চাঁদপুর জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মোঃ আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম, নিয়োগ ও পদায়নে বিধি লঙ্ঘন, দলিল রেজিস্ট্রেশনে যোগসাজশ এবং বিভিন্ন কাজে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মহাপরিদর্শক, নিবন্ধন বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগে আলমগীরের সঙ্গে মতলব (দক্ষিণ) সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক মোঃ মহসিন প্রধানের যোগসাজশেরও অভিযোগ করা হয়েছে।
৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে দেওয়া অভিযোগপত্রে সালাহউদ্দিন আহমেদ দাবি করেন, মোঃ আলমগীর ২০০৪ সালে মাস্টার রোলের মাধ্যমে টিসি সহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি উচ্চমান সহকারী এবং পরে প্রধান সহকারী হিসেবে পদোন্নতি পান। অভিযোগকারীর দাবি, তার নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরির ধারাবাহিকতা সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিধি অনুযায়ী হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের ২৯ মে স্মারক নম্বর ৬৩৫৬ (২০)-এর মাধ্যমে আলমগীরকে নোয়াখালী জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ওই বদলির পর যথাযথভাবে রিলিজ নেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, পরবর্তীতে সাবেক জেলা রেজিস্ট্রারের সঙ্গে যোগসাজশ করে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে টিসি শাখা থেকে রাজস্ব খাতে প্রধান সহকারী হিসেবে রেজিস্ট্রেশন শাখায় আসেন তিনি। এ বিষয়ে বদলি আদেশ, রিলিজ আদেশ, যোগদানপত্র এবং সংশ্লিষ্ট অফিস নথি যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আলমগীরের বিরুদ্ধে মতলব (দক্ষিণ) সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক মোঃ মহসিন প্রধানের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও আনা হয়েছে। মহসিন প্রধানের পিতা মৃত হাবিবুল্লাহ প্রধান এবং দলিল লেখার সনদ নম্বর ৬৯ বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, আলমগীরের সহযোগিতায় ওই দলিল লেখক বিভিন্ন সময়ে প্রতারণামূলকভাবে দলিল প্রস্তুত ও রেজিস্ট্রি করিয়ে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন।
এ অভিযোগের অন্যতম প্রধান ঘটনা ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ নিবন্ধিত ১৫০৫ নম্বর হেবা দলিলকে ঘিরে। অভিযোগকারী সালাহউদ্দিন আহমেদ দাবি করেন, তার মা লতিফা খাতুন ছিলেন বয়োবৃদ্ধ ও সরল-সাদাসিধে। তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে দলিল লেখক মহসিন প্রধান তাকে ভুল বুঝিয়ে একটি হেবা দলিল তৈরি করেন। পরে উম্মে মারজানকে গ্রহীতা দেখিয়ে এবং তার স্বামী সাব্বির আহমেদ রিজভী ও মাতা নিগার সুলতানার সঙ্গে যোগসাজশ করে দলিলটি রেজিস্ট্রি করা হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এ কাজে মোঃ আলমগীরও অনৈতিকভাবে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগকারীর দাবি।
অভিযোগপত্রে হেবা দলিলটির দুই সাক্ষী হিসেবে রবিউল ইসলাম, পিতা আব্দুর রব খান এবং শাহ আলম, পিতা সিদ্দিকুর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের উভয়ের ঠিকানা চাঁদপুর সদর উপজেলার কুমারডুগি এলাকায় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, তারা ওই দলিলের সঙ্গে কীভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অভিযোগে বলা হয়, লতিফা খাতুন পরবর্তীতে জানতে পারেন যে তাকে ভুল বুঝিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। এরপর তিনি নিজে বাদী হয়ে দলিল বাতিলের জন্য আদালতে ৩৪/২০২৪ নম্বর মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে মামলাটি পরিচালনার জন্য তিনি তার ছেলে সালাহউদ্দিন আহমেদের কাছে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেন। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, মামলাটি বর্তমানে চলমান। পরে লতিফা খাতুন দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর মারা যান।
সালাহউদ্দিন আহমেদ অভিযোগে আরও জানান, ২০২৩ সালের ২৩ মে তিনি সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক মহসিন প্রধানের বিরুদ্ধে মহাপরিদর্শক, নিবন্ধন, বাংলাদেশ, ঢাকা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের পর জেলা রেজিস্ট্রার, চাঁদপুর বিষয়টি তদন্ত করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তদন্তের প্রতিবেদন বা সিদ্ধান্ত তিনি পাননি বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারী।