ঢাকা ১০:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
এ-প্লাসের মরীচিকা বনাম প্রকৃত শিক্ষা: আমাদের মানসিকতার অবক্ষয় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে পাঁচ ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতের বৈঠক ধামরাইয়ের ঐতিহাসিক রথযাত্রার উদ্বোধনে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা দিলেন চীফ হুইপ ফ্যাসিস্ট আমলে শাহিন চেয়ারম্যানের সহযোগী হয়ে কেরানীগঞ্জে ব্যাপক ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে : পবিপ্রবি উপাচার্য বড়লেখায় জমি বিরোধ মামলা তুলে নিতে হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ রঞ্জু মিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ধামইরহাটে ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় গাছের ডাল থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ফুটবলার মেসি-কেইন কেন ওমর সানিকে চাবুক মারতেন মৌসুমী?

ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে এডিবি অর্থায়নের উন্নয়ন কাজে ভয়াবহ অনিয়ম, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মফিজুর রহমান খানের দায়িত্বহীনতায় প্রকল্প প্রশ্নবিদ্ধ

  • স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ০২:২৩:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫৩৮ বার পড়া হয়েছে

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) উন্নয়ন কার্যক্রমে দুর্নীতি ও অনিয়ম যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে জবাবদিহি ও মাননিয়ন্ত্রণের চরম ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ ডিএসসিসির ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের নিমতলী নতুন রাস্তা কেরাম বোর্ডের গলিতে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়নে ড্রেন ও পাকা রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প। প্রায় ২ কোটি টাকা বরাদ্দের এই প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং সিডিউল না মেনে কাজ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের মূল দায়ভার গিয়ে পড়ছে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মফিজুর রহমান খানের ওপর, যিনি প্রকল্প বাস্তবায়ন, তদারকি ও মাননিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ দায়িত্বে রয়েছেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রকল্পের নির্ধারিত নকশা ও সিডিউল অনুসরণ না করেই ড্রেন নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রাস্তার দুই পাশের ড্রেন নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে ভাঙাচোরা, নিম্নমানের ইট, যা সরকারি নির্মাণ বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। সিমেন্টের পরিমাণ কম, বালির মান নিম্ন এবং গাঁথুনির কাজ অতি দুর্বল। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এভাবে কাজ চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যেই ড্রেন ধসে পড়বে এবং রাস্তা নষ্ট হয়ে যাবে। তাদের অভিযোগ, ঠিকাদাররা ইচ্ছাকৃতভাবে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে লাভের অঙ্ক বাড়াচ্ছে, আর এসব অনিয়ম দেখেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা নীরব ভূমিকা পালন করছেন।
এই প্রকল্পে দায়িত্বরত সাব-কন্ট্রাকটর লিটনের বক্তব্য আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে চাইলে তিনি তা বলতে অস্বীকৃতি জানান। বরং তিনি প্রকাশ্যে বলেন, “দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১২টি টেবিল শেষ করে আমাদের কাজ করতে হয়।” এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের আগে ঘুষ ও অবৈধ লেনদেনের একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা চালু রয়েছে। আরও আশঙ্কাজনক হলো, তিনি প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে তার ভাই রয়েছে বলে দাবি করে এক ধরনের প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিত দেন। এমন বক্তব্য প্রকল্প বাস্তবায়নে ভয়ভীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত বহন করে, যা সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ব্যর্থতাকেই সামনে আনে।
