৫ আগস্টের ছাত্র–জনতার প্রতিরোধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের দেশত্যাগের পরও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)–এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বিতর্ক থামেনি। অভিযোগ উঠেছে, সিএনএস (কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেমস লিমিটেড)–এর সিস্টেম ম্যানেজার মো. মতিউর রহমান এখনো বহাল তবিয়তে থেকে দাপটের সঙ্গে অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর প্রভাবের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন সিএনএসে কর্মরত বহু কর্মকর্তা–কর্মচারী।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নিকটাত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে মো. মতিউর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বিআরটিএর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানামুখী অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এ পরিচয়ের কারণে অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাননি কেউ। সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি একই প্রভাব বজায় রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৩ বছর ধরে বিআরটিএ তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক যেসব সেবা নিতে দরপত্র আহ্বান করেছে, তার প্রায় সবই পেয়েছে সিএনএস। সর্বশেষ ২০২১ সালে মোটরযানের কর ও ফি আদায়ের কাজও প্রতিষ্ঠানটি পায়। অভিযোগ আছে, প্রতিটি দরপত্রে এমন শর্ত সংযোজন করা হয়, যাতে সিএনএস ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে যানবাহনের মালিক ও চালকদের চড়া দামে সেবা নিতে হচ্ছে।
এ অভিযোগে বিআরটিএর সাবেক পরিচালক (অপারেশন) লোকমান হোসেন মোল্লার ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সিএনএসের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে সদর কার্যালয়ে কর্মরত মো. মতিউর রহমান তাঁর ছত্রছায়ায় থেকেই নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, সিএনএস আর্কাইভ প্রকল্পে চাকরি দিতে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। এ লেনদেনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সিএনএসের কর্মচারী মোশারফ হোসেনের নাম এসেছে। সর্বশেষ দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে ইমদাদ হোসেনকে আর্কাইভে নিয়োগ দেওয়ার তথ্যও রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিএ–আইএস প্রকল্পে কর্মরতদের বেতন ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া হলেও তাদের এটিএম কার্ড প্রধান সমন্বয়কারীর কাছে রাখা হতো। সেখান থেকে বেতন তুলে নেওয়ার পাশাপাশি সার্কেলভেদে মাসে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা করে ঘুষ আদায় করা হতো। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হতো।
বদলির ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা মেট্রো–৪ সার্কেলের মাধ্যমে এক সার্কেল থেকে অন্য সার্কেলে বদলির জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। স্ক্যানিং শাখা ও অন্যান্য প্রকল্পে নিয়োগের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য রয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, কয়েক বছরে মো. মতিউর রহমানের নামে–বেনামে ৫–৬ কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে খিলক্ষেত, দক্ষিণ খান ও আশুলিয়ায় প্লট ও বাড়ির তথ্য রয়েছে। এছাড়া ২০২৩ সালে একাধিকবার উল্লেখযোগ্য অঙ্কের স্বর্ণ কেনার তথ্যও উঠে এসেছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে মো. মতিউর রহমান বলেন, তাঁর বাবা–মা জমিদার বংশের এবং তিনি পূর্বপুরুষের সম্পদ বিক্রি করেই জমি–জায়গা কিনেছেন। তাঁর ভাষ্য, বড় দায়িত্বে থাকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতেই পারে, তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নেই। স্বর্ণ কেনার বিষয়েও তিনি অজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিআরটিএ–আইএস ও আর্কাইভ প্রকল্পে কর্মরত একাধিক কর্মচারীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মাসোয়ারা নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও চাকরি হারানোর ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। অভিযোগ রয়েছে, মাসোয়ারা জোগাতে গিয়ে কিছু কর্মচারী নিজেদের বিআরটিএর স্টাফ পরিচয় দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অবৈধ অর্থ আদায় করছে, যার দায়ভার পড়ছে সংস্থাটির ওপর।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১০ সাল থেকে মোটরযানের কর ও ফি আদায়ের কাজ করে সিএনএস। প্রথম পাঁচ বছরে তারা নিয়েছে ৭৮ কোটি টাকা, পরের পাঁচ বছরে ১৮৪ কোটি টাকা এবং আগামী পাঁচ বছরের জন্য ২১৮ কোটি টাকার চুক্তি রয়েছে। সব মিলিয়ে গত ১৩ বছরে বিআরটিএ থেকে সিএনএসের ব্যবসার পরিমাণ প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা। চালকের স্মার্ট কার্ড লাইসেন্সসহ অন্যান্য প্রকল্প মিলিয়ে অঙ্ক আরও বেড়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহি দাবি করেছেন সিএনএসের ভুক্তভোগী কর্মচারী ও সেবাগ্রহীতারা।
মাহমুদুল হাসান 























