানে না। জানে শুধু শাহ আলম। যিনি রেলের রাজা খ্যাত। শুধু তাই নয়, তিনি মাফিয়া ডন শাহ আলম, ডিজে শাহ আলম, চাঁদাবাজ শাহ আলম, টেন্ডারের গডফাদার শাহ আলম ও ভুমিদস্যু শাহ আলম নামেও বিখ্যাত। আর এসব নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে সিরিজ অপরাধের গল্প।

ধারাবাহিক এই গল্পের দ্বিতীয় পর্বে চাঁদাবাজির গল্প শুনিয়েছেন ক্ষুব্দ ঠিকাদাররা। যারা নিজেদের নাম পরিচয় প্রকাশ করতেও ভয় পান। কারণ এই শাহ আলমের পেছনে সবচেয়ে বড় খুটি এখন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এক মন্ত্রী। যাদের ভয়ে নিরব থাকেন রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। যারা শাহ আলমের কথামতো রেলওয়ের টেন্ডার দিতে বাধ্য হয়।

এছাড়া রেল ভবনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও রেলপথ মন্ত্রী-সচিবের সাথেও তার দারুণ সখ্যতার ভয় দেখান তিনি। এমনকি আত্নীয় পরিচয়ও দেন। বিগত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের সময় রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনকে আত্নীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন তিনি। মন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দেওয়া ছবি ফেসবুক ওয়ালে রেখে তা দেখাতেন তিনি।

কিন্তু ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রূপ পাল্টান বহুরূপী শাহ আলম। সুযোগ বুঝে তিনি এখন খাটি বিএনপি। রূপ বদলালেও স্বভাব বদলায়নি শাহ আলম। বিএনপি পরিচয়ে রেলওয়ে ঠিকাদার এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক কমিটির নাম ভাঙিয়ে রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের বিভিন্ন খাত থেকে শুরু করেন চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি।

ঠিকাদাররা জানান, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগ, কমার্শিয়াল বিভাগ, সরঞ্জাম ক্রয় বিভাগ, ভু-সম্পত্তি বিভাগ, নিরাপত্তা বিভাগসহ সকল বিভাগের টেন্ডার থেকে ২% থেকে ৩% হারে চাঁদা আদায় করছেন তিনি। কিন্তু চাঁদাবাজির এই টাকা কোথায় যাই, কি করছে তার কোন হদিস নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, টেন্ডার পাওয়ার পর দাবিকৃত হারে নগদ টাকা চাঁদা বুঝিয়ে দিতে হয় ঠিকাদার এসোসিয়েশনের সদস্য সচিব শাহ আলমকে। অন্যথায় টেন্ডারের কার্যাদেশ পেতে ভোগান্তির শিকার হতে হয় নানা কৌশলে। একইসাথে নির্দিষ্টহারে টেবিলে টেবিলেও ঘুষ দিতে হয়। ফলে বাজেটের ৬০ শতাংশও মিলে না বাস্তবায়ন কাজে।

অপর এক ঠিকাদার বলেন, রেলওয়ে থেকে প্রাপ্ত টেন্ডারের মূল বাজেট থেকে ২%-৩% কমিশন ঠিকাদার এসোসিয়েশনে জমা দিতে হয়। তা না হলে নিজের হাতে তৈরী করা টেন্ডার আর ঠিকাদারদের কপালে জুটে না। এই টেন্ডার পাওয়ার জন্য অন্য ঠিকাদারদের লেলিয়ে দেয় ঠিকাদার এসোসিয়েশনের দখলদার শাহ আলম। এক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ওপরও প্রভাব খাটান তিনি। এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতেও রাজী হননি রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ঠিকাদাররা বলেন, প্রধান প্রকৌশলসহ বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে প্রতি অর্থবছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার অবকাঠামোর উন্নয়ন কাজের টেন্ডার হয়। যেখান থেকে ২%-৩% হিসেবে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় ঠিকাদার এসেসিয়েশন। এই টাকা কোথায় যায়, কোন খাতে ব্যয় হয় তা কারোই জানা নেই।

