ঢাকা ০২:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সাঁটলিপিকার কামাল হোসেনের টাকার পাহাড় ৬ বলে ৬ উইকেট, জোড়া হ্যাটট্রিকের নজির বাগেরহাটে মৎস্য আড়ত নির্মাণে ‘পুকুরচুরি’র অভিযোগ এক বছরে বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিস বি কমেছে ৩২ শতাংশ নিয়োগ বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাৎ: তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিলল অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে পাউবোর কাজে অনিয়ম দেখে কাজ বন্ধের নির্দেশ দিলেন এমপি জালাল উদ্দীন বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড টি-টোয়েন্টি ম্যাচ নির্দিষ্ট সময়ে খেলা মাঠে গড়ানো নিয়ে শঙ্কা রূপগঞ্জে স্কুল ফিডিং প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ‘প্রার্থনা করি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যেন না শোধরায়’ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন কেনায় বড় অনিয়ম

ডিসির নেতৃত্বে জমি অধিগ্রহণে ভয়াবহ দুর্নীতি

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে নরসিংদীতে জমি অধিগ্রহণকে ঘিরে দুর্নীতির এক বিস্তৃত চক্রের সন্ধান মিলেছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, স্ট্যাম্পে চুক্তি করে শত শত কোটি টাকার ঘুস ও কমিশন বাণিজ্যের ফাঁদ তৈরি করা হয়েছিল। এই চক্র এতটাই সুসংগঠিত ছিল যে, ঘুস-কমিশনের চুক্তিপত্র পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের নথিতে সংযুক্ত করার নজির দেখা গেছে, যা প্রশাসনিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবে ধরা হচ্ছে।

অনুসন্ধান অনুযায়ী, জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে এডিসি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকৌশলী, গণপূর্তের প্রকৌশলী, স্থানীয় সার্ভেয়ার, কানুনগো, কিছু সাংবাদিক এবং চিহ্নিত দালালসহ অন্তত ২০ থেকে ২৫ জনের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

অভিযোগ রয়েছে, অধিগ্রহণের প্রতিটি ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে কৌশলে বাড়তি আর্থিক সুবিধা নেওয়া হতো। কোথাও ফসলি জমিকে ভিটি, আবার ভিটিকে বাণিজ্যিক জমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এভাবে রাতারাতি গড়ে তোলা হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ও মানহীন স্থাপনা, যা ক্ষতিপূরণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণে এমন অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে ছয় মাসব্যাপী অনুসন্ধানে। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, মসজিদে দানকৃত জমিও ব্যক্তি মালিকানায় দেখিয়ে ক্ষতিপূরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় কঠোর অবস্থান নিয়ে আলোচনায় আসেন নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগম। মাত্র ছয় মাসের দায়িত্বকালে তিনি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম চিহ্নিত করে একাধিক অবৈধ সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। এতে সরকারের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে প্রশাসনিক পর্যায়ে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই পদক্ষেপের পরই বদলির মুখে পড়েন তিনি। ২৭ এপ্রিল তাকে সিনিয়র সহকারী প্রধান হিসেবে পরিকল্পনা কমিশনে বদলি করা হয়।

মাহমুদা বেগম বলেন, জমি অধিগ্রহণের ফিল্ডবহিতে সরকারি স্বার্থবিরোধী একাধিক অনিয়ম ছিল। অধিগ্রহণের পর গড়ে ওঠা স্থাপনা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা নিয়মবহির্ভূত। তার ভাষায়, “অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তের পর জমির শ্রেণি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। কিন্তু এখানে উল্টোটা হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, বাস্তব তথ্য, রেকর্ডপত্র এবং আইন অনুযায়ী যাচাই করে অনেক অনিয়মিত অধিগ্রহণ বাতিল করা হয়। এতে সরকারি অর্থ সাশ্রয় হলেও তিনি ব্যক্তিগত চাপ ও তদবিরের মুখে পড়েন। তার অভিযোগ, একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির অবৈধ চাপ উপেক্ষা করার পরই তাকে বদলি করা হয়েছে।

