ঢাকা ০৮:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
জনস্বাস্থের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব:জেফরি এপস্টেইনের নতুন সংস্করণ ! যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের টোল আদায়ে অনিয়মের অভিযোগ সরকারি রাস্তার বরাদ্দের ইট দিয়ে নিজ বাড়ির রাস্তা করলেন ইউপি সদস্য দেবিদ্বার-চান্দিনা সড়ককে হাইওয়ে করার দাবি হাসনাত আবদুল্লাহর অনুষ্ঠানে প্রিয়াঙ্কাকে উপেক্ষা হলিউড তারকাদের, নানা বিতর্ক! কনটেন্ট ক্রিয়েটর আর এস ফাহিম আটক পুলিশের সংস্কারে ফ্রান্সের সহযোগিতা চাইলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মধ্যরাতের পর ইসরায়েলে পাঁচ দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানের রামপাল সরকারি কলেজ নদীভাঙনের হুমকিতে : জরুরি পদক্ষেপের দাবি শিবগঞ্জে হেরোইন-ইয়াবা উদ্ধার, নারী আটক, স্বামী পলাতক

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে হাম রোগের প্রকোপ, ৪ জনের মৃত্যু

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত তিন মাসে জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ৬ শতাধিক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। যা স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

রোববার (২৯ মার্চ) সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা হাসপাতালে রোগীর উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। হামসহ অন্যান্য শিশুরোগ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকসহ স্টাফরা হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসা সেবা দিতে। তবে রোগীরা জানিয়েছেন, তারা এই হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাসপাতালটিতে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭২জন ভর্তি আছেন। তার মধ্যে ৩৯ জন ছেলে এবং ৩৩ জন মেয়ে শিশু। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন এবং একজনকে রাজশাহীতে রেফার্ড করা হয়েছে।
এছাড়াও হাসপাতালটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়ে ১১০ জন শিশু রোগী ভর্তি হয়েছে এবং ১৪৫ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে হাম বাদে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৭০ জন শিশু রোগী চিকিৎসাধীন আছেন।

এদিকে রোগীর চাপ এতো বেশি যে, অনেক শিশু শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের মেঝেতেও থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে আইসোলেশন ও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি থাকায় আক্রান্ত শিশুদের পুরোপুরি আলাদা রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অন্য রোগ নিয়ে আসা শিশুরাও হাসপাতালে থাকা অবস্থায় সংক্রমিত হচ্ছে। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) নিশ্চিত করা এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র পথ বলেও জানান তারা।

জেলা হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক বিভাগের বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা ৯৫ ভাগ শিশু রোগীকে পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে যাদের শ্বাসকষ্ট আছে, অক্সিজেন ডিপেন্টেন্ড ও আইসোলেশনের দরকার, তাদেরকে রাজশাহীতে রেফার্ড করা হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার টিকরামপুর এলাকার মলি খাতুন বলেন, আমার মেয়ে কিছুদিন আগে হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছে। গত পরশুদিন থেকে অনেক জ্বর। গতকাল সকালে খিচুনিসহ জ্বর ছিল। পরে হাসপাতালে এসে মেয়েকে নিয়ে ভর্তি আছি। ইনজেকশন দিয়েছে, ওষুধ চলছে। আজ রাত থেকে আল্লাহর রহমতে জ্বর নেই। বর্তমানে বাচ্চা ভালো আছে।

জুবায়ের নামে আরেকজন বলেন, আমি গতকাল রাত সাড়ে ১০টার সময়ে আমার ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে এসেছিলাম। সেই সময়ে আমার ছেলের অনেক জ্বর ছিল। আলহামদুলিল্লাহ এখন আমার ছেলে অনেক সুস্থতা অনুভব করছে। এখানকার চিকিৎসক ও স্টাফরা অনেক ভালো। তারা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছে। তবে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।

