ঢাকা ০৪:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
শ্রীপুরে সাংবাদিককে মিথ্যা মামলা দেওয়ায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ কুমিল্লায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৬টি ঘর ও ২টি গোডাউন ভস্মীভূত, ক্ষতি প্রায় ১৫ লাখ টাকা ‎বোরহানউদ্দিনে শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাদক বিরোধী সচেতনতামূলক সভা ও র‍্যালি অনুষ্ঠিত রাজবাড়ীতে পাটের গোডাউনে আগুন, ৩ ফায়ার ফাইটার আহত তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম দ্রুত শুরু করতে জাইকার সহযোগিতা কামনা সবাই বলছিল তুমি বড় ম্যাচ জেতাতে যাচ্ছ : অভিষেক অনিয়মের প্রমাণ থাকলেও বহাল তবিয়তে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের এমডি মীর মোফাজ্জল হোসেন ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডে নিলয় পাশাকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ ফৌজদারহাটে বিটিসিএলের শাহ আলম–জয়নাল–উৎপল সিন্ডিকেটের সরকারি গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগ টেকসই অংশীদারত্বে অব্যাহত সহযোগিতায় জোর বাংলা‌দেশ-কানাডার

সিন্ডিকেটে বন্দি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ

দেশের আবাসন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ’ (জাগৃক) এখন দুর্নীতি, অনিয়ম এবং একটি শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে বিপর্যস্ত। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টরে সংস্কার ও শুদ্ধি অভিযান চললেও, জাগৃক-এ এখনো নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে বিগত আওয়ামী শাসন আমলের সুবিধাভোগী একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী। অভিযোগ উঠেছে, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই চক্রটি রাতারাতি রাজনৈতিক আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ‘নব্য বিএনপি’ সেজে নিজেদের লুটপাটের সাম্রাজ্য রক্ষা করছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পকেটে পুরেছেন। ৫ই আগস্টের পর যেখানে ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা, সেখানে জাগৃক-এর এই প্রভাবশালী অংশটি উল্টো ভোল পাল্টে ফেলেছে। তারা বিএনপি পন্থি ‘ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ডিইএব)-এর কেন্দ্রীয় নেতাদের কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে সংগঠনের আহ্বায়ক কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ডিইএব-এর জাগৃক শাখার আহ্বায়ক কমিটিতে স্থান পাওয়া অধিকাংশ নেতাই চিহ্নিত সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— আহ্বায়ক নেজামুল হক মজুমদার, যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ সোহেল সরকার, যুগ্ম সদস্য সচিব মাহমুদুর রহমান, হুমায়ুন কবির এবং ইমামুল ইসলাম। এছাড়া সদস্য তালিকায় থাকা হারুনুর রশিদ, শাহরিয়ার জনি, আব্দুল ওয়াদুদ তালুকদার, খায়রুল ইসলাম ও সানাউল্ল্যাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের আমলে দাপুটে অবস্থানের প্রমাণ রয়েছে। তারা দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ঢাকাকেই নিজেদের ‘আর্থিক অভয়ারণ্য’ বানিয়ে রেখেছেন।

সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী, একই স্টেশনে তিন বছরের বেশি দায়িত্ব পালনের নিয়ম না থাকলেও এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ক্ষমতার দাপটে টানা ১৫ বছর ধরে রাজধানীতে খুঁটি গেঁড়ে আছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি বদলি বা পদায়নের মৌসুমে তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে নিজেদের পদ টিকিয়ে রাখেন। এই দীর্ঘ সময়ে তারা মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা এলাকায় প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ, অবৈধ জমি লিজ এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্প অনুমোদনের মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির পাহাড় গড়েছেন।

সাধারণ প্রকৌশলীদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের কাছে পুরো প্রতিষ্ঠান জিম্মি। কেউ তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করলে তাকে বিভাগীয় মামলা, দূরবর্তী জেলায় শাস্তিমূলক বদলি বা শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। এমনকি নব্য বিএনপি সেজে তারা এখন সাধারণ কর্মকর্তাদের ভয় দেখাচ্ছেন এই বলে যে— সরকার বদলালেও আমাদের হাত অনেক লম্বা।