এর আগে ১৯ অক্টোবর “জমি অধিগ্রহণের ৮ কোটি টাকা পেতে ঘুস এক কোটি, ডিসি অফিসের ঘুসের ফাঁদে মারা যান সাহাবুদ্দিন” শিরোনামে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরপর ধীরে ধীরে ঘুস সিন্ডিকেটের হিসাবনিকাশ ভেঙে পড়ে বলে জানা যায়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দের বাইরে আরও অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণের প্রস্তাবিত তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। তবে এই তালিকার সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি। ফলে বিভিন্ন এলএ কেসে ক্ষতিপূরণের তালিকাভুক্ত বহু নাম বাতিল করা হয়। তথ্য অনুযায়ী, অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত আগেই জানতে পেরে কিছু ব্যক্তি রাস্তার পাশে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলে, যাতে পরে তিনগুণ ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়। এই কৌশলকে কেন্দ্র করেই পুরো প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসন, এডিসি, সওজ ও গণপূর্তের প্রতিনিধি, সার্ভেয়ার এবং কানুনগোদের একটি অংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা অর্থের বিনিময়ে এসব স্থাপনাকে বাণিজ্যিক ক্ষতিপূরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। স্থানীয়ভাবে এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে অস্বস্তি তৈরি হয়, কারণ যাদের নাম তালিকায় তোলা হয়েছে তাদের অনেকেই ঘুস দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, কিন্তু তালিকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের অনেকেই এখন আর দায়িত্বে নেই। এ বিষয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তৎকালীন জেলা প্রশাসককে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছিল। এতে প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থ লুটপাটের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, “স্থাবর সম্পত্তি হুকুমদখল সংক্রান্ত আইন ২০১৭”-এর ব্যাখ্যা ব্যবহার করে একটি প্রভাবশালী চক্র জমির মালিকদের বিভ্রান্ত করেছে। অভিযোগ রয়েছে, অধিগ্রহণ শাখার কিছু কর্মকর্তা ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নিয়োগের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দালাল সিন্ডিকেট তৈরি করেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কমিশন চুক্তির প্রবণতা তৈরি হয়। সরকারি অধিগ্রহণে তিনগুণ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় বহু জমির মালিক এতে যুক্ত হন বলে জানা গেছে।

আইনি নথি অনুযায়ী, “স্থাবর সম্পত্তি হুকুমদখল আইন ২০১৭” এর ৮ ধারা (৩)(ক) অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট ফরমে নোটিশ জারি করা হয়। অনুসন্ধানে ২০২৪ সালের একটি নোটিশের ফটোকপিও পাওয়া গেছে, যেখানে বলা হয়—ক্ষতিপূরণের অর্থ গ্রহণে মালিক নিজে বা ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হাজির হবেন।

নোটিশে স্বাক্ষরকারী হিসেবে ছিলেন তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা রেহানা মজুমদার মুক্তিসহ চারজন। অন্য তিনজন হলেন সার্ভেয়ার আমির হোসেন, মুহা. আব্দুল আজিজ এবং কানুনগো মো. আব্দুল জলিল। তখন নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ছিলেন ড. বদিউল আলম।

সূত্র বলছে, ইতোমধ্যে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ সরাসরি অর্থ পেয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থ দালালদের মাধ্যমে বিতরণ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অধিগ্রহণ মূল্যের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ সিন্ডিকেটের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

একজন ভুক্তভোগী বলেন, “অধিগ্রহণের চেকগুলো তদন্ত করলেই কমিশন ভাগাভাগির প্রমাণ বের হয়ে আসবে। এটি বের করা কঠিন কিছু নয়। আমরা সরকারের সদিচ্ছা দেখতে চাই।”

তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরেশ সূত্রধর ও সরোজ কুমার সাহা নামে দুই ব্যক্তি মরজাল মৌজায় বড় আকারের দালানকোঠা নির্মাণ করেন। স্থানীয়ভাবে তারা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হলেও অধিগ্রহণকেন্দ্রিক ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, সম্ভাব্য অধিগ্রহণ এলাকায় আগেভাগেই বহুতল ভবন নির্মাণ করে বাণিজ্যিক ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। শুধু এই দুই ব্যক্তি নয়, ১২ নম্বর এলএ কেসে ৩৫টি স্থাপনা বাতিল করা হয়েছে। একইভাবে ১৩ নম্বর এলএ কেসে চারটি বড় ভবন ও ৭৯টি ছোট স্থাপনা তালিকাভুক্ত ছিল, যা নিয়ে এলাকায় তীব্র আলোচনা চলছে।