এছাড়া শাহ আলম ঠিকাদার এসোসিয়েশন ও বিএনপি পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে প্রকৌশল বিভাগ, কমার্শিয়াল বিভাগ থেকে নিজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের নামে বছরে আরও ৪০০-৪০০ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগিয়ে নেন। এ জন্য তাকে রেলের রাজা শাহ আলম, মাফিয়া শাহ আলম বলা হয়। আর এই চাঁদাবাজি ঘিরে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে, দুই পক্ষ শাহ আলমের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এস এ কর্পোরেশনের স্বত্তাধিকারি মো. শাহ আলম বলেন, ঠিকাদার থেকে কোন চাঁদা নেওয়া হয় না। তবে টেন্ডার থেকে ১% নেওয়া হয় বাৎসরিক পিকনিক বা ঠিকাদারদের সহযোগীতার জন্য। বিগত সময়ে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ৫% হারে চাঁদা নিলেও ভয়ে কেউ কোন কথা বলেনি। এখন আমার বিরুদ্ধে নেমেছে। অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও তিনি তার কোন সদুত্তর দেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ঠিকাদার এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক শফিকুর রহমান স্বপন বলেন, ঠিকাদার এসোসিয়েশনের জন্য কিছু টাকা ঠিকাদাররা দেন, তবে ওই টাকা ফোর্স করে নেওয়া হয় না। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা এসোসিয়েশন করেছি, ঠিকাদারদের সহযোগীতা করার জন্য। সকল ঠিকাদার যেন ভালভাবে সমানতালে টেন্ডার পায় তা তদারকি করার জন্য।

আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, টেন্ডার কাজ থেকে সংগৃহীত অর্থ ঠিকাদারদের সহযোগীতায় ব্যয় হয়। তবে এ বিষয়ে সবকিছু আমি মোবাইলে বলতে পারছি না। আপনার সাথে বসে কথা বলব। তবে শাহ আলম যদি আকাম করে তা হলে আমি তার সাথে নাই। আমি রাজনীতি করি, আমার এসব আকামের দরকার নাই।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

“বন কর্মকর্তা সামছু উদ্দিনের দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তে দুদক

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশনের কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ

আপডেট সময় ০১:২২:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

সারাদেশের মতো নানাভাবে চাঁদাবাজির শিকার রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সহস্রাধিক ঠিকাদার। রেলওয়ে দপ্তর থেকে প্রাপ্ত প্রতিটি টেন্ডারের মূল বাজেটের ২%-৩% কমিশন দিতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে। অন্যথায় টেন্ডার কার্যক্রমে অংশ নেওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে ঠিকাদারদের।

ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপি ও নেতার নাম ভাঙিয়ে গঠিত ঠিকাদার এসোসিয়েশন এই চাঁদাবাজিতে লিপ্ত। যার মুলে রয়েছেন মাফিয়া ডন খ্যাত রেলখেকো ঠিকাদার শাহ আলম। যার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের কর্মী স্টুয়ার্ড মাহবুর রহমানকে (২০) গত ৪ আগস্ট ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে ৪ হাজার ৮৫০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

বর্তমানে সেই কর্মী জেলে থাকলেও অধরা রয়ে গেছেন এস এ কর্পোরেশনের কর্ণধার শাহ আলম। ঠিক একইভাবে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে রেলওয়ে ঠিকাদার এসোসিয়েশনের মাধ্যমে সদর্পে চাঁদাবাজি করে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। যা দেখার কেউ নেই। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের।

ঠিকাদাররা জানান, রেলওয়ে ঠিকাদার এসোেিসয়শনের মাধ্যমে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে প্রতিটি টেন্ডার থেকে কমিশন আদায় করতেন চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের নেতা হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত সন্ত্রাসী হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। তখন তার অন্যতম সহযোগী ছিলেন শাহ আলম। যিনি তখন খাটি আওয়ামী লীগার ছিলেন।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি ও নেতার সাথে গা ঢাকা দেয়। ওই সময় থেকে পালিয়ে তিনি দুবাই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। এরপর ঠিকাদারদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসলেও তা বেশিদিন ঠিকেনি। কারণ বাবরের চাঁদাবাজি পুরোটাই দখলে নেন শাহ আলম।

