গাজীপুরের কলমেশ্বর মৌজায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনা একটি ভবনের দলিলে ও বাস্তব চিত্রে ভয়াবহ গরমিলের অভিযোগ উঠেছে। দলিলে ৯ তলা ভবন উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে দেখা গেছে এটি একটি সাত ও আট তলাবিশিষ্ট জোড়া ভবন। শুধু কাঠামোগত অসংগতিই নয়, প্রায় ১৩ কোটি টাকার ভবন দলিলে ১৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে—এমন তথ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার কলমেশ্বর মৌজার (জোত নং- ২৮৯৭ ও ৪০২৩) ২৮ দশমিক ০৫ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত একটি জোড়া ভবন সম্প্রতি ক্রয় করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ৫ এপ্রিল সম্পাদিত ও ৬ এপ্রিল নিবন্ধিত ৫৩০৮ নম্বর দলিল অনুযায়ী, জমিসহ স্থাপনার মোট মূল্য ধরা হয়েছে ১৭ কোটি ৯৬ লাখ ৬ টাকা। এর মধ্যে জমির মূল্য ছয় কোটি ৮০ লাখ ৬ হাজার টাকা এবং স্থাপনার মূল্য ১১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এ বিষয়ে বুধবার দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন জমির মালিক নিজেই। ভবনের মালিক মো: আবু তাহের বলেন, ‘আমি ভবনসহ জমিটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ১৩ কোটি টাকায় বিক্রি করেছি এবং ওই টাকাই বুঝে পেয়েছি। দলিলে কেন প্রায় ১৮ কোটি টাকা লেখা হয়েছে, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’ সরেজমিন দেখা যায়, ভবনটি বেশ পুরনো ও জরাজীর্ণ। স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি আগে গার্মেন্টস কারখানা ও গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে ভবনের কিছু অংশে ‘ইউন্টার উল’ নামে একটি পোশাক কারখানা এবং নিচতলায় গোডাউন ভাড়া রয়েছে। অধিকাংশ ফ্লোরই বর্তমানে পরিত্যক্ত। জোড়া ভবনের সাত তলা অংশে কোনো লিফট নেই। আট তলা অংশে একটি পুরনো ও অকার্যকর লিফট রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস থেকে প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার দূরে ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের শহীদ সিদ্দিক রোডসংলগ্ন ভবনটিতে নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থাও নেই। স্থানীয়দের দাবি, পার্কিং সঙ্কট ও জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই কোনো মানসম্মত প্রতিষ্ঠান ভবনটি ভাড়া নিতে আগ্রহ দেখায়নি। এমন অবস্থায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভবনটিকে ‘একাডেমিক ভবন-২’ হিসেবে উচ্চমূল্যে কেন ক্রয় করল, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে টঙ্গীর সাব-রেজিস্ট্রার ওসমান গণি মণ্ডল বলেন, বোর্ডবাজারের একটি ব্যাংকে উপস্থিত হয়ে কমিশন দলিলের মাধ্যমে নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, দলিল নিবন্ধনে কোনো কর ফাঁকি হয়নি। তার ভাষ্য, ‘আমরা প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা কর আদায় করেছি।’
বাস্তবে ৯ তলা না থাকলেও কেন ৯ তলা ভবন উল্লেখ করা হলো এবং ১৩ কোটি টাকার সম্পত্তির মূল্য দলিলে প্রায় ১৮ কোটি টাকা দেখানো হলো- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেসব কাগজপত্র উপস্থাপন করেছে, সেগুলোর ভিত্তিতেই দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে।’
অন্য দিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এ টি এম জাফরুল আযম বলেন, রাজউক অনুমোদিত ৯ তলার নকশা অনুযায়ী দলিলে ভবনটিকে ৯ তলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী দলিল নিবন্ধনের চেষ্টা করা হলেও সাব-রেজিস্ট্রার তা গ্রহণ করেননি।
ট্রেজারারের অভিযোগ, ‘সাব-রেজিস্ট্রার আমাদের কাছে দুই কোটি টাকা ঘুষ দাবি করেছিলেন, তা দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি রাজউক অনুমোদিত প্ল্যান অনুযায়ী ৯ তলা উল্লেখ করেই দলিল নিবন্ধনে বাধ্য করেন।’
দলিলে ১৩ কোটি টাকার পরিবর্তে ১৭ কোটি ৯৬ লাখ ৬ হাজার টাকা মূল্য উল্লেখের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত মৌজা রেট অনুযায়ী ১৩ কোটি টাকা মূল্য দেখানো সম্ভব হয়নি। ফলে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য মূল্য হিসেবেই ওই অঙ্ক দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ দিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন ক্রয়ে দলিল, বাস্তবতা ও অর্থমূল্যের এই বড় ধরনের অসঙ্গতি এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকারি অর্থে ভবন ক্রয়ে তথ্য গরমিল, মূল্যবৃদ্ধি এবং উপযোগিতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