১৫ নম্বর এলএ কেসে মনিরুজ্জামান ও নাজির আহমেদ খান নামে দুই ব্যক্তি ৭ শতক জমির বিপরীতে ৭৫ লাখ ৪৮ হাজার ২৬৪ টাকা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ভেলানগর বাজার জামে মসজিদের জমি অধিগ্রহণ তালিকায় থাকলেও সেখানে মসজিদের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির নাম যুক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইভাবে ১৯৯৫ সালে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালের জন্য অধিগ্রহণ করা জমিও ব্যক্তি নামে ক্ষতিপূরণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয় বলে জানা যায়।

অন্যদিকে চিনিশপুর এলাকার খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তি করে অন্যের জমিতে নির্মিত ঘর দেখিয়ে বাণিজ্যিক ক্ষতিপূরণ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধান বলছে, এমন শতাধিক আবেদনকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বৈধতা দিয়েছেন।

প্রকল্পটির শুরু ২০১৮ সালে। এরপর সাত বছরে একাধিক জেলা প্রশাসক দায়িত্ব পালন করেন। পর্যায়ক্রমে দায়িত্বে ছিলেন সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন (২০১৮–২০২১), আবু নইম মোহাম্মদ মারুফ খান (২০২১–২০২৩), ড. বদিউল আলম (২০২৩–২০২৪) এবং মোহাম্মদ রাশেদ হোসেন চৌধুরী (২০২৪–২০২৫)।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই সময়কালেই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়ম ও ক্ষতিপূরণ তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর গঠিত তদন্ত কমিটিকে প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। এদিকে সার্ভেয়ার আমির হোসেনকে বদলি এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হলেও তিনি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। পরে তাকেই মূলত শাস্তির মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অধিগ্রহণের সময় দালাল ও জমির মালিকদের মধ্যে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে কমিশন চুক্তির প্রচলন ছিল। কিছু চুক্তিপত্রে ক্ষতিপূরণের অর্থ ৪৫–৫৫ শতাংশ হারে ভাগাভাগির শর্ত উল্লেখ থাকার কথাও জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সার্ভেয়ার, কানুনগো, দালালসহ সংশ্লিষ্ট একটি চক্র সক্রিয় ছিল। তবে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ দেখা যায়নি।

নরসিংদীতে ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, চুক্তিপত্র প্রস্তুত এবং ঘুস বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সূত্রের দাবি, দালালদের মাধ্যমে তৈরি করা কমিশন চুক্তির নথি প্রস্তুত করতেন সার্ভেয়ার আমির হোসেনসহ একটি প্রভাবশালী চক্র।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন জেলা নাজির আব্দুর রউফ, ট্রেজারার (উপসহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা) শাহরিয়ার আহমেদ, সদর ভূমি অফিসের হিটলু চন্দ্র বাউল, রেকর্ডকিপার আব্দুর রহমান, সদ্য অবসরে যাওয়া আলমগীর হোসেন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক ভূঁইয়া।

অভিযোগ আরও গুরুতর হয়েছে ফারুক ভূঁইয়াকে ঘিরে। বলা হচ্ছে, তিনি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কার্যালয়ে কর্মরত এক নারীর বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগের মুখোমুখি হন। অভিযোগ দেওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন একই জেলায় কর্মরত থাকায় এই কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে জেলা প্রশাসনের অভ্যন্তরে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাদের প্রভাব তৈরি হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকে তাদের “ছয় খলিফা” বলে উল্লেখ করেন, যারা মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

সূত্র বলছে, অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার আর্থিক অনিয়ম, তালিকা তৈরি এবং চুক্তি ব্যবস্থাপনায় এই চক্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। এতে করে ডিসি ও এডিসি পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার সিদ্ধান্তও প্রভাবিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নরসিংদীর সাবেক একাধিক এডিসি (রাজস্ব), এলএও এবং অন্যান্য ভূমি কর্মকর্তার নামও এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা যায়।

একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক এডিসি (রাজস্ব) অঞ্জন দাস এক সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা করে ঘুসের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ওই প্রস্তাবের ভিডিও সংরক্ষিত আছে বলেও দাবি করা হয়। অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কানুনগো বলেন, অধিগ্রহণ সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটিকে এক কোটি টাকা ঘুস দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তার ভাষায়, এই অর্থ সংগ্রহ করে তদন্ত কমিটির সদস্যদের দেওয়া হয়, যাতে তারা ক্যাডার কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দিতে পারেন।

তিনি আরও দাবি করেন, তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে থাকা অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে মো. আজমল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সাঁটলিপিকার কামাল হোসেনের টাকার পাহাড়

ডিসির নেতৃত্বে জমি অধিগ্রহণে ভয়াবহ দুর্নীতি

আপডেট সময় ০১:১১:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে নরসিংদীতে জমি অধিগ্রহণকে ঘিরে দুর্নীতির এক বিস্তৃত চক্রের সন্ধান মিলেছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, স্ট্যাম্পে চুক্তি করে শত শত কোটি টাকার ঘুস ও কমিশন বাণিজ্যের ফাঁদ তৈরি করা হয়েছিল। এই চক্র এতটাই সুসংগঠিত ছিল যে, ঘুস-কমিশনের চুক্তিপত্র পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের নথিতে সংযুক্ত করার নজির দেখা গেছে, যা প্রশাসনিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবে ধরা হচ্ছে।

অনুসন্ধান অনুযায়ী, জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে এডিসি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকৌশলী, গণপূর্তের প্রকৌশলী, স্থানীয় সার্ভেয়ার, কানুনগো, কিছু সাংবাদিক এবং চিহ্নিত দালালসহ অন্তত ২০ থেকে ২৫ জনের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

অভিযোগ রয়েছে, অধিগ্রহণের প্রতিটি ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে কৌশলে বাড়তি আর্থিক সুবিধা নেওয়া হতো। কোথাও ফসলি জমিকে ভিটি, আবার ভিটিকে বাণিজ্যিক জমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এভাবে রাতারাতি গড়ে তোলা হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ও মানহীন স্থাপনা, যা ক্ষতিপূরণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণে এমন অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে ছয় মাসব্যাপী অনুসন্ধানে। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, মসজিদে দানকৃত জমিও ব্যক্তি মালিকানায় দেখিয়ে ক্ষতিপূরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় কঠোর অবস্থান নিয়ে আলোচনায় আসেন নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগম। মাত্র ছয় মাসের দায়িত্বকালে তিনি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম চিহ্নিত করে একাধিক অবৈধ সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। এতে সরকারের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে প্রশাসনিক পর্যায়ে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই পদক্ষেপের পরই বদলির মুখে পড়েন তিনি। ২৭ এপ্রিল তাকে সিনিয়র সহকারী প্রধান হিসেবে পরিকল্পনা কমিশনে বদলি করা হয়।

মাহমুদা বেগম বলেন, জমি অধিগ্রহণের ফিল্ডবহিতে সরকারি স্বার্থবিরোধী একাধিক অনিয়ম ছিল। অধিগ্রহণের পর গড়ে ওঠা স্থাপনা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা নিয়মবহির্ভূত। তার ভাষায়, “অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তের পর জমির শ্রেণি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। কিন্তু এখানে উল্টোটা হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, বাস্তব তথ্য, রেকর্ডপত্র এবং আইন অনুযায়ী যাচাই করে অনেক অনিয়মিত অধিগ্রহণ বাতিল করা হয়। এতে সরকারি অর্থ সাশ্রয় হলেও তিনি ব্যক্তিগত চাপ ও তদবিরের মুখে পড়েন। তার অভিযোগ, একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির অবৈধ চাপ উপেক্ষা করার পরই তাকে বদলি করা হয়েছে।