প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ২ কোটি টাকা হলেও সাব-কন্ট্রাকটরের দাবি অনুযায়ী প্রায় ১ কোটি টাকার কাজ ইতোমধ্যে চলমান। অথচ প্রকল্পের ব্যয় বিবরণী, কাজের অগ্রগতি ও মান যাচাই সংক্রান্ত কোনো তথ্যই প্রকাশ করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বরত সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার মল্লিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, প্রকৌশলী স্যারের অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো তথ্য দিতে পারবেন না। এই বক্তব্যে পরিষ্কার হয় যে, নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খানই তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং প্রকল্প সংক্রান্ত স্বচ্ছতা বাধাগ্রস্ত করছেন।
সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, অনিয়মের বিষয়ে জানতে সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মফিজুর রহমান খানের কার্যালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। একজন দায়িত্বশীল প্রকৌশলীর এমন নীরবতা ও তথ্য গোপনের প্রবণতা কেবল সন্দেহই বাড়ায় না, বরং তাকে এই অনিয়মের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়ে অভিযুক্ত করে। কারণ, সরকারি বিধি অনুযায়ী নির্বাহী প্রকৌশলীই প্রকল্পের সর্বশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, যিনি কাজের মান, উপকরণ, সময়সূচি ও অর্থ ব্যয়ের ওপর সরাসরি নজরদারি করবেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রকল্পে অনিয়ম নতুন কিছু নয়। ড্রেনের গভীরতা ও প্রস্থ নকশা অনুযায়ী রাখা হয়নি, ঢাল ঠিক না থাকায় পানি নিষ্কাশনে সমস্যা দেখা দেবে, আর রাস্তার বেস প্রস্তুত না করেই উপরে পাকা কাজ করার চেষ্টা চলছে। এসব ত্রুটি সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলীর তদারকির অভাব ও দায়িত্বে অবহেলার ফল। একজন নির্বাহী প্রকৌশলী যদি নিয়মিত সাইট পরিদর্শন করতেন এবং সিডিউল অনুযায়ী কাজ নিশ্চিত করতেন, তাহলে এমন অনিয়ম কখনোই সম্ভব হতো না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এডিবির মতো আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে এমন অব্যবস্থাপনা দেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। দাতা সংস্থার অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায় শুধু ঠিকাদারের নয়, বরং ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খান। অথচ তার দপ্তর থেকে কোনো ব্যাখ্যা না আসায় প্রশ্ন উঠছে—তিনি কি ইচ্ছাকৃতভাবে অনিয়ম আড়াল করছেন, নাকি এসব কার্যক্রমের সঙ্গে নীরবে যুক্ত রয়েছেন?
সুশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি সাধারণত মাঠপর্যায়ে শুরু হলেও তা টিকে থাকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রশ্রয়ে। নির্বাহী প্রকৌশলী যদি কঠোর অবস্থান নিতেন, ঠিকাদার ও সাব-কন্ট্রাকটররা কখনোই নিম্নমানের ইট ব্যবহার বা সিডিউল লঙ্ঘনের সাহস পেত না। বরং এখানে দেখা যাচ্ছে, ঠিকাদাররা প্রকাশ্যে দম্ভ দেখাচ্ছে, তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, আর প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নির্বিকার।
৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা মনে করছেন, এই প্রকল্পের অনিয়মের মূল কেন্দ্রবিন্দু নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খান। তার দায়িত্বে অবহেলা ও জবাবদিহির ঘাটতির কারণেই কোটি কোটি টাকার সরকারি ও বিদেশি অর্থ অপচয়ের মুখে পড়েছে। তারা অবিলম্বে এই প্রকল্পের কাজ স্থগিত করে স্বাধীন তদন্ত, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর ল্যাব টেস্ট এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সকল আর্থিক লেনদেনের অডিট দাবি করেছেন।
জনস্বার্থে কাজ করা একজন সরকারি প্রকৌশলীর কাছ থেকে যে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব প্রত্যাশিত, এই প্রকল্পে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। তথ্য গোপন, সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া এবং অনিয়মের বিষয়ে নীরবতা—সব মিলিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খানের ভূমিকা গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। স্থানীয়দের মতে, এই দায়িত্বহীনতা কেবল একটি ওয়ার্ডের সমস্যা নয়; এটি পুরো ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অবিলম্বে নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খানের ভূমিকা তদন্তের আওতায় এনে তাকে প্রকল্প থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যথায়, উন্নয়ন কাজের নামে এমন নয়ছয় অব্যাহত থাকবে এবং সাধারণ জনগণই এর চরম মূল্য দেবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