এক্ষেত্রে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি নেতা শফিকুর রহমান স্বপনকে রেলওয়ে ঠিকাদার এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক হিসেবে সামনে নিয়ে আসেন। আর শাহ আলম হয়ে যান সদস্য সচিব। এ নিয়ে ঠিকাদারদের মাঝে অসন্তুষ দেখা দিলেও কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। এই সুযোগে ঠিকাদার এসোসিয়েশন দখলে রাখতে কোনরকম নির্বাচনের পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি।

ঠিকাদারদের মতে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ঢাকা ও চট্টগ্রামে মিলে প্রায় এক হাজার ২০০ এর মতো রেলওয়ে নিবন্ধিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু নিবন্ধিত ঠিকাদার নিয়ে গঠিত ঠিকাদার এসোসিয়েশন সম্পূর্ণ অবৈধ। এই সংগঠনের কোন রেজিষ্ট্রেশন নেই। ফলে সংগঠন পরিচালনার কোন নিয়ম-নীতিও নেই। রেজিস্ট্রেশনের উদ্যোগও নেওয়া হয়নি কোন সময়। এর মুল কারণ লুটেপুটে খাওয়া।

সূত্র মতে, ঠিকাদারদের প্রাপ্ত টেন্ডার থেকে হাতিয়ে নেওয়া ২%-৩% কমিশনের অর্থ কোথায় যায়, কোন খাতে ব্যয় হয় তা ঠিকাদারদের কেউ জানে না। জানে শুধু শাহ আলম। যিনি রেলের রাজা খ্যাত। শুধু তাই নয়, তিনি মাফিয়া ডন শাহ আলম, ডিজে শাহ আলম, চাঁদাবাজ শাহ আলম, টেন্ডারের গডফাদার শাহ আলম ও ভুমিদস্যু শাহ আলম নামেও বিখ্যাত। আর এসব নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে সিরিজ অপরাধের গল্প।

ধারাবাহিক এই গল্পের দ্বিতীয় পর্বে চাঁদাবাজির গল্প শুনিয়েছেন ক্ষুব্দ ঠিকাদাররা। যারা নিজেদের নাম পরিচয় প্রকাশ করতেও ভয় পান। কারণ এই শাহ আলমের পেছনে সবচেয়ে বড় খুটি এখন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এক মন্ত্রী। যাদের ভয়ে নিরব থাকেন রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। যারা শাহ আলমের কথামতো রেলওয়ের টেন্ডার দিতে বাধ্য হয়।

এছাড়া রেল ভবনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও রেলপথ মন্ত্রী-সচিবের সাথেও তার দারুণ সখ্যতার ভয় দেখান তিনি। এমনকি আত্নীয় পরিচয়ও দেন। বিগত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের সময় রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনকে আত্নীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন তিনি। মন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দেওয়া ছবি ফেসবুক ওয়ালে রেখে তা দেখাতেন তিনি।

কিন্তু ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রূপ পাল্টান বহুরূপী শাহ আলম। সুযোগ বুঝে তিনি এখন খাটি বিএনপি। রূপ বদলালেও স্বভাব বদলায়নি শাহ আলম। বিএনপি পরিচয়ে রেলওয়ে ঠিকাদার এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক কমিটির নাম ভাঙিয়ে রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের বিভিন্ন খাত থেকে শুরু করেন চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি।