শিবগঞ্জ উপজেলার ফাতেমা নামের আরেকজন বলেন, আমার বাচ্চা জন্ম নেওয়ার পাঁচ ছয়দিন পর থেকেই ঠান্ডা লেগেছিল। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলাম কিন্তু তাদের ওষুধ খেয়ে ভালো হয়নি। পরে ডা. মাহফুজ রায়হান স্যারের কাছে চিকিৎসা নিয়েছিলাম রোজার সময়ে। তিনি বলেছিলেন, এই ওষুধগুলো বাচ্চাকে খাওয়াবেন এবং সাতদিন পর এক্স-রে করে নিয়ে আসবেন। পরে তিনি রির্পোট দেখে বলেন, রির্পোট ভালো না, খুবই খারাপ। স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী জরুরি বিভাগে গিয়ে ছেলেকে নিয়ে ভর্তি হয়। তারপর এখানে বাচ্চাকে চিকিৎসা দেয় এবং এখন বাচ্চা অনেক ভালো আছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের শিশু বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মাহফুজ রায়হান বলেন, এই সিজনে তিন মাস আগে আমরা প্রথম হামের রোগী আইডেন্টিফাই করেছিলাম। সেসময়ে প্রতিদিন তিন থেকে চারটি করে রোগী ভর্তি করা হয়েছিল। তারা মূলত নিউমোনিয়া রোগের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু পরে আমরা বুঝতে পারি এটা হাম। এরপর থেকে প্রকোপটা বাড়তে থাকে। দুইমাস আগে যখন প্রকোপটা বেড়ে গেল, তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে, প্রকোপটা আরও বেড়ে যাবে। ফলে তখন আমরা  আলাদাভাবে আইসোলেশনের একটা ওয়ার্ড চালু করেছি। প্রায় ২০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড। আর ফ্লোরিং মিলে এই হাসপাতালে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জনকে চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা আছে।

তিনি বলেন, গত একমাস থেকে এখানে ৫০ এর অধিক হামের বাচ্চা ভর্তি থাকছে। এছাড়া গতকালকে যখন রাউন্ড শুরু করি, তখন ৭০ এর অধিক বাচ্চা ভর্তি ছিল এবং ২০ থেকে ৩০টি বাচ্চাকে ছুটি দিয়েছি। আজকে ৮০ এর অধিক ইতোমধ্যে ভর্তি আছে। আজ সারাদিনে আরও ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে হামের প্রকোপটা মারাত্মকভাবে আরও বাড়ছে। এটা মারাত্মক ছোঁয়াছে রোগ হওয়ার কারণে এবং অনেক বাচ্চা টিকা নেয়নি। ফলে নয় মাসের নিচের বাচ্চাগুলো বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এটার মৃত্যুহারও যথেষ্ট বেশি এবং এটাতে কম্পিকেশনের হারও বেশি।

তিনি আরও বলেন, আমাদের সদর হাসপাতালে যে বাচ্চাগুলো ভর্তি হচ্ছে, তার মধ্যে ৯৫ ভাগ বাচ্চাকে চিকিৎসা দিতে সক্ষম। কিন্তু যেগুলো আইসিইউ লাগার মতো অবস্থা ও শ্বাসকষ্ট অতিরিক্ত হচ্ছে, অক্সিজেন ডিপেন্টডেন্ট সেই বাচ্চাগুলোকে আমরা রাজশাহীতে পাঠাচ্ছি। এ পর্যন্ত গত তিনমাসে হামে আক্রান্ত হয়ে চারজন মারা গেছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে একজন একজন করে দুইজন এবং রানিং মার্চ মাসে দুইজন মারা গেছে। গত তিনমাসে ৬ শতাধিক রোগী ভর্তি হয়ে চিৎকিসা নিয়েছেন।