এ-প্লাসের মরীচিকা বনাম প্রকৃত শিক্ষা: আমাদের মানসিকতার অবক্ষয়

ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে এডিবি অর্থায়নের উন্নয়ন কাজে ভয়াবহ অনিয়ম, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মফিজুর রহমান খানের দায়িত্বহীনতায় প্রকল্প প্রশ্নবিদ্ধ

আপডেট সময় ০২:২৩:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) উন্নয়ন কার্যক্রমে দুর্নীতি ও অনিয়ম যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে জবাবদিহি ও মাননিয়ন্ত্রণের চরম ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ ডিএসসিসির ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের নিমতলী নতুন রাস্তা কেরাম বোর্ডের গলিতে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়নে ড্রেন ও পাকা রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প। প্রায় ২ কোটি টাকা বরাদ্দের এই প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং সিডিউল না মেনে কাজ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের মূল দায়ভার গিয়ে পড়ছে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মফিজুর রহমান খানের ওপর, যিনি প্রকল্প বাস্তবায়ন, তদারকি ও মাননিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ দায়িত্বে রয়েছেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রকল্পের নির্ধারিত নকশা ও সিডিউল অনুসরণ না করেই ড্রেন নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রাস্তার দুই পাশের ড্রেন নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে ভাঙাচোরা, নিম্নমানের ইট, যা সরকারি নির্মাণ বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। সিমেন্টের পরিমাণ কম, বালির মান নিম্ন এবং গাঁথুনির কাজ অতি দুর্বল। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এভাবে কাজ চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যেই ড্রেন ধসে পড়বে এবং রাস্তা নষ্ট হয়ে যাবে। তাদের অভিযোগ, ঠিকাদাররা ইচ্ছাকৃতভাবে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে লাভের অঙ্ক বাড়াচ্ছে, আর এসব অনিয়ম দেখেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা নীরব ভূমিকা পালন করছেন।
এই প্রকল্পে দায়িত্বরত সাব-কন্ট্রাকটর লিটনের বক্তব্য আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে চাইলে তিনি তা বলতে অস্বীকৃতি জানান। বরং তিনি প্রকাশ্যে বলেন, “দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১২টি টেবিল শেষ করে আমাদের কাজ করতে হয়।” এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের আগে ঘুষ ও অবৈধ লেনদেনের একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা চালু রয়েছে। আরও আশঙ্কাজনক হলো, তিনি প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে তার ভাই রয়েছে বলে দাবি করে এক ধরনের প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিত দেন। এমন বক্তব্য প্রকল্প বাস্তবায়নে ভয়ভীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত বহন করে, যা সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ব্যর্থতাকেই সামনে আনে।
প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ২ কোটি টাকা হলেও সাব-কন্ট্রাকটরের দাবি অনুযায়ী প্রায় ১ কোটি টাকার কাজ ইতোমধ্যে চলমান। অথচ প্রকল্পের ব্যয় বিবরণী, কাজের অগ্রগতি ও মান যাচাই সংক্রান্ত কোনো তথ্যই প্রকাশ করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বরত সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার মল্লিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, প্রকৌশলী স্যারের অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো তথ্য দিতে পারবেন না। এই বক্তব্যে পরিষ্কার হয় যে, নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খানই তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং প্রকল্প সংক্রান্ত স্বচ্ছতা বাধাগ্রস্ত করছেন।
সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, অনিয়মের বিষয়ে জানতে সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মফিজুর রহমান খানের কার্যালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। একজন দায়িত্বশীল প্রকৌশলীর এমন নীরবতা ও তথ্য গোপনের প্রবণতা কেবল সন্দেহই বাড়ায় না, বরং তাকে এই অনিয়মের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়ে অভিযুক্ত করে। কারণ, সরকারি বিধি অনুযায়ী নির্বাহী প্রকৌশলীই প্রকল্পের সর্বশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, যিনি কাজের মান, উপকরণ, সময়সূচি ও অর্থ ব্যয়ের ওপর সরাসরি নজরদারি করবেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রকল্পে অনিয়ম নতুন কিছু নয়। ড্রেনের গভীরতা ও প্রস্থ নকশা অনুযায়ী রাখা হয়নি, ঢাল ঠিক না থাকায় পানি নিষ্কাশনে সমস্যা দেখা দেবে, আর রাস্তার বেস প্রস্তুত না করেই উপরে পাকা কাজ করার চেষ্টা চলছে। এসব ত্রুটি সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলীর তদারকির অভাব ও দায়িত্বে অবহেলার ফল। একজন নির্বাহী প্রকৌশলী যদি নিয়মিত সাইট পরিদর্শন করতেন এবং সিডিউল অনুযায়ী কাজ নিশ্চিত করতেন, তাহলে এমন অনিয়ম কখনোই সম্ভব হতো না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এডিবির মতো আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে এমন অব্যবস্থাপনা দেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। দাতা সংস্থার অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায় শুধু ঠিকাদারের নয়, বরং ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খান। অথচ তার দপ্তর থেকে কোনো ব্যাখ্যা না আসায় প্রশ্ন উঠছে—তিনি কি ইচ্ছাকৃতভাবে অনিয়ম আড়াল করছেন, নাকি এসব কার্যক্রমের সঙ্গে নীরবে যুক্ত রয়েছেন?
সুশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি সাধারণত মাঠপর্যায়ে শুরু হলেও তা টিকে থাকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রশ্রয়ে। নির্বাহী প্রকৌশলী যদি কঠোর অবস্থান নিতেন, ঠিকাদার ও সাব-কন্ট্রাকটররা কখনোই নিম্নমানের ইট ব্যবহার বা সিডিউল লঙ্ঘনের সাহস পেত না। বরং এখানে দেখা যাচ্ছে, ঠিকাদাররা প্রকাশ্যে দম্ভ দেখাচ্ছে, তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, আর প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নির্বিকার।
৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা মনে করছেন, এই প্রকল্পের অনিয়মের মূল কেন্দ্রবিন্দু নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খান। তার দায়িত্বে অবহেলা ও জবাবদিহির ঘাটতির কারণেই কোটি কোটি টাকার সরকারি ও বিদেশি অর্থ অপচয়ের মুখে পড়েছে। তারা অবিলম্বে এই প্রকল্পের কাজ স্থগিত করে স্বাধীন তদন্ত, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর ল্যাব টেস্ট এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সকল আর্থিক লেনদেনের অডিট দাবি করেছেন।
জনস্বার্থে কাজ করা একজন সরকারি প্রকৌশলীর কাছ থেকে যে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব প্রত্যাশিত, এই প্রকল্পে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। তথ্য গোপন, সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া এবং অনিয়মের বিষয়ে নীরবতা—সব মিলিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খানের ভূমিকা গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। স্থানীয়দের মতে, এই দায়িত্বহীনতা কেবল একটি ওয়ার্ডের সমস্যা নয়; এটি পুরো ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অবিলম্বে নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খানের ভূমিকা তদন্তের আওতায় এনে তাকে প্রকল্প থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যথায়, উন্নয়ন কাজের নামে এমন নয়ছয় অব্যাহত থাকবে এবং সাধারণ জনগণই এর চরম মূল্য দেবে।