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন যে জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখকের অপরাধের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। তার দাবি, জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মোঃ আলমগীরের সহযোগিতায় দলিল লেখকের বিরুদ্ধে সনদ বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, হেবা গ্রহীতার মাতা নিগার সুলতানার কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল ও ব্যবস্থা গ্রহণে গড়িমসি করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আলমগীর ও দলিল লেখক মহসিন প্রধানের বিরুদ্ধে উমরাহ হজ পালনের জন্য অর্থ গ্রহণের অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, হেবা গ্রহীতার পরিবারের কাছ থেকে এ উদ্দেশ্যে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে নিবন্ধন অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কর্মকর্তা মাহফুজ আলমের কাছেও অভিযোগ করা হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, মাহফুজ আলম তাকে জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে আবেদন করার পরামর্শ দেন এবং পরবর্তীতে তিনি চাঁদপুর জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে সরেজমিনে তদন্তেও যান। তবে অভিযোগকারীর দাবি, এরপরও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে মোঃ আলমগীরের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ হলো, সাব-রেজিস্ট্রার পদায়নের জন্য মন্ত্রণালয়ে উৎকোচ দেওয়ার কথা বলে হেবা গ্রহীতার মাতা নিগার সুলতানার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা গ্রহণ করা। অভিযোগকারীর দাবি, বিভিন্ন সময়ে নিগার সুলতানাকে জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে টাকা নেওয়া হয়েছে এবং সাব-রেজিস্ট্রার পদায়নের বিষয়টি বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারী সালাহউদ্দিন আহমেদ নিজেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেছেন, তার পৈতৃক ভিটায় তিনি নিয়মিত বসবাস না করার সুযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক ও অন্যান্য ব্যক্তিরা তার পরিবারের সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। তার দাবি, এ ঘটনায় শুধু দলিল লেখক নয়, জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকাও তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, আলমগীর জেলার বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের দলিল রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেন। অভিযোগকারীর দাবি, তিনি বিভিন্ন দলিলে স্বাক্ষর না করে বা দলিলের কাজে বাধা সৃষ্টি করে দলিলপ্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেন। তবে এই অভিযোগের সুনির্দিষ্ট দলিল, তারিখ, সংশ্লিষ্ট কার্যালয় এবং অর্থ লেনদেনের প্রমাণ অভিযোগপত্রে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসের রেজিস্টার, নথি, সিসিটিভি ফুটেজ, লেনদেনের তথ্য এবং সেবাগ্রহীতাদের বক্তব্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীর দাবি, মোঃ আলমগীরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এবং তার প্রভাবের কারণে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর কার্যকর তদন্ত ও নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এ কারণে তিনি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মহাপরিদর্শক, নিবন্ধন অধিদপ্তর, ঢাকাকেও অভিযোগের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের সঙ্গে ২৮ মার্চ ২০২৩ তারিখের ১৫০৫ নম্বর হেবা দলিলের ফটোকপি সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারী সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক মোঃ মহসিন প্রধান এবং জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মোঃ আলমগীরের বিরুদ্ধে তদন্তের পাশাপাশি তাদের সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন, পদায়ন ও বদলি সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলোর মধ্যে কয়েকটি সরাসরি আদালতে বিচারাধীন। বিশেষ করে ১৫০৫ নম্বর হেবা দলিল বাতিলের জন্য দায়ের করা ৩৪/২০২৪ নম্বর মামলার বিষয়টি আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আদালতের রায় বা তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ ৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে দেওয়া আবেদনে অভিযোগগুলোর সরেজমিন তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং অভিযোগ সত্য হলে মোঃ আলমগীর ও দলিল লেখক মোঃ মহসিন প্রধানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন। এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, নিবন্ধন অধিদপ্তর ও জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় এসব অভিযোগের বিষয়ে কী ধরনের তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ করে, সেটিই দেখার বিষয়।
সংবাদ শিরোনাম ::
চাঁদপুর জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের প্রধান সহকারী আলমগীরের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৫:৫২:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
- ৫০৯ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