এই চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে কেবল আর্থিক অনিয়মই নয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে সরাসরি যুক্ত থেকে মানুষ হত্যার অভিযোগও রয়েছে। মিরপুর মডেল থানা এবং পল্টন থানায় দায়েরকৃত একাধিক হত্যা মামলায় (মিরপুর মডেল থানা মামলা নং-০৮, পল্টন থানা মামলা নং-২৫) এই সিন্ডিকেটের অনেক নেতা এজাহারভুক্ত আসামি। বর্তমানে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাদিউজ্জামান কারাগারে থাকলেও অন্য আসামিরা প্রকাশ্যেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে আহ্বায়ক নেজামুল হক মজুমদারের বিরুদ্ধে। তিনি ফেনীর ছাগলনাইয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে বর্বরোচিত হামলার অন্যতম আসামি ছিলেন। অথচ এখন তিনিই নব্য বিএনপি সেজে পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র মতে, বিপুল অর্থ ব্যয় করে তিনি পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ম্যানেজ করে নিজের নাম মামলা থেকে বাদ দিয়েছেন এবং বর্তমানে প্রশাসনের উচ্চস্তরে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রতিটি প্রকল্পে দুর্নীতির ক্ষত স্পষ্ট। নীতিমালা ভেঙে দলীয় ক্যাডারদের নামে প্লট বরাদ্দ এবং নামমাত্র মূল্যে সরকারি জমি লিজ দিয়ে সরকারের শত শত কোটি টাকা ক্ষতি করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন সময়ে জাগৃক-এর কার্যক্রমে অনুসন্ধান চালালেও রহস্যজনক কারণে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিটি তদন্ত টিমের অসাধু কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করে ফাইল ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।

দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জাগৃক-এর অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের নামে বিদেশে টাকা পাচার ও বেনামে অঢেল সম্পদের তথ্য আমাদের হাতে আসছে। একাধিক তদন্ত টিম কাজ করছে, খুব শীঘ্রই বড় ধরনের অ্যাকশন আসতে পারে।’

এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে কয়েকজন এমন এলাকার বাসিন্দা যা বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তারা দাবি করেন। তারা প্রকাশ্যেই দম্ভোক্তি করে বলছেন, আওয়ামী লীগের সময় যতটুকু ক্ষমতা ছিল, এখন তার চেয়ে বেশি আছে। টাকা থাকলে এই দেশে সব সম্ভব। তাদের এই উগ্র আচরণে প্রতিষ্ঠানের চেইন অফ কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মতো একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে যদি এই ‘বিষবৃক্ষ’ উপড়ে ফেলা না হয়, তবে আবাসন খাতে সরকারের কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হবে না। একই স্টেশনে বছরের পর বছর কর্মরত থাকা কর্মকর্তাদের অবিলম্বে ঢাকার বাইরে বদলি করা এবং তাদের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে স্বাধীন কমিশন গঠন করা এখন সময়ের দাবি। নতুবা, সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের ক্ষোভ যেকোনো সময় বড় ধরনের সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ মনদীপ ঘরাই (সচিব) জানিয়েছেন, বিষয়টি অতিরিক্ত সচিবকে জানানো হবে।

এই বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেছেন, সরকার যে কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনো দোসর বা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কেউ যদি অপরাধেও যুক্ত হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীপুরে সাংবাদিককে মিথ্যা মামলা দেওয়ায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ

সিন্ডিকেটে বন্দি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ

আপডেট সময় ১২:২৪:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

দেশের আবাসন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ’ (জাগৃক) এখন দুর্নীতি, অনিয়ম এবং একটি শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে বিপর্যস্ত। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টরে সংস্কার ও শুদ্ধি অভিযান চললেও, জাগৃক-এ এখনো নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে বিগত আওয়ামী শাসন আমলের সুবিধাভোগী একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী। অভিযোগ উঠেছে, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই চক্রটি রাতারাতি রাজনৈতিক আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ‘নব্য বিএনপি’ সেজে নিজেদের লুটপাটের সাম্রাজ্য রক্ষা করছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পকেটে পুরেছেন। ৫ই আগস্টের পর যেখানে ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা, সেখানে জাগৃক-এর এই প্রভাবশালী অংশটি উল্টো ভোল পাল্টে ফেলেছে। তারা বিএনপি পন্থি ‘ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ডিইএব)-এর কেন্দ্রীয় নেতাদের কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে সংগঠনের আহ্বায়ক কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ডিইএব-এর জাগৃক শাখার আহ্বায়ক কমিটিতে স্থান পাওয়া অধিকাংশ নেতাই চিহ্নিত সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— আহ্বায়ক নেজামুল হক মজুমদার, যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ সোহেল সরকার, যুগ্ম সদস্য সচিব মাহমুদুর রহমান, হুমায়ুন কবির এবং ইমামুল ইসলাম। এছাড়া সদস্য তালিকায় থাকা হারুনুর রশিদ, শাহরিয়ার জনি, আব্দুল ওয়াদুদ তালুকদার, খায়রুল ইসলাম ও সানাউল্ল্যাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের আমলে দাপুটে অবস্থানের প্রমাণ রয়েছে। তারা দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ঢাকাকেই নিজেদের ‘আর্থিক অভয়ারণ্য’ বানিয়ে রেখেছেন।

সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী, একই স্টেশনে তিন বছরের বেশি দায়িত্ব পালনের নিয়ম না থাকলেও এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ক্ষমতার দাপটে টানা ১৫ বছর ধরে রাজধানীতে খুঁটি গেঁড়ে আছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি বদলি বা পদায়নের মৌসুমে তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে নিজেদের পদ টিকিয়ে রাখেন। এই দীর্ঘ সময়ে তারা মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা এলাকায় প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ, অবৈধ জমি লিজ এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্প অনুমোদনের মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির পাহাড় গড়েছেন।

সাধারণ প্রকৌশলীদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের কাছে পুরো প্রতিষ্ঠান জিম্মি। কেউ তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করলে তাকে বিভাগীয় মামলা, দূরবর্তী জেলায় শাস্তিমূলক বদলি বা শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। এমনকি নব্য বিএনপি সেজে তারা এখন সাধারণ কর্মকর্তাদের ভয় দেখাচ্ছেন এই বলে যে— সরকার বদলালেও আমাদের হাত অনেক লম্বা।

এই চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে কেবল আর্থিক অনিয়মই নয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে সরাসরি যুক্ত থেকে মানুষ হত্যার অভিযোগও রয়েছে। মিরপুর মডেল থানা এবং পল্টন থানায় দায়েরকৃত একাধিক হত্যা মামলায় (মিরপুর মডেল থানা মামলা নং-০৮, পল্টন থানা মামলা নং-২৫) এই সিন্ডিকেটের অনেক নেতা এজাহারভুক্ত আসামি। বর্তমানে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাদিউজ্জামান কারাগারে থাকলেও অন্য আসামিরা প্রকাশ্যেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে আহ্বায়ক নেজামুল হক মজুমদারের বিরুদ্ধে। তিনি ফেনীর ছাগলনাইয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে বর্বরোচিত হামলার অন্যতম আসামি ছিলেন। অথচ এখন তিনিই নব্য বিএনপি সেজে পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র মতে, বিপুল অর্থ ব্যয় করে তিনি পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ম্যানেজ করে নিজের নাম মামলা থেকে বাদ দিয়েছেন এবং বর্তমানে প্রশাসনের উচ্চস্তরে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রতিটি প্রকল্পে দুর্নীতির ক্ষত স্পষ্ট। নীতিমালা ভেঙে দলীয় ক্যাডারদের নামে প্লট বরাদ্দ এবং নামমাত্র মূল্যে সরকারি জমি লিজ দিয়ে সরকারের শত শত কোটি টাকা ক্ষতি করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন সময়ে জাগৃক-এর কার্যক্রমে অনুসন্ধান চালালেও রহস্যজনক কারণে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিটি তদন্ত টিমের অসাধু কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করে ফাইল ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।

দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জাগৃক-এর অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের নামে বিদেশে টাকা পাচার ও বেনামে অঢেল সম্পদের তথ্য আমাদের হাতে আসছে। একাধিক তদন্ত টিম কাজ করছে, খুব শীঘ্রই বড় ধরনের অ্যাকশন আসতে পারে।’

এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে কয়েকজন এমন এলাকার বাসিন্দা যা বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তারা দাবি করেন। তারা প্রকাশ্যেই দম্ভোক্তি করে বলছেন, আওয়ামী লীগের সময় যতটুকু ক্ষমতা ছিল, এখন তার চেয়ে বেশি আছে। টাকা থাকলে এই দেশে সব সম্ভব। তাদের এই উগ্র আচরণে প্রতিষ্ঠানের চেইন অফ কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মতো একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে যদি এই ‘বিষবৃক্ষ’ উপড়ে ফেলা না হয়, তবে আবাসন খাতে সরকারের কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হবে না। একই স্টেশনে বছরের পর বছর কর্মরত থাকা কর্মকর্তাদের অবিলম্বে ঢাকার বাইরে বদলি করা এবং তাদের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে স্বাধীন কমিশন গঠন করা এখন সময়ের দাবি। নতুবা, সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের ক্ষোভ যেকোনো সময় বড় ধরনের সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ মনদীপ ঘরাই (সচিব) জানিয়েছেন, বিষয়টি অতিরিক্ত সচিবকে জানানো হবে।

এই বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেছেন, সরকার যে কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনো দোসর বা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কেউ যদি অপরাধেও যুক্ত হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হবে।