ডা. মাহফুজ রায়হান বলেন, হাম এমন একটা মারাত্মক রোগ যে ভালো হয়ে যাওয়ার পরেও পরবর্তী দুই থেকে তিন মাস এই বাচ্চাগুলোর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারে কমে যায়। এই কারণে হাম ভালো হয়ে যাওয়ার পরেও সেই বাচ্চার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে আরও তিনমাসের বেশি সময় লাগতে পারে। এজন্য তাদেরকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো ও তাদের প্রতি অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া দরকার। আর অসুস্থতা এড়ানোর জন্য যেটা করণীয়, সেটা হলো টিকা নিতে হবে। গত তিন থেকে চারবছরে অনেক বাচ্চা হামের টিকা মিস করার কারণে এই বার হামের মহামারিটি দেখা গেছে।

কেন মিস করেছে সেটার অনেকগুলো ব্যাখা আছে। হাম আক্রান্ত হয়ে গেলে বাচ্চাগুলোকে আইসোলেশনে রাখতে হবে। আপাতত বাইরে ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বাচ্চাদেরকে যেতে না দেওয়া। এছাড়াও আরেকটি ভয়ের বিষয় হলো- গত এক সপ্তাহ থেকে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে। তাই হাম আর ডেঙ্গু একসাথে শুরু হলে পরিস্থিতি কোনদিকে গড়াবে আল্লাই ভালো জানে।

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, এই মুহূর্তে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সারাদেশে হাম রোগের সংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের সদর হাসপাতালে আজ মোট রোগী ৫৭১ জন। তার মধ্যে ২৩১ জনই হচ্ছে শিশু। এরমধ্যে ৭১ জন হচ্ছে হাম রোগে আক্রান্ত। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে যে পরিমাণ রোগী থাকার কথা ছিল, তার চেয়ে প্রায় আড়াইগুন রোগী ভর্তি আছে এবং এই আড়াইগুন রোগীর প্রায় ৪০ ভাগ হচ্ছে শিশুরোগী।

তিনি বলেন, আমরা জানুয়ারি মাসের দিকে হাম রোগী পাই এবং এই রোগীগুলোকে আইসিলেশনে নিয়ে যাওয়ার কাজ করি। আমাদের হাসপাতালে একটি ইউনিট আছে- যা কিডনি বা ডায়লাইসিস ইউনিট হিসেবে ছিল। পরে আমরা সেই ইউনিটকে হাম ইউনিট করেছি। হাম এমন একটা রোগ- যা সহজেই একশিশু থেকে আরেক শিশুকে আক্রান্ত করার ঝুঁকি থাকে। তাই তাদেরকে আলাদা করার জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড করেছি। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই আমাদের এই আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু আছে। তাদেরকে ভিটামিন এ সহ পূর্ণাঙ্গ চিৎকিসা দেওয়া হচ্ছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জনস্বাস্থের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব:জেফরি এপস্টেইনের নতুন সংস্করণ !

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে হাম রোগের প্রকোপ, ৪ জনের মৃত্যু

আপডেট সময় ০৫:৫২:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত তিন মাসে জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ৬ শতাধিক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। যা স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

রোববার (২৯ মার্চ) সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা হাসপাতালে রোগীর উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। হামসহ অন্যান্য শিশুরোগ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকসহ স্টাফরা হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসা সেবা দিতে। তবে রোগীরা জানিয়েছেন, তারা এই হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাসপাতালটিতে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭২জন ভর্তি আছেন। তার মধ্যে ৩৯ জন ছেলে এবং ৩৩ জন মেয়ে শিশু। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন এবং একজনকে রাজশাহীতে রেফার্ড করা হয়েছে।
এছাড়াও হাসপাতালটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়ে ১১০ জন শিশু রোগী ভর্তি হয়েছে এবং ১৪৫ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে হাম বাদে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৭০ জন শিশু রোগী চিকিৎসাধীন আছেন।

এদিকে রোগীর চাপ এতো বেশি যে, অনেক শিশু শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের মেঝেতেও থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে আইসোলেশন ও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি থাকায় আক্রান্ত শিশুদের পুরোপুরি আলাদা রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অন্য রোগ নিয়ে আসা শিশুরাও হাসপাতালে থাকা অবস্থায় সংক্রমিত হচ্ছে। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) নিশ্চিত করা এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র পথ বলেও জানান তারা।

