ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ইউএইচএফ রেডিও কমিউনিকেশন সিস্টেম কেনার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। দরপত্র প্রকাশের মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে প্রি-বিড সভা আয়োজন, কারিগরি স্পেসিফিকেশনে নির্দিষ্ট একটি ব্র্যান্ডের স্বত্বাধিকারী প্রযুক্তি যুক্ত করা এবং পরবর্তী সময়ে দরপত্রের সময়সূচি ও আর্থিক শর্ত পরিবর্তনের ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সাজানো হয়ে থাকতে পারে, যাতে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান সুবিধা পায় এবং অন্য ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
ডিপিডিসির নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ‘জি/সিই-এসসিএস/২৫-২৬/০০৭’ প্যাকেজের আওতায় দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্যমান ভিএইচএফ কমিউনিকেশন সিস্টেমকে ইউএইচএফ সিস্টেমে রূপান্তরের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয় ১৫ জুলাই ২০২৬ সকাল ৯টায়। একই দিন দুপুর ২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত প্রি-বিড সভার সময় নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ, দরপত্র প্রকাশের মাত্র পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানেই সভাটি আয়োজন করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, দরপত্র প্রকাশের পর নথি পর্যালোচনা, কারিগরি শর্ত বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশ্ন প্রস্তুতের জন্য যেখানে স্বাভাবিকভাবেই সময় প্রয়োজন, সেখানে এত অল্প সময়ের মধ্যে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সভায় কার্যকরভাবে অংশ নেওয়া কতটা সম্ভব?
সময়সূচিতেও পরিবর্তন
প্রথম দফায় দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ৩০ জুলাই এবং ২ আগস্ট দরপত্র খোলার কথা ছিল। পরে সংশোধনের মাধ্যমে দরপত্র খোলার তারিখ ৬ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে দরপত্রের আর্থিক শর্তেও পরিবর্তন আনার অভিযোগ রয়েছে। তবে কতটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে এবং অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কারা ‘রেসপন্সিভ’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছেÑ এ তথ্য প্রকাশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনীহা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দরপত্রসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই প্যাকেজে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। দরপত্রের জামানত নির্ধারণ করা হয় ১৫ লাখ টাকা। ডিপিডিসির নিজস্ব অর্থায়নে বিদ্যমান ভিএইচএফ ব্যবস্থা ইউএইচএফে রূপান্তরের কথা রয়েছে।
স্পেসিফিকেশনে ‘মটোরোলা প্রযুক্তি’
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে দরপত্রের কারিগরি স্পেসিফিকেশন নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, কার্য সম্পাদনভিত্তিক বা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত উন্মুক্ত প্রযুক্তিগত মানের পরিবর্তে নির্দিষ্ট একটি ব্র্যান্ডের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রেডিও যোগাযোগব্যবস্থায় বহুল ব্যবহৃত ডিএমআর (ডিজিটাল মোবাইল রেডিও) স্ট্যান্ডার্ডের পাশাপাশি স্পেসিফিকেশনে মটোরোলার স্বত্বাধিকারী ‘ক্যাপাসিটি প্লাস’, ‘ক্যাপাসিটি ম্যাক্স’ ও ‘কানেক্ট প্লাস’ প্রযুক্তির শর্ত যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রযুক্তিসংশ্লিষ্টদের মতে, আইকম, হাইটেরা, টাইটান, কেনউডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ডিভাইস ডিএমআর স্ট্যান্ডার্ডে কাজ করলেও মটোরোলার নির্দিষ্ট এসব প্রোটোকলের সঙ্গে সেগুলোর পূর্ণ সামঞ্জস্য না-ও থাকতে পারে। ফলে কাগজে দরপত্র উন্মুক্ত থাকলেও বাস্তবে অন্য ব্র্যান্ডের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ওয়াই-ফাই নিয়েও প্রশ্ন
বেস রেডিওর ক্ষেত্রে ‘ওয়াই-ফাই সাপোর্টেড’ সুবিধা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার ইউএইচএফ যোগাযোগ প্রকল্পে এ প্রযুক্তি কেন অপরিহার্য, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জ¦ালানি ও ক্রয় বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলমের মতে, প্রকল্পের কার্যপরিধিতে ওয়াই-ফাই বা নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করা দরকার। তার ভাষ্য, টেন্ডারের স্পেসিফিকেশন ও সময়সূচি বিশ্লেষণ করলে নির্দিষ্ট একটি ব্র্যান্ডকে সুবিধা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি সরকারি উচ্চপর্যায় থেকে পুনঃযাচাই করা প্রয়োজন।
‘নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডকে সুবিধার সুযোগ নেই’
অভিযোগের বিষয়ে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (আইসিটি অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট) মো. রবিউল হাসান বলেন, ইউএইচএফ রেডিও ডিভাইসের টেন্ডার সম্পর্কে এসসিএডিএ বিভাগ ভালো বলতে পারবে। নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ডকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে দরপত্র প্রকাশের দিনই প্রি-টেন্ডার সভা হয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। ডিপিডিসিতে গত পাঁচ মাস ধরে স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নেই। ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুন নাহারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশ টেলিকমের পুরোনো অভিজ্ঞতাও আলোচনায়
এরই মধ্যে ডিপিডিসির এই ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে মটোরোলার স্থানীয় প্রতিনিধিত্বকারী এমডিএম ট্রেডার্স লিমিটেডের অতীত ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ পুলিশ টেলিকমে মটোরোলার রেডিও ডিভাইস সরবরাহে প্রায় একচেটিয়া সুবিধা পেয়েছিল। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পুলিশ টেলিকমের রেডিও ডিভাইস ক্রয়ের ৪১টি টেন্ডারের মধ্যে ৪০টিতেই প্রতিষ্ঠানটি কাজ পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব সরবরাহের মোট মূল্য ছিল প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। তবে অতীতের এসব অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান ডিপিডিসি টেন্ডারের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, প্রয়োজনভিত্তিক কারিগরি শর্ত এবং স্বচ্ছ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা না হলে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বিতর্কিত এই টেন্ডার প্রক্রিয়া পুনঃপর্যালোচনা এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















