সিআইডি কর্মকর্তা জিয়ার অবৈধ সাম্রাজ্য: মিরপুরে একাধিক ভবন, ভালুকায় বিঘা বিঘা জমি ও গ্রামে আলিশান ডুপ্লেক্স
বাংলাদেশ পুলিশে সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে যোগ দিয়ে দীর্ঘ ৩৩ বছরের কর্মজীবনে ২০২১ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে উন্নীত হন মো. জিয়াউর রহমান। এই সুদীর্ঘ সময়ে সরকারি বেতন-ভাতা বাবদ তিনি আয় করেছেন আনুমানিক ৪৮ লাখ টাকা। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই পুলিশ কর্মকর্তার ও তার স্ত্রীর নামে থাকা সম্পদের পরিমাণ অন্তত শতকোটি টাকা। আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন এই বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক বর্তমানে সিআইডির ঢাকা মেট্রো শাখায় কর্মরত।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর মিরপুর ও ময়মনসিংহের ভালুকায় গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এই সম্পদ আড়াল করতে তিনি আয়কর নথিতে নজিরবিহীন জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন।
মিরপুরে আলিশান ভবন ও বাণিজ্যিক টাওয়ার: রাজধানীর মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডের ডি-ব্লকের ২ নম্বর সেকশনের ৭৪ নম্বর প্লটে প্রায় ৫ কাঠা জমির ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সাড়ে নয় তলাবিশিষ্ট ‘জাওয়াদ টাওয়ার’। ২০১৫-১৬ সালে নির্মিত এই বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনটির মালিক এএসপি জিয়াউর রহমান। প্রতিটি ফ্লোর প্রায় ২২০০ বর্গফুট আয়তনের। ভবনটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪০ কোটি টাকা হলেও আয়কর নথিতে তিনি এর নির্মাণব্যয় দেখিয়েছেন মাত্র ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
এর অদূরেই মিরপুর ২ নম্বর সেকশনের জি-ব্লকের ৩/২০ প্লটে স্ত্রীর নামে রয়েছে সাড়ে ৬ তলা আরেকটি ভবন। জমিসহ যার বাজারমূল্য ৫ কোটি টাকার বেশি হলেও কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে মাত্র ২ কোটি ১ লাখ টাকা।
স্ত্রীকে ‘সাফল্যমণ্ডিত’ ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবী সাজানোর অপচেষ্টা: অবৈধ সম্পদ বৈধ করতে জিয়াউর রহমান তার গৃহিণী স্ত্রী জেসমিন নাহার সঞ্চিতাকে কাগজে-কলমে বড় ব্যবসায়ী ও উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী হিসেবে দেখিয়েছেন। আয়কর নথিতে দাবি করা হয়েছে, তার স্ত্রী ২০১২ সাল থেকে মিরপুরের ‘দারুল হিকমাহ মডেল স্কুল’-এর ভাইস প্রিন্সিপাল। তবে সরেজমিনে ওই স্কুলের প্রিন্সিপাল আব্দুস সবুর জানান, তাদের স্কুলে ভাইস প্রিন্সিপাল বা কো-অর্ডিনেটর পদে কখনোই কেউ ছিলেন না।
একইভাবে, চিড়িয়াখানা রোডের ভবনের ঠিকানায় ‘নাহার বুটিক হাউজ’ নামে স্ত্রীর ব্যবসার কথা উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ভবনের নিরাপত্তকর্মী ও স্থানীয়রা নিশ্চিত করেছেন, এই নামে সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। এমনকি স্ত্রীর আয়কর রিটার্নের ঘোষণাপত্রে স্ত্রীর স্বাক্ষরের বদলে জিয়াউর রহমান নিজেই স্বাক্ষর করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভালুকায় বিঘা বিঘা জমি ও জবরদখলের অভিযোগ: শিল্পনগরী ভালুকার হবিরবাড়ি ও পাড়াগাঁও মৌজায় এএসপি জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের ভয় দেখিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের জমি নামমাত্র মূল্যে লিখে নিয়েছেন।
২০১০ ও ২০১৩ সালে সম্পাদিত একাধিক দলিলে (দলিল নং- ১০৫২৫, ১১৪২৪, ৫৪৯০, ৫৪৯১) তার স্ত্রী ও অন্যদের নামে শত শত শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। এর মধ্যে পাড়াগাঁও মৌজায় প্রায় ১০ বিঘা জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল কলাবাগান। অভিযোগ রয়েছে, পাড়াগাঁওয়ের বৃদ্ধ আবুল হাশেমকে জিম্মি করে এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে জোরপূর্বক জমি লিখে নেন জিয়াউর রহমান। আবুল হাশেমের ছেলে আমিনুল ইসলাম জানান, তার বাবাকে লাথি মেরে চেয়ার থেকে ফেলে দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল।
গফরগাঁওয়ে রহস্যময় ‘সঞ্চিতা মহল’: নিজ গ্রাম ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের বাইলনায় স্ত্রী সঞ্চিতার নামে ২২ শতাংশ জমির ওপর নির্মাণ করেছেন রাজকীয় ডুপ্লেক্স বাড়ি ‘সঞ্চিতা মহল’। স্থানীয়রা বাড়িটিকে এরশাদ শিকদারের ‘স্বর্ণকমল’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত এই বাড়িতে প্রায়ই ঢাকা থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যাতায়াত করেন। এছাড়া বাড়ির পাশে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স নির্মাণ করেছেন তিনি। এলাকাবাসীর মতে, নিজেকে সমাজসেবক প্রমাণ করতেই পুলিশের প্রভাব খাটিয়ে তিনি জোরপূর্বক নিজেকে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দাবি করেন।
অন্যের নামে গাড়ি ও বেনামি ব্যবসা: ২০১৩ সাল থেকে জিয়াউর রহমান ও তার পরিবার ঢাকা মেট্রো গ ৩৫-৩৫৩৫ নম্বরের একটি টয়োটা প্রিমিও গাড়ি ব্যবহার করছেন। অথচ গাড়িটি ফেরদৌস আহমেদ বাদল নামক এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত। আয়কর নথিতে এই গাড়ির কোনো উল্লেখ নেই। জানা যায়, এই বাদলের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের বেনামে একাধিক ব্যবসা ও খামার রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এএসপি মো. জিয়াউর রহমান জানান, ভবন নির্মাণের জন্য তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন এবং গ্রামের বাড়ি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে স্থানীয়দের দান ও সহায়তা ছিল। স্ত্রীর ভুয়া চাকরি ও ব্যবসার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। গাড়ির মালিকানা এবং আয়ের উৎসের গরমিল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “ভাই, আপনার সঙ্গে সরাসরি দেখা করব।”
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























