ঢাকা ০৫:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পার্বতীপুরে বিএনপির ইফতার মাহফিলে সাবেক মেয়র মিনহাজুল হককে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা শ্রীপুরে সাংবাদিককে মিথ্যা মামলা দেওয়ায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ কুমিল্লায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৬টি ঘর ও ২টি গোডাউন ভস্মীভূত, ক্ষতি প্রায় ১৫ লাখ টাকা ‎বোরহানউদ্দিনে শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাদক বিরোধী সচেতনতামূলক সভা ও র‍্যালি অনুষ্ঠিত রাজবাড়ীতে পাটের গোডাউনে আগুন, ৩ ফায়ার ফাইটার আহত তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম দ্রুত শুরু করতে জাইকার সহযোগিতা কামনা সবাই বলছিল তুমি বড় ম্যাচ জেতাতে যাচ্ছ : অভিষেক অনিয়মের প্রমাণ থাকলেও বহাল তবিয়তে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের এমডি মীর মোফাজ্জল হোসেন ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডে নিলয় পাশাকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ ফৌজদারহাটে বিটিসিএলের শাহ আলম–জয়নাল–উৎপল সিন্ডিকেটের সরকারি গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগ

অনিয়মের প্রমাণ থাকলেও বহাল তবিয়তে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের এমডি মীর মোফাজ্জল হোসেন

পদোন্নতিতে ঘুষ বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম, কর্মকর্তাদের বদলির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মীর মোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযোগগুলোর প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পরও তিনি এখনও স্বপদে বহাল থাকায় ব্যাংকের ভেতরে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, অভিযোগের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় ব্যাংকের সুশাসন ও কর্মপরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত কয়েক বছরে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকে পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়াকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এসব অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোফাজ্জল হোসেন। তাদের অভিযোগ, যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার পরিবর্তে আর্থিক লেনদেন ও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক যোগ্য কর্মকর্তা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, আর তুলনামূলকভাবে জুনিয়র কর্মকর্তারা অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত পদোন্নতি পেয়েছেন।

ব্যাংকের ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মীর মোফাজ্জল হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পদোন্নতি ও বদলির বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা এবং প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করা হয়েছে। তারা বলেন, ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা বছরের পর বছর পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করলেও তাদের নাম তালিকায় আসেনি। অথচ অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কিছু কর্মকর্তা অল্প সময়ের মধ্যেই পদোন্নতি পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছেন।

এই অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গত বছরের ৯ আগস্ট পদোন্নতি বঞ্চিত কয়েকশ’ কর্মকর্তা ও কর্মচারী জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে। তারা দাবি করেন, নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে সুবিধা দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে পদোন্নতির তালিকা তৈরি করা হয়েছে। আন্দোলনকারীরা বলেন, অনেক যোগ্য কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই পদে থেকে গেলেও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কর্মকর্তারা দ্রুত পদোন্নতি পেয়েছেন।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা আরও অভিযোগ করেন, তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর তাদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক কর্মকর্তাকে দূরবর্তী জেলায় বদলি করা হয়েছে। যাদের বাড়ি ঢাকায়, তাদের ভোলা, পঞ্চগড় কিংবা দেশের অন্য প্রান্তে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। তাদের মতে, এটি ছিল আন্দোলন দমনের কৌশল।

ভুক্তভোগী এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যখন অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেছি, তখনই আমাদের টার্গেট করা হয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেককে এমন জায়গায় বদলি করা হয়েছে যেখানে যাতায়াত করা কঠিন। এটা স্পষ্টভাবে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ।”

আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা শুধু চাইছিলাম যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি হোক। কিন্তু এর বদলে আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা এখনো ক্ষমতায় বহাল রয়েছেন।”

এদিকে পদোন্নতি সংক্রান্ত এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি ব্যাংকের পদোন্নতি প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং কর্মকর্তাদের অভিযোগ পর্যালোচনা করে। তদন্তে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে সিনিয়র কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে জুনিয়র কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার পর মীর মোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এতে করে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মীর মোফাজ্জল হোসেন দাবি করেন, তিনি এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না। তার মতে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ীই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।”

তবে ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, পদোন্নতি নীতিমালা ২০১২-এর ক্রাইটেরিয়া অনুসরণ করা হলে এত সংখ্যক কর্মকর্তা বঞ্চিত হতেন না। তারা দাবি করেন, অনেক ক্ষেত্রে নীতিমালার ব্যাখ্যা নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করা হয়েছে।

এদিকে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরও পদোন্নতি কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়িত হয়নি।

একজন কর্মকর্তা বলেন, “মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা আসার পর আমরা ভেবেছিলাম সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।”

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এতে করে কর্মপরিবেশও প্রভাবিত হচ্ছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ব্যাংকের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ বিষয়ে সুশাসন ও দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকলে একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়। তিনি বলেন, “যদি যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হন এবং অন্যরা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পদোন্নতি পান, তাহলে সেটি অবশ্যই অনিয়মের মধ্যে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে লেনদেন বা পক্ষপাতিত্ব হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তা অন্যদের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি করে।

বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক মূলত গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যাংকটির সারাদেশে প্রায় ২৫০টি শাখা রয়েছে এবং প্রায় ৮০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী এখানে কর্মরত আছেন। তবে ব্যাংকের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ এখনো ফাঁকা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ব্যাংকের ভেতরে চলমান এই সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক বিশ্লেষকও। তাদের মতে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক অনিয়ম এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পদোন্নতি ও বদলির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগততা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বঞ্চিত কর্মকর্তারা দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযোগের সঠিক সমাধান চান। তাদের মতে, অভিযোগের সঠিক তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ব্যাংকের ভেতরে আস্থা ফিরবে।

ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চাই প্রতিষ্ঠানটি সঠিকভাবে পরিচালিত হোক। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে তার বিচার হওয়া উচিত। এতে প্রতিষ্ঠানেরই মঙ্গল হবে।”

এদিকে অভিযোগ, তদন্ত এবং কর্মকর্তাদের ক্ষোভের মধ্যেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোফাজ্জল হোসেন এখনো দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরও কেন এখনো কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাদের মতে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

পার্বতীপুরে বিএনপির ইফতার মাহফিলে সাবেক মেয়র মিনহাজুল হককে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা

অনিয়মের প্রমাণ থাকলেও বহাল তবিয়তে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের এমডি মীর মোফাজ্জল হোসেন

আপডেট সময় ০৩:৩৬:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

পদোন্নতিতে ঘুষ বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম, কর্মকর্তাদের বদলির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মীর মোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযোগগুলোর প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পরও তিনি এখনও স্বপদে বহাল থাকায় ব্যাংকের ভেতরে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, অভিযোগের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় ব্যাংকের সুশাসন ও কর্মপরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত কয়েক বছরে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকে পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়াকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এসব অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোফাজ্জল হোসেন। তাদের অভিযোগ, যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার পরিবর্তে আর্থিক লেনদেন ও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক যোগ্য কর্মকর্তা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, আর তুলনামূলকভাবে জুনিয়র কর্মকর্তারা অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত পদোন্নতি পেয়েছেন।

ব্যাংকের ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মীর মোফাজ্জল হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পদোন্নতি ও বদলির বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা এবং প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করা হয়েছে। তারা বলেন, ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা বছরের পর বছর পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করলেও তাদের নাম তালিকায় আসেনি। অথচ অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কিছু কর্মকর্তা অল্প সময়ের মধ্যেই পদোন্নতি পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছেন।

এই অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গত বছরের ৯ আগস্ট পদোন্নতি বঞ্চিত কয়েকশ’ কর্মকর্তা ও কর্মচারী জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে। তারা দাবি করেন, নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে সুবিধা দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে পদোন্নতির তালিকা তৈরি করা হয়েছে। আন্দোলনকারীরা বলেন, অনেক যোগ্য কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই পদে থেকে গেলেও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কর্মকর্তারা দ্রুত পদোন্নতি পেয়েছেন।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা আরও অভিযোগ করেন, তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর তাদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক কর্মকর্তাকে দূরবর্তী জেলায় বদলি করা হয়েছে। যাদের বাড়ি ঢাকায়, তাদের ভোলা, পঞ্চগড় কিংবা দেশের অন্য প্রান্তে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। তাদের মতে, এটি ছিল আন্দোলন দমনের কৌশল।

ভুক্তভোগী এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যখন অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেছি, তখনই আমাদের টার্গেট করা হয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেককে এমন জায়গায় বদলি করা হয়েছে যেখানে যাতায়াত করা কঠিন। এটা স্পষ্টভাবে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ।”

আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা শুধু চাইছিলাম যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি হোক। কিন্তু এর বদলে আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা এখনো ক্ষমতায় বহাল রয়েছেন।”

এদিকে পদোন্নতি সংক্রান্ত এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি ব্যাংকের পদোন্নতি প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং কর্মকর্তাদের অভিযোগ পর্যালোচনা করে। তদন্তে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে সিনিয়র কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে জুনিয়র কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার পর মীর মোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এতে করে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মীর মোফাজ্জল হোসেন দাবি করেন, তিনি এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না। তার মতে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ীই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।”

তবে ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, পদোন্নতি নীতিমালা ২০১২-এর ক্রাইটেরিয়া অনুসরণ করা হলে এত সংখ্যক কর্মকর্তা বঞ্চিত হতেন না। তারা দাবি করেন, অনেক ক্ষেত্রে নীতিমালার ব্যাখ্যা নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করা হয়েছে।

এদিকে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরও পদোন্নতি কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়িত হয়নি।

একজন কর্মকর্তা বলেন, “মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা আসার পর আমরা ভেবেছিলাম সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।”

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এতে করে কর্মপরিবেশও প্রভাবিত হচ্ছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ব্যাংকের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ বিষয়ে সুশাসন ও দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকলে একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়। তিনি বলেন, “যদি যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হন এবং অন্যরা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পদোন্নতি পান, তাহলে সেটি অবশ্যই অনিয়মের মধ্যে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে লেনদেন বা পক্ষপাতিত্ব হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তা অন্যদের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি করে।

বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক মূলত গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যাংকটির সারাদেশে প্রায় ২৫০টি শাখা রয়েছে এবং প্রায় ৮০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী এখানে কর্মরত আছেন। তবে ব্যাংকের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ এখনো ফাঁকা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ব্যাংকের ভেতরে চলমান এই সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক বিশ্লেষকও। তাদের মতে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক অনিয়ম এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পদোন্নতি ও বদলির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগততা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বঞ্চিত কর্মকর্তারা দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযোগের সঠিক সমাধান চান। তাদের মতে, অভিযোগের সঠিক তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ব্যাংকের ভেতরে আস্থা ফিরবে।

ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চাই প্রতিষ্ঠানটি সঠিকভাবে পরিচালিত হোক। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে তার বিচার হওয়া উচিত। এতে প্রতিষ্ঠানেরই মঙ্গল হবে।”

এদিকে অভিযোগ, তদন্ত এবং কর্মকর্তাদের ক্ষোভের মধ্যেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোফাজ্জল হোসেন এখনো দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরও কেন এখনো কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাদের মতে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।