জেলা হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক বিভাগের বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা ৯৫ ভাগ শিশু রোগীকে পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে যাদের শ্বাসকষ্ট আছে, অক্সিজেন ডিপেন্টেন্ড ও আইসোলেশনের দরকার, তাদেরকে রাজশাহীতে রেফার্ড করা হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার টিকরামপুর এলাকার মলি খাতুন বলেন, আমার মেয়ে কিছুদিন আগে হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছে। গত পরশুদিন থেকে অনেক জ্বর। গতকাল সকালে খিচুনিসহ জ্বর ছিল। পরে হাসপাতালে এসে মেয়েকে নিয়ে ভর্তি আছি। ইনজেকশন দিয়েছে, ওষুধ চলছে। আজ রাত থেকে আল্লাহর রহমতে জ্বর নেই। বর্তমানে বাচ্চা ভালো আছে।

জুবায়ের নামে আরেকজন বলেন, আমি গতকাল রাত সাড়ে ১০টার সময়ে আমার ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে এসেছিলাম। সেই সময়ে আমার ছেলের অনেক জ্বর ছিল। আলহামদুলিল্লাহ এখন আমার ছেলে অনেক সুস্থতা অনুভব করছে। এখানকার চিকিৎসক ও স্টাফরা অনেক ভালো। তারা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছে। তবে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।

শিবগঞ্জ উপজেলার ফাতেমা নামের আরেকজন বলেন, আমার বাচ্চা জন্ম নেওয়ার পাঁচ ছয়দিন পর থেকেই ঠান্ডা লেগেছিল। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলাম কিন্তু তাদের ওষুধ খেয়ে ভালো হয়নি। পরে ডা. মাহফুজ রায়হান স্যারের কাছে চিকিৎসা নিয়েছিলাম রোজার সময়ে। তিনি বলেছিলেন, এই ওষুধগুলো বাচ্চাকে খাওয়াবেন এবং সাতদিন পর এক্স-রে করে নিয়ে আসবেন। পরে তিনি রির্পোট দেখে বলেন, রির্পোট ভালো না, খুবই খারাপ। স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী জরুরি বিভাগে গিয়ে ছেলেকে নিয়ে ভর্তি হয়। তারপর এখানে বাচ্চাকে চিকিৎসা দেয় এবং এখন বাচ্চা অনেক ভালো আছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের শিশু বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মাহফুজ রায়হান বলেন, এই সিজনে তিন মাস আগে আমরা প্রথম হামের রোগী আইডেন্টিফাই করেছিলাম। সেসময়ে প্রতিদিন তিন থেকে চারটি করে রোগী ভর্তি করা হয়েছিল। তারা মূলত নিউমোনিয়া রোগের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু পরে আমরা বুঝতে পারি এটা হাম। এরপর থেকে প্রকোপটা বাড়তে থাকে। দুইমাস আগে যখন প্রকোপটা বেড়ে গেল, তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে, প্রকোপটা আরও বেড়ে যাবে। ফলে তখন আমরা  আলাদাভাবে আইসোলেশনের একটা ওয়ার্ড চালু করেছি। প্রায় ২০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড। আর ফ্লোরিং মিলে এই হাসপাতালে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জনকে চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা আছে।

তিনি বলেন, গত একমাস থেকে এখানে ৫০ এর অধিক হামের বাচ্চা ভর্তি থাকছে। এছাড়া গতকালকে যখন রাউন্ড শুরু করি, তখন ৭০ এর অধিক বাচ্চা ভর্তি ছিল এবং ২০ থেকে ৩০টি বাচ্চাকে ছুটি দিয়েছি। আজকে ৮০ এর অধিক ইতোমধ্যে ভর্তি আছে। আজ সারাদিনে আরও ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে হামের প্রকোপটা মারাত্মকভাবে আরও বাড়ছে। এটা মারাত্মক ছোঁয়াছে রোগ হওয়ার কারণে এবং অনেক বাচ্চা টিকা নেয়নি। ফলে নয় মাসের নিচের বাচ্চাগুলো বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এটার মৃত্যুহারও যথেষ্ট বেশি এবং এটাতে কম্পিকেশনের হারও বেশি।