এর আগে ১৯ অক্টোবর “জমি অধিগ্রহণের ৮ কোটি টাকা পেতে ঘুস এক কোটি, ডিসি অফিসের ঘুসের ফাঁদে মারা যান সাহাবুদ্দিন” শিরোনামে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরপর ধীরে ধীরে ঘুস সিন্ডিকেটের হিসাবনিকাশ ভেঙে পড়ে বলে জানা যায়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দের বাইরে আরও অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণের প্রস্তাবিত তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। তবে এই তালিকার সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি। ফলে বিভিন্ন এলএ কেসে ক্ষতিপূরণের তালিকাভুক্ত বহু নাম বাতিল করা হয়। তথ্য অনুযায়ী, অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত আগেই জানতে পেরে কিছু ব্যক্তি রাস্তার পাশে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলে, যাতে পরে তিনগুণ ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়। এই কৌশলকে কেন্দ্র করেই পুরো প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসন, এডিসি, সওজ ও গণপূর্তের প্রতিনিধি, সার্ভেয়ার এবং কানুনগোদের একটি অংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা অর্থের বিনিময়ে এসব স্থাপনাকে বাণিজ্যিক ক্ষতিপূরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। স্থানীয়ভাবে এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে অস্বস্তি তৈরি হয়, কারণ যাদের নাম তালিকায় তোলা হয়েছে তাদের অনেকেই ঘুস দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, কিন্তু তালিকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের অনেকেই এখন আর দায়িত্বে নেই। এ বিষয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তৎকালীন জেলা প্রশাসককে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছিল। এতে প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থ লুটপাটের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, “স্থাবর সম্পত্তি হুকুমদখল সংক্রান্ত আইন ২০১৭”-এর ব্যাখ্যা ব্যবহার করে একটি প্রভাবশালী চক্র জমির মালিকদের বিভ্রান্ত করেছে। অভিযোগ রয়েছে, অধিগ্রহণ শাখার কিছু কর্মকর্তা ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নিয়োগের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দালাল সিন্ডিকেট তৈরি করেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কমিশন চুক্তির প্রবণতা তৈরি হয়। সরকারি অধিগ্রহণে তিনগুণ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় বহু জমির মালিক এতে যুক্ত হন বলে জানা গেছে।

আইনি নথি অনুযায়ী, “স্থাবর সম্পত্তি হুকুমদখল আইন ২০১৭” এর ৮ ধারা (৩)(ক) অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট ফরমে নোটিশ জারি করা হয়। অনুসন্ধানে ২০২৪ সালের একটি নোটিশের ফটোকপিও পাওয়া গেছে, যেখানে বলা হয়—ক্ষতিপূরণের অর্থ গ্রহণে মালিক নিজে বা ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হাজির হবেন।

নোটিশে স্বাক্ষরকারী হিসেবে ছিলেন তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা রেহানা মজুমদার মুক্তিসহ চারজন। অন্য তিনজন হলেন সার্ভেয়ার আমির হোসেন, মুহা. আব্দুল আজিজ এবং কানুনগো মো. আব্দুল জলিল। তখন নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ছিলেন ড. বদিউল আলম।

সূত্র বলছে, ইতোমধ্যে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ সরাসরি অর্থ পেয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থ দালালদের মাধ্যমে বিতরণ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অধিগ্রহণ মূল্যের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ সিন্ডিকেটের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

একজন ভুক্তভোগী বলেন, “অধিগ্রহণের চেকগুলো তদন্ত করলেই কমিশন ভাগাভাগির প্রমাণ বের হয়ে আসবে। এটি বের করা কঠিন কিছু নয়। আমরা সরকারের সদিচ্ছা দেখতে চাই।”

তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরেশ সূত্রধর ও সরোজ কুমার সাহা নামে দুই ব্যক্তি মরজাল মৌজায় বড় আকারের দালানকোঠা নির্মাণ করেন। স্থানীয়ভাবে তারা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হলেও অধিগ্রহণকেন্দ্রিক ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, সম্ভাব্য অধিগ্রহণ এলাকায় আগেভাগেই বহুতল ভবন নির্মাণ করে বাণিজ্যিক ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। শুধু এই দুই ব্যক্তি নয়, ১২ নম্বর এলএ কেসে ৩৫টি স্থাপনা বাতিল করা হয়েছে। একইভাবে ১৩ নম্বর এলএ কেসে চারটি বড় ভবন ও ৭৯টি ছোট স্থাপনা তালিকাভুক্ত ছিল, যা নিয়ে এলাকায় তীব্র আলোচনা চলছে।

১৫ নম্বর এলএ কেসে মনিরুজ্জামান ও নাজির আহমেদ খান নামে দুই ব্যক্তি ৭ শতক জমির বিপরীতে ৭৫ লাখ ৪৮ হাজার ২৬৪ টাকা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ভেলানগর বাজার জামে মসজিদের জমি অধিগ্রহণ তালিকায় থাকলেও সেখানে মসজিদের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির নাম যুক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইভাবে ১৯৯৫ সালে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালের জন্য অধিগ্রহণ করা জমিও ব্যক্তি নামে ক্ষতিপূরণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয় বলে জানা যায়।

