মহেশপুর পৌরসভার ড্রেন ও সড়ক নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম-এর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে এলাকাজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ফাঁস হওয়া একটি অডিও রেকর্ডিংকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম হয়েছে, যেখানে তাকে ঠিকাদারদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, “কাজের এক পার্সেন্ট আমার।” এই একটি বাক্যই যেন পুরো ঘটনার সারমর্ম তুলে ধরে—সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অভিযোগ।
জানা গেছে, আইইউজিআইপি প্রকল্প-এর আওতায় মহেশপুর পৌরসভায় প্রায় ৪২ কোটি টাকার ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণকাজ চলছে। প্রকল্পটি দুই ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং এতে কাজ করছে র্যাবআরসি ও ডকইয়ার্ড নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে। তবে শুরু থেকেই কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ ছিল, যা এখন দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে রূপ নিয়েছে।
ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়, উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম ঠিকাদারদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করছেন। তিনি দাবি করছেন, একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার এক শতাংশ কমিশনের চুক্তি হয়েছে এবং মাসিক ৭৫ হাজার টাকা ছাড়াও বিলের সময় বাকি অর্থ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে তিনি কাজের অগ্রগতি, বিল অনুমোদন এবং উপকরণ সরবরাহের বিষয়গুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার কথাও বলেন। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি নিজেকে পুরো প্রকল্পের একক নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এই আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। ইস্টিমেট অনুযায়ী যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ বান্ডিং রড ব্যবহারের কথা, সেখানে তা কম দেওয়া হয়েছে। লিপটিং স্ল্যাবে ফিলেট রড ব্যবহার না করে কাজ শেষ করা হয়েছে, যা নির্মাণের স্থায়িত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এছাড়া সিলেকশন পাথরের সঙ্গে নিম্নমানের বালু মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে এবং ঢালাইয়ের সময় সিমেন্টের পরিমাণও কম দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়মের ফলে নির্মাণকাজের গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মাঠপর্যায়ের শ্রমিকরাও এসব অনিয়মের সাক্ষ্য দিয়েছেন। নির্মাণকাজে যুক্ত একাধিক মিস্ত্রি জানিয়েছেন, অনেক জায়গায় নির্ধারিত ডাবল খাঁচার পরিবর্তে একটি খাঁচা ব্যবহার করে দ্রুত কাজ শেষ করা হয়েছে। রাতারাতি ঢালাই সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় মান নিয়ন্ত্রণের তোয়াক্কা করা হয়নি। তাদের দাবি, এসব কাজ হয়েছে উপসহকারী প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায়। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে কাজ তদারকি করেছেন এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করেছেন।
অভিযোগ আরও রয়েছে, প্রতিদিন কাজের সাইটে উপস্থিত থাকার জন্য তিনি ঠিকাদারদের কাছ থেকে আলাদা করে অর্থ দাবি করতেন। প্রতিদিন দুই হাজার টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করার ঘটনাও উঠে এসেছে। কোনো ঠিকাদার বা তার প্রতিনিধি যদি এই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানাতেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে হেড অফিসে অভিযোগ পাঠানোর হুমকি দেওয়া হতো। এতে করে অনেকেই বাধ্য হয়ে তার দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ করতেন।
ডকইয়ার্ডের এক সাবেক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, সাইফুল ইসলামের চাপের কারণে অনেক সময় তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “উনি আমাদের বলতেন সিমেন্ট বাঁচাতে, রডের স্পেসিং বাড়াতে এবং কম দামে বালু এনে ব্যবহার করতে। আমরা যদি আপত্তি করতাম, তাহলে তিনি বিভিন্নভাবে চাপ দিতেন।” এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, প্রকৌশলগত নীতিমালাও লঙ্ঘন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ধরনের অনিয়মের কারণে নির্মাণকাজ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কয়েক বছরের মধ্যেই ড্রেন ও সড়কের ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিতে পারে, যা আবার নতুন করে সংস্কারের প্রয়োজন তৈরি করবে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়াও জনদুর্ভোগ বাড়বে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বর্ষা মৌসুমে ড্রেনের কার্যকারিতা কমে গেলে জলাবদ্ধতার সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে।
এদিকে, এই ঘটনা নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, অতীতেও সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের মতে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেকে রক্ষা করে আসছেন।
অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ঠিকাদাররা তাকে ঘুস দিতে চেয়েছে—এমন কথা তিনি বলেছেন, কিন্তু নিজে ঘুস নেওয়ার কথা কখনো স্বীকার করেননি। তার মতে, তাকে হেনস্তা করার জন্যই গোপনে কথোপকথন রেকর্ড করে তা ফাঁস করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবেই চলছে এবং কোনো অনিয়ম হয়নি।
অন্যদিকে, সদ্য দায়িত্ব নেওয়া পৌর প্রশাসক সাজ্জাদ হোসেন জানিয়েছেন, তিনি অডিও রেকর্ডিংটি শুনেছেন এবং বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি বলেন, “যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে তিনি এ ধরনের কাজে জড়িত, তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তার এই বক্তব্য স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা আশা জাগালেও অনেকে মনে করছেন, বাস্তবে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে সেটাই দেখার বিষয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা তদারকির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে এ ধরনের দুর্নীতি রোধ করা কঠিন। তারা মনে করেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়াতে হবে এবং অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
মহেশপুর পৌরসভার এই ঘটনা শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যবস্থার জন্যও একটি সতর্কবার্তা। সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রকল্পে যদি এই ধরনের অনিয়ম চলতে থাকে, তাহলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। বরং দুর্নীতির কারণে প্রকল্পের মান কমে যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হোক। অডিও রেকর্ডিংয়ের সত্যতা যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য কঠোর নজরদারি ও নিয়মকানুন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন।
সব মিলিয়ে, উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকে ঘিরে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; এটি একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারই নির্ধারণ করবে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসন কতটা আন্তরিক এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















