শুক্রবার সকালে পারকি সৈকতে হঠাৎ হৈচৈ। স্থানীয় মানুষ দেখলেন সমুদ্র সৈকতের চরে বসে গেছে স্কাভেটর আর ড্রেজার। মাটি আর বালু উঠছে। প্রশ্ন করতেই বলা হলো, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কাজ চলছে। কিন্তু মানলেন না স্থানীয়রা। জড়ো হয়ে বাধা দিলেন।
শেষে চাপের মুখে যন্ত্র ফেলে পালিয়ে যায় মাটি আর বালু উত্তোলনকারীরা। খবর পেয়ে ভূমি অফিস ও পুলিশ এসে জব্দ করলেন মাটি ও বালু উত্তোলন যন্ত্র স্কাভেটর ও ড্রেজার। স্থানীয়দের অভিযোগ, পারকি লুসাই পার্ক নামের একটি রেস্টুরেন্টের লোকজন নিজেদের স্থাপনা ভাঙন থেকে রক্ষা করতে সৈকতের চর থেকে বালু-মাটি তুলে জিও ব্যাগ বসাচ্ছিলেন। আর কাজটিকে পাউবোর নামে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
পারকি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, লুসাই পার্কের ভাঙন ঠেকাতে তারা পারকি সৈকতে স্কাভেটর ও ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি খনন করছে। বাধা দিলেও মানছে না। বালু উত্তোলনের কারণে সৈকতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বালিয়াড়ি এখন ধ্বংসের মুখে। ব্যক্তিগত স্থাপনা বাঁচাতে পুরো পারকি সৈকতকে বিপদে ফেলা হচ্ছে। সৈকত রক্ষার নামে সৈকতই শেষ করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লুসাই পার্ক রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আকবর খানের মুখে নির্লজ্জ কথন, এটা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ। লুসাইয়ের মাটি ও বালুর দরকার নেই। লুসাইয়ের যে পার ভেঙেছে, তা আমরা লুসাইয়ের পুকুর খনন করেই নিতে পারব।
তাহলে যন্ত্রপাতি জব্দ করা হলো কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে আকবর খান বলেন, না-এখানে কোনো কিছু জব্দ করে নাই। কর্ণফুলী থানার ওসি সাহেবের সাথে আমার কথা হয়েছে। ওসি সাহেবকে আমরা বলছি এটা ভুয়া খবর।
বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা লুসাই পার্ক রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের আরেক সদস্য আকরাম হোসেনের ভাষায়। তিনি বলেছেন, এটা একটা ভুল বোঝাবুঝি, পরে এসব ঠিক হয়েছে। পরক্ষণে লুসাই পার্কের আরেক সদস্য হাশেম চৌধুরী বলেন, যা লিখেন লুসাই পার্কের পক্ষে লিখেন।
লুসাই পার্কের মালিকপক্ষের বক্তব্য যে ডাহা মিথ্যা তার প্রমাণ মিলল পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহিদের বক্তব্যে। স্পষ্ট ভাষায় তিনি বললেন, পারকি সৈকতের লুসাই পার্কের পাশে পাউবোর কাজ সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। আমাদের কাজ লুসাই পার্কের আশপাশ থেকে অনেক দূরে।
অন্যদিকে স্কাভেটর ও ড্রেজার জব্দের সত্যতা মিলল আনোয়ারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু জাফর মজুমদারের মুখে। তিনি বলেন, ভূমি অফিসের লোকজন যন্ত্রপাতি জব্দ করেছে। জব্দ করা যন্ত্রপাতি এখন থানায়।সরেজমিনে খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দীনের ভাষ্য, পারকি সৈকতে মাটি ও বালু উত্তোলনের খবর পেয়েই ভূমি অফিসের কর্মকর্তা ও পুলিশ পাঠানো হয়েছে। সব সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। সৈকত রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় লোকজনের মতে, আনোয়ারা উপজেলার পারকি সমুদ্র সৈকত চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। বর্ষায় এমনিতেই সৈকতের অবস্থা নাজুক থাকে। সৈকত রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বেড়িবাঁধ তৈরির কাজ করলেও লুসাই পার্ক রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের মালিকপক্ষ রাতের আধাঁরে, এমনকি প্রকাশ্যে মাটি ও বালু উত্তোলন করে সৈকতকে ভাঙনের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এতে পর্যটকদের যেমন বিড়ম্বনা বাড়ছে, তেমনি উপকুলীয় ভাঙনে হুমকির মুখে পড়ছে আনোয়ারা, কর্ণফুলী, বাঁশখালী, পটিয়াসহ চট্টগ্রাম শহর ।
উল্লেখ্য, পারকি সৈকতের বুক ছিড়ে এই লুসাই পার্ক রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে গড়ে তোলেন ফ্যাসিস্টের দোসর আনোয়ারা উপজেলার ২ নং বারশত ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান এম এ কাইয়ুম শাহ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর আত্নগোপনে চলে যান এই চেয়ারম্যান। আর এই অবস্থায় লুসাই পার্ক রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট রক্ষায় ঢাল হয়ে দাড়ান বিএনপি নেতা আকবর খান ও আকরাম হোসেন সিন্ডিকেট। যারা চেয়ারম্যান এম এ কাইযুম শাহর মতো মাটি ও বালু উত্তোলন করে সৈকত ধ্বংসের মহোৎসবে মেতেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাউবো সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, লুসাই পার্ক রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের মালিকপক্ষের ধ্বংসাত্বক কাজের কারণে সৈকতের প্রায় তিন কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিগত বন্যায় বিলীন হয়ে গেছে। যা পাউবোর প্রজেক্টের আওতায় সংস্কার করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে লুসাই পার্ক রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ভাইস চেয়ারম্যানও সহযোগীরা। এতে ব্যর্থ হয়ে নিজেরাই বালু ও মাটি দিয়ে জিও ব্যাগ বসিয়ে লুসাই পার্ক রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বালু ও মাটি উত্তোলন আড়াল করতে পাউবোর নাম ভাঙাচ্ছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















