ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) জাকির হাসান নূর। সরকারি এই কর্মকর্তা একদিকে নগদ-সংক্রান্ত দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে আড়ালে থেকে মামাতো ভাইয়ের নামে চালিয়ে যাচ্ছেন নগদের ‘মানি ডিস্ট্রিবিউটর’ ব্যবসা। এই ব্যবসায় দৈনিক লেনদেন ২০০ কোটি টাকারও বেশি।
মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদ শুরু থেকেই ডাক বিভাগের সেবা হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে। কিন্তু নগদের মূল মালিকানা প্রতিষ্ঠান থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেড।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, থার্ড ওয়েভকে ডাক বিভাগের পরিচয়ে এমএফএস ব্যবসায়ে আনার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ছিলেন জাকির। আর সেই নগদের ডিস্ট্রিবিউটর ব্যবসায় নিজের মামাতো ভাইকে বসিয়ে নেপথ্যে থেকে ব্যবসা করে গেছেন তিনি।
২০১৮ সালের ১ অক্টোবর পাঁচটি ডিস্ট্রিবিউটর প্রতিষ্ঠান নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করে নগদ। এর একটি ‘এম আর কর্পোরেশন’। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মোহাম্মদ তারিকুজ্জামান। তাঁর জীবনবৃত্তান্ত বলছে, ক্যারিয়ারে কখনো কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না তিনি। তবুও নগদের মাত্র পাঁচ ডিস্ট্রিবিউটর প্রতিষ্ঠানের একটি পেয়ে যান তিনি। এর রহস্য খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক। ডাক অধিদপ্তরের তৎকালীন ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল (ডিপিএমজি) জাকির হাসান নূরের আপন মামাতো ভাই হলেন তারিকুজ্জামান।

জাকিরের পদোন্নতি, ব্যবসা বেড়েছে তারিকের
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্যারিয়ারে পদোন্নতি পেয়েছেন জাকির, পাশাপাশি বেড়েছে তারিকুজ্জামানের ব্যবসা। বর্তমানে নগদের বৃহত্তর ঢাকা উত্তর অঞ্চলে তিনটি ডিস্ট্রিবিউটর প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার তারিকুজ্জামান। জুলাই অভ্যুত্থানের পর নগদ পরিচালনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বসানো প্রশাসক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির তদন্তে উঠে আসে, এম আর কর্পোরেশনের তিনটি ডিস্ট্রিবিউটরশিপ থেকে দৈনিক ২০০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়েছে। এ থেকে শুধু কমিশন বাবদ মাসে ২৫ লাখ এবং সব খরচ বাদে মাসে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়েছে তারিক তথা জাকিরের।
২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত জাকির কখনো নগদ-সংক্রান্ত কাজে দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়ন, চুক্তি স্বাক্ষরে যুক্ত ছিলেন, আবার কখনো ডাক বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি নগদে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু কখনো তারিকুজ্জামানের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা প্রকাশ করেননি, যা স্পষ্টতই কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বা স্বার্থের সংঘাতের মধ্যে পড়ে।
ছিনতাইয়ের ঘটনায় স্পষ্ট হয় সবকিছু
২০২৫ সালের ১৪ জুন ঈদুল আজহার সরকারি ছুটি শেষ হওয়ার আগের দিন সকালে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর সড়কে নগদের এক এজেন্টের এক কোটি আট লাখ টাকা ছিনতাই হয়। সেই এজেন্টের ডিস্ট্রিবিউটর ছিলেন তারিকুজ্জামান। ছিনতাই হওয়া অর্থও তাঁর ব্যবসার।
ঘটনার পর পুলিশের কাছে প্রথমে নিজেকে নগদের ডিস্ট্রিবিউটরের মালিক পরিচয় দেন জনৈক আব্দুল খালেক নয়ন। উত্তরা পশ্চিম থানায় জিডি ও মামলা দায়ের করেন আব্দুর রহমান (৩২) নামের আরেকজন। তিনি নিজেকে ‘মানি ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কর্মরত’ বলে পরিচয় দেন। জিডি ও মামলার নথি অনুযায়ী, আব্দুর রহমানের ঠিকানা ১৩ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর বাসা। ছয়তলা এই ভবনটির মালিক ২০তম বিসিএসের ডাক ক্যাডারের কর্মকর্তা জাকির ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