ঠিকাদাররা জানান, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগ, কমার্শিয়াল বিভাগ, সরঞ্জাম ক্রয় বিভাগ, ভু-সম্পত্তি বিভাগ, নিরাপত্তা বিভাগসহ সকল বিভাগের টেন্ডার থেকে ২% থেকে ৩% হারে চাঁদা আদায় করছেন তিনি। কিন্তু চাঁদাবাজির এই টাকা কোথায় যাই, কি করছে তার কোন হদিস নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, টেন্ডার পাওয়ার পর দাবিকৃত হারে নগদ টাকা চাঁদা বুঝিয়ে দিতে হয় ঠিকাদার এসোসিয়েশনের সদস্য সচিব শাহ আলমকে। অন্যথায় টেন্ডারের কার্যাদেশ পেতে ভোগান্তির শিকার হতে হয় নানা কৌশলে। একইসাথে নির্দিষ্টহারে টেবিলে টেবিলেও ঘুষ দিতে হয়। ফলে বাজেটের ৬০ শতাংশও মিলে না বাস্তবায়ন কাজে।

অপর এক ঠিকাদার বলেন, রেলওয়ে থেকে প্রাপ্ত টেন্ডারের মূল বাজেট থেকে ২%-৩% কমিশন ঠিকাদার এসোসিয়েশনে জমা দিতে হয়। তা না হলে নিজের হাতে তৈরী করা টেন্ডার আর ঠিকাদারদের কপালে জুটে না। এই টেন্ডার পাওয়ার জন্য অন্য ঠিকাদারদের লেলিয়ে দেয় ঠিকাদার এসোসিয়েশনের দখলদার শাহ আলম। এক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ওপরও প্রভাব খাটান তিনি। এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতেও রাজী হননি রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ঠিকাদাররা বলেন, প্রধান প্রকৌশলসহ বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে প্রতি অর্থবছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার অবকাঠামোর উন্নয়ন কাজের টেন্ডার হয়। যেখান থেকে ২%-৩% হিসেবে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় ঠিকাদার এসেসিয়েশন। এই টাকা কোথায় যায়, কোন খাতে ব্যয় হয় তা কারোই জানা নেই।

এছাড়া শাহ আলম ঠিকাদার এসোসিয়েশন ও বিএনপি পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে প্রকৌশল বিভাগ, কমার্শিয়াল বিভাগ থেকে নিজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের নামে বছরে আরও ৪০০-৪০০ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগিয়ে নেন। এ জন্য তাকে রেলের রাজা শাহ আলম, মাফিয়া শাহ আলম বলা হয়। আর এই চাঁদাবাজি ঘিরে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে, দুই পক্ষ শাহ আলমের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এস এ কর্পোরেশনের স্বত্তাধিকারি মো. শাহ আলম বলেন, ঠিকাদার থেকে কোন চাঁদা নেওয়া হয় না। তবে টেন্ডার থেকে ১% নেওয়া হয় বাৎসরিক পিকনিক বা ঠিকাদারদের সহযোগীতার জন্য। বিগত সময়ে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ৫% হারে চাঁদা নিলেও ভয়ে কেউ কোন কথা বলেনি। এখন আমার বিরুদ্ধে নেমেছে। অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও তিনি তার কোন সদুত্তর দেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ঠিকাদার এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক শফিকুর রহমান স্বপন বলেন, ঠিকাদার এসোসিয়েশনের জন্য কিছু টাকা ঠিকাদাররা দেন, তবে ওই টাকা ফোর্স করে নেওয়া হয় না। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা এসোসিয়েশন করেছি, ঠিকাদারদের সহযোগীতা করার জন্য। সকল ঠিকাদার যেন ভালভাবে সমানতালে টেন্ডার পায় তা তদারকি করার জন্য।

আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, টেন্ডার কাজ থেকে সংগৃহীত অর্থ ঠিকাদারদের সহযোগীতায় ব্যয় হয়। তবে এ বিষয়ে সবকিছু আমি মোবাইলে বলতে পারছি না। আপনার সাথে বসে কথা বলব। তবে শাহ আলম যদি আকাম করে তা হলে আমি তার সাথে নাই। আমি রাজনীতি করি, আমার এসব আকামের দরকার নাই।