অন্যদিকে চিনিশপুর এলাকার খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তি করে অন্যের জমিতে নির্মিত ঘর দেখিয়ে বাণিজ্যিক ক্ষতিপূরণ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধান বলছে, এমন শতাধিক আবেদনকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বৈধতা দিয়েছেন।

প্রকল্পটির শুরু ২০১৮ সালে। এরপর সাত বছরে একাধিক জেলা প্রশাসক দায়িত্ব পালন করেন। পর্যায়ক্রমে দায়িত্বে ছিলেন সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন (২০১৮–২০২১), আবু নইম মোহাম্মদ মারুফ খান (২০২১–২০২৩), ড. বদিউল আলম (২০২৩–২০২৪) এবং মোহাম্মদ রাশেদ হোসেন চৌধুরী (২০২৪–২০২৫)।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই সময়কালেই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়ম ও ক্ষতিপূরণ তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর গঠিত তদন্ত কমিটিকে প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। এদিকে সার্ভেয়ার আমির হোসেনকে বদলি এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হলেও তিনি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। পরে তাকেই মূলত শাস্তির মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অধিগ্রহণের সময় দালাল ও জমির মালিকদের মধ্যে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে কমিশন চুক্তির প্রচলন ছিল। কিছু চুক্তিপত্রে ক্ষতিপূরণের অর্থ ৪৫–৫৫ শতাংশ হারে ভাগাভাগির শর্ত উল্লেখ থাকার কথাও জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সার্ভেয়ার, কানুনগো, দালালসহ সংশ্লিষ্ট একটি চক্র সক্রিয় ছিল। তবে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ দেখা যায়নি।

নরসিংদীতে ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, চুক্তিপত্র প্রস্তুত এবং ঘুস বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সূত্রের দাবি, দালালদের মাধ্যমে তৈরি করা কমিশন চুক্তির নথি প্রস্তুত করতেন সার্ভেয়ার আমির হোসেনসহ একটি প্রভাবশালী চক্র।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন জেলা নাজির আব্দুর রউফ, ট্রেজারার (উপসহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা) শাহরিয়ার আহমেদ, সদর ভূমি অফিসের হিটলু চন্দ্র বাউল, রেকর্ডকিপার আব্দুর রহমান, সদ্য অবসরে যাওয়া আলমগীর হোসেন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক ভূঁইয়া।

অভিযোগ আরও গুরুতর হয়েছে ফারুক ভূঁইয়াকে ঘিরে। বলা হচ্ছে, তিনি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কার্যালয়ে কর্মরত এক নারীর বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগের মুখোমুখি হন। অভিযোগ দেওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন একই জেলায় কর্মরত থাকায় এই কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে জেলা প্রশাসনের অভ্যন্তরে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাদের প্রভাব তৈরি হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকে তাদের “ছয় খলিফা” বলে উল্লেখ করেন, যারা মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

সূত্র বলছে, অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার আর্থিক অনিয়ম, তালিকা তৈরি এবং চুক্তি ব্যবস্থাপনায় এই চক্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। এতে করে ডিসি ও এডিসি পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার সিদ্ধান্তও প্রভাবিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নরসিংদীর সাবেক একাধিক এডিসি (রাজস্ব), এলএও এবং অন্যান্য ভূমি কর্মকর্তার নামও এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা যায়।

একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক এডিসি (রাজস্ব) অঞ্জন দাস এক সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা করে ঘুসের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ওই প্রস্তাবের ভিডিও সংরক্ষিত আছে বলেও দাবি করা হয়। অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কানুনগো বলেন, অধিগ্রহণ সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটিকে এক কোটি টাকা ঘুস দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তার ভাষায়, এই অর্থ সংগ্রহ করে তদন্ত কমিটির সদস্যদের দেওয়া হয়, যাতে তারা ক্যাডার কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দিতে পারেন।

তিনি আরও দাবি করেন, তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে থাকা অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে মো. আজমল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।