তিনি আরও বলেন, আমাদের সদর হাসপাতালে যে বাচ্চাগুলো ভর্তি হচ্ছে, তার মধ্যে ৯৫ ভাগ বাচ্চাকে চিকিৎসা দিতে সক্ষম। কিন্তু যেগুলো আইসিইউ লাগার মতো অবস্থা ও শ্বাসকষ্ট অতিরিক্ত হচ্ছে, অক্সিজেন ডিপেন্টডেন্ট সেই বাচ্চাগুলোকে আমরা রাজশাহীতে পাঠাচ্ছি। এ পর্যন্ত গত তিনমাসে হামে আক্রান্ত হয়ে চারজন মারা গেছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে একজন একজন করে দুইজন এবং রানিং মার্চ মাসে দুইজন মারা গেছে। গত তিনমাসে ৬ শতাধিক রোগী ভর্তি হয়ে চিৎকিসা নিয়েছেন।

ডা. মাহফুজ রায়হান বলেন, হাম এমন একটা মারাত্মক রোগ যে ভালো হয়ে যাওয়ার পরেও পরবর্তী দুই থেকে তিন মাস এই বাচ্চাগুলোর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারে কমে যায়। এই কারণে হাম ভালো হয়ে যাওয়ার পরেও সেই বাচ্চার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে আরও তিনমাসের বেশি সময় লাগতে পারে। এজন্য তাদেরকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো ও তাদের প্রতি অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া দরকার। আর অসুস্থতা এড়ানোর জন্য যেটা করণীয়, সেটা হলো টিকা নিতে হবে। গত তিন থেকে চারবছরে অনেক বাচ্চা হামের টিকা মিস করার কারণে এই বার হামের মহামারিটি দেখা গেছে।

কেন মিস করেছে সেটার অনেকগুলো ব্যাখা আছে। হাম আক্রান্ত হয়ে গেলে বাচ্চাগুলোকে আইসোলেশনে রাখতে হবে। আপাতত বাইরে ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বাচ্চাদেরকে যেতে না দেওয়া। এছাড়াও আরেকটি ভয়ের বিষয় হলো- গত এক সপ্তাহ থেকে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে। তাই হাম আর ডেঙ্গু একসাথে শুরু হলে পরিস্থিতি কোনদিকে গড়াবে আল্লাই ভালো জানে।

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, এই মুহূর্তে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সারাদেশে হাম রোগের সংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের সদর হাসপাতালে আজ মোট রোগী ৫৭১ জন। তার মধ্যে ২৩১ জনই হচ্ছে শিশু। এরমধ্যে ৭১ জন হচ্ছে হাম রোগে আক্রান্ত। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে যে পরিমাণ রোগী থাকার কথা ছিল, তার চেয়ে প্রায় আড়াইগুন রোগী ভর্তি আছে এবং এই আড়াইগুন রোগীর প্রায় ৪০ ভাগ হচ্ছে শিশুরোগী।

তিনি বলেন, আমরা জানুয়ারি মাসের দিকে হাম রোগী পাই এবং এই রোগীগুলোকে আইসিলেশনে নিয়ে যাওয়ার কাজ করি। আমাদের হাসপাতালে একটি ইউনিট আছে- যা কিডনি বা ডায়লাইসিস ইউনিট হিসেবে ছিল। পরে আমরা সেই ইউনিটকে হাম ইউনিট করেছি। হাম এমন একটা রোগ- যা সহজেই একশিশু থেকে আরেক শিশুকে আক্রান্ত করার ঝুঁকি থাকে। তাই তাদেরকে আলাদা করার জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড করেছি। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই আমাদের এই আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু আছে। তাদেরকে ভিটামিন এ সহ পূর্ণাঙ্গ চিৎকিসা দেওয়া হচ্ছে।