নামফলক অনুযায়ী ভবনটির নাম নূরজাহান ভিলা। মালিক মো. আব্দুল মজিদ। জাকিরের পাসপোর্ট অনুযায়ী, এটিই তাঁর ঠিকানা। তাঁর বাবার নাম আব্দুল মজিদ, মায়ের নাম নূরজাহান বেগম। মামলায় নগদের কার্যালয় দেখানো হয়েছে জাকিরের বাড়ি থেকে সামান্য দূরত্বে অবস্থিত একই সড়কের ৩৭ নম্বর বাসা।
অনুসন্ধান বলছে, তারিকুজ্জামানকে সামনে রেখে ডিস্ট্রিবিউটরের এই ব্যবসা মূলত পরিচালনা করেন জাকির নিজেই। ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও মামাতো ভাইকে সামনে আনেননি তিনি। ব্যবসায়ে নিজের সম্পৃক্ততা ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ছিনতাই-সংক্রান্ত সব আইনি প্রক্রিয়া থেকে তারিককে আড়ালে রাখেন।
তারিকুজ্জামানের আবেদনে অসামঞ্জস্য
তারিকুজ্জামানের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ পাওয়ার প্রক্রিয়ায়ও রয়েছে নানা অসামঞ্জস্য। ২০১৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারিকুজ্জামানের এম আর কর্পোরেশন আবেদন করে, মাত্র একদিন পরেই অনুমোদন মেলে। পরে আরও দুটি ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নেন তিনি। এগুলো হচ্ছে, এম আর কর্পোরেশন দক্ষিণখান এবং এম আর কর্পোরেশন তুরাগ। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর দক্ষিণখানের এবং ২০২৪ সালের ২৭ মে আবেদন করে সেদিনই তুরাগের ডিস্ট্রিবিউটর হন তিনি।
আবেদন ফর্ম বিশ্লেষণে ধরা পড়ে একাধিক অসঙ্গতি। তিনটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা একই। রাজধানীর কাফরুল এলাকার জনতা হাউজিং, ৫ নম্বর সড়কের ২৫ নম্বর বাড়ি। কিন্তু তিন ফর্মে তিন রকম পোস্ট কোড ও ডাকঘরের নাম। প্রথম ফর্মে পোস্টকোড ১২০৭ (কাফরুলের সঠিক কোড ১২০৬) এবং ডাকঘরের নাম নেই। দ্বিতীয় ফর্মে ডাকঘর দেখানো হয়েছে মোহাম্মদপুর, যদিও কাফরুল এলাকা মিরপুর ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ডাকঘরের আওতায়। তৃতীয় ফর্মে পোস্টকোড ১২০৬। অথচ মোহাম্মদপুরের পোস্টকোড ১২০৭।
এর বাইরে তিনটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নম্বর আলাদা হলেও ই-টিন নম্বর একই (৩৮০……৪২৯)। অর্থাৎ একটি টিন নম্বরে একবার আয়কর দিয়ে বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া অফিসের ঠিকানা কাফরুলে হলেও তারিকুজ্জামানকে দেওয়া হয়েছে ঢাকার উত্তরা ও তুরাগ অঞ্চলের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘ওই সরকারি কর্মকর্তা (জাকির) তার মামাতো ভাইয়ের ব্যবসা থেকে লাভবান হয়েছেন কিনা বা নিজের পদ ব্যবহার করে ব্যবসায়িক কোনো সুবিধা দিয়েছেন কিনা; সেটি তদন্তের দাবি রাখে। কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি তদন্ত করে দেখা। একই সঙ্গে ওই কর্মকর্তার বাসার ঠিকানার সঙ্গে ডিস্ট্রিবিউটর ব্যবসায়ীর ঠিকানা মিলে যায়। এটা কিভাবে হলো? কর্মকর্তা কি ব্যবসায়ীকে সেটি ভাড়া দিয়েছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।’

স্বার্থের সংঘাত দেখছেন না জাকির
মামাতো ভাইয়ের নগদের ডিস্ট্রিবিউটর ব্যবসা নিয়ে কোনো স্বার্থের সংঘাত নেই বলে দাবি করেন জাকির হাসান নূর। তিনি বলেন, ‘আমার মামাতো ভাই ব্যবসা করে তার মতো। শুরুতে কিছুদিন সেই ব্যবসার ঠিকানা আমার বাসায় ছিল, এখন নেই। তার এই ব্যবসার বিষয়টি জানানো দরকার বলে মনে হয়নি। সে ব্যবসায়ী, ব্যবসা করে।’
নগদের ডিস্ট্রিবিউটর হওয়ার আগে তারিকুজ্জামান ব্যবসা করতেন না। এটি মনে করিয়ে দিলে জাকির বলেন, ‘ব্যবসা করতেন। এটা তার বাবার লাইসেন্স। সেই লাইসেন্সে ব্যবসা করতেন।’ এ সময় তারিকুজ্জামানকে কোনো সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথাও অস্বীকার করেন তিনি।
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘ওই কর্মকর্তার (জাকির) ডিস্ট্রিবিউটর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে জানা নেই। গত জানুয়ারিতে এখানে এসেছি, তদন্ত প্রতিবেদন এর আগের। সেটা এখনও দেখিনি। আপনি বললেন, বিষয়টি দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















