ব্রাহ্মণপাড়া বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে ছাত্রীর অনশন, এলাকা জুড়ে তোলপাড়

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় এক শিক্ষার্থীর বাড়িতে বিয়ের দাবিতে গত সাত দিন ধরে অনশন করছেন গোপালগঞ্জের এক তরুণী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন উৎসুক জনতা ওই বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ছাত্র ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপন করেছেন।
​স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী তরুণীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ২ নং শিদলাই ইউনিয়নের পশ্চিম শিদলাই গ্রামের (৫ নম্বর ওয়ার্ড) বাসিন্দা প্রয়াত ওহাব আলী খন্দকারের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে আবু সাঈদ একজন শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদেই গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা ও ঢাকা পড়াশোনা অবস্থায় ওই তরুণীর (ছদ্মনাম) সাথে তাঁর পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
​ভুক্তভোগী তরুণীর দাবি, দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কে আবু সাঈদ তাঁকে বহুবার বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু পড়াশোনা শেষের দিকে আসার পর সাঈদ নানা অজুহাতে সম্পর্ক এড়িয়ে যেতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর সাঈদ ওই তরুণীর মুঠোফোন নম্বর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি ব্লক করে দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
​অনশনরত তরুণী বলেন, “ঢাকা ও গোপালগঞ্জে একাধিকবার সাঈদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও আমি ব্যর্থ হয়েছি। নিরুপায় হয়ে নিজের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা ও অধিকার আদায়ে এক সপ্তাহ আগে সরাসরি সাঈদের গ্রামের বাড়িতে এসে অনশন শুরু করেছি। বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমি এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না।”
​এদিকে তরুণীর আসার খবর পেয়েই অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে আত্মগোপন করেছেন। এতে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অভিযুক্ত সাঈদের পরিবারের সদস্যদের পূর্বের কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় আগেও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। তাঁরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
​জানতে চাইলে স্থানীয় শিদলাই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) কামাল হোসেন ও ১নং ওয়ার্ডের মেম্বার আবু তাহের বলেন, “মেয়েটি গত সাত দিন ধরে এখানে অবস্থান করছে। আমরা তাঁর নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। যেহেতু বিষয়টি সংবেদনশীল, তাই স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং দুই পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে একটি সুষ্ঠু সামাজিক মীমাংসার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।”
​শিদলাই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম আলাউল আকবর বলেন, “আমি গত সাত দিন ধরেই বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু ছেলের পক্ষের কেউ বাড়িতে না থাকায় মীমাংসা করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং উভয় পক্ষের মাঝে সমঝোতার চেষ্টা চলছে।”
​খবর পেয়ে ব্রাহ্মণপাড়া প্রশাসনের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তরুণীটি বর্তমানে ওই বাড়িতেই আছেন। এখন পর্যন্ত তরুণী বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের নজরদারি রয়েছে।”
​সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বিষয়টি সামাজিকভাবে সমাধানের লক্ষ্যে স্থানীয় মাতব্বর ও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সালিশ-বৈঠক চলছে।
Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্রাহ্মণপাড়া বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে ছাত্রীর অনশন, এলাকা জুড়ে তোলপাড়

আপডেট সময় ০৬:৩২:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় এক শিক্ষার্থীর বাড়িতে বিয়ের দাবিতে গত সাত দিন ধরে অনশন করছেন গোপালগঞ্জের এক তরুণী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন উৎসুক জনতা ওই বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ছাত্র ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপন করেছেন।
​স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী তরুণীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ২ নং শিদলাই ইউনিয়নের পশ্চিম শিদলাই গ্রামের (৫ নম্বর ওয়ার্ড) বাসিন্দা প্রয়াত ওহাব আলী খন্দকারের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে আবু সাঈদ একজন শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদেই গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা ও ঢাকা পড়াশোনা অবস্থায় ওই তরুণীর (ছদ্মনাম) সাথে তাঁর পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
​ভুক্তভোগী তরুণীর দাবি, দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কে আবু সাঈদ তাঁকে বহুবার বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু পড়াশোনা শেষের দিকে আসার পর সাঈদ নানা অজুহাতে সম্পর্ক এড়িয়ে যেতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর সাঈদ ওই তরুণীর মুঠোফোন নম্বর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি ব্লক করে দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
​অনশনরত তরুণী বলেন, “ঢাকা ও গোপালগঞ্জে একাধিকবার সাঈদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও আমি ব্যর্থ হয়েছি। নিরুপায় হয়ে নিজের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা ও অধিকার আদায়ে এক সপ্তাহ আগে সরাসরি সাঈদের গ্রামের বাড়িতে এসে অনশন শুরু করেছি। বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমি এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না।”
​এদিকে তরুণীর আসার খবর পেয়েই অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে আত্মগোপন করেছেন। এতে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অভিযুক্ত সাঈদের পরিবারের সদস্যদের পূর্বের কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় আগেও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। তাঁরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
​জানতে চাইলে স্থানীয় শিদলাই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) কামাল হোসেন ও ১নং ওয়ার্ডের মেম্বার আবু তাহের বলেন, “মেয়েটি গত সাত দিন ধরে এখানে অবস্থান করছে। আমরা তাঁর নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। যেহেতু বিষয়টি সংবেদনশীল, তাই স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং দুই পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে একটি সুষ্ঠু সামাজিক মীমাংসার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।”
​শিদলাই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম আলাউল আকবর বলেন, “আমি গত সাত দিন ধরেই বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু ছেলের পক্ষের কেউ বাড়িতে না থাকায় মীমাংসা করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং উভয় পক্ষের মাঝে সমঝোতার চেষ্টা চলছে।”
​খবর পেয়ে ব্রাহ্মণপাড়া প্রশাসনের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তরুণীটি বর্তমানে ওই বাড়িতেই আছেন। এখন পর্যন্ত তরুণী বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের নজরদারি রয়েছে।”
​সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বিষয়টি সামাজিকভাবে সমাধানের লক্ষ্যে স্থানীয় মাতব্বর ও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সালিশ-বৈঠক চলছে।