পটুয়াখালী দুমকি উপজেলার লেবুখালী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা যাদব কুমার দও’র হাতে জিম্মি ইউপি সদস্য সহ সাধারণ জনগণ।
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা সমিতির সাবেক সভাপতি, যাদব কুমার দও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়মনিতির তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছে স্বাধীন মতো করছেন সব কিছু। তিনি বর্তমানে লেবুখালী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত আইন অনুযায়ী জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের তালিকায় নির্দিষ্ট মূল্য দেওয়া থাকলেও কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে নিজস্ব আইনে ২৫০ (দুইশত পঞ্চাশ টাকা) করে নিয়ে থাকেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় লেবুখালী ইউনিয়ন পরিষদে দায়িত্বে থাকা কম্পিউটার অপারেটর (উদ্যোক্তা) মোঃ মামুন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন বাবদ ২৫০ টাকা নিলে, সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান সচিব যাদব কুমার দও তাঁকে নিতে বলেছেন, যার ১৫০ টাকা সচিব নিজে নেয়, এবং ১০০টাকা তাঁকে পারিশ্রমিক দেয়া হয়। যেখানে সারকারি নিয়ম অনুযায়ী জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন বাবদ সরকার নির্ধারিত ফি ৫০ টাকা, অনলাইন বাবদ আরও ৫০টাকা থাকলেও অতিরিক্ত আরো নেয়া হচ্ছে ১৫০ টাকা।
এসময় স্থানীয় এক নারী ভুক্তভোগী জানায় তাঁরা স্ব- পরিবারে ঢাকায় বসবাস করায় বিগত দিনে তাঁর নাতির জন্ম-নিবন্ধন করা হয়নি, এখন গ্রামে এসে তার নাতিকে স্কুলে ভর্তি করাতে গেলে জন্ম নিবন্ধন প্রয়োজন হওয়ায় তিনি ইউনিয়ন পরিষদে গেলে,নাতির বাবা
ও মায়ের জন্মনিবন্ধন অনলাইন করা না থাকায় ৩ জনের সর্বমোট ৭৫০টাকা দিয়ে তাদের কাজ করতে হয়। তার বাড়ি লেবুখালী ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডে যা পরিষদ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দুরত্বে, তবুও গরিব মানুষ হওয়ায় পায়ে হেটে ৩/৪ দিন পরিষদে এসে কাজ সমাধান করতে হয়েছে।
এসময় স্থানীয় ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ ইউনুস ফরাজি উপস্থিত থাকায় তার কাছে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে, তিনি বলেন সচিব যাদব কুমার দও ২৫০টাকা করে নেয়,যার কোন রিসিভ কপি নেই, এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের ট্যাক্স, ট্রেড-লাইসেন্স সহ কোনো আয়-ব্যয়ের হিসাব তিনি কাউকে দেয়না এবং উক্ত পরিষদের মাসিক কোনো রেজুলেশন নেই বলে জানিয়েছেন এই ইউপি সদস্য। এবিষয়ে সাবেক দুমকী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (আবুজর মোঃ ইজাজুল হক) বরাবর মোঃ ইউনুস ফরাজি লিখিত অভিযোগ দিলে, তদন্তভার দেয়া হয় উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা সৈয়দ ফারুক হোসেনকে, যার সময়সিমা দীর্ঘ ১ বছরের বেশি সময় পার হলে ও এখনো কোনো তদন্ত রিপোর্ট জমা দেননি উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা,যা নিয়ম অনুযায়ী ৩ মাসের মধ্যে রিপোর্ট প্রধান বাধ্যতামূলক।
ইউপি সদস্য ইউনুস ফরাজির কাছে বিভিন্ন রাজস্ব তহবিলের বাজেট ও কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন,উন্নয়ন তহবিল, রেজিষ্ট্রি অফিস কতৃক ১℅,অতিরিক্ত বরাদ্দ, মাতৃত্ব কালীন ভাতা সহ সকল হিসাব চেয়ারম্যান ও সচিবের কাছে, তবে তার কোনো রেজুলেশন করে না, এমনকি ২০২৫ সালে ইউপি সদস্যদের ১ মাসের সম্মানি ভাতা দিয়ে আর দেওয়া হয়নি বলে এই ইউপি সদস্য।
এলাকাবাসী জানায় ইউপি নির্বাচন, বিগত ফেসিষ্টের শাসন আমলে হওয়ায় বেশির ভাগ ইউপি সদস্য আওয়ামী পন্থী রাজনীতির সাথে জরিত থাকায়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা যাদব কুমার দও তাদের জিম্মি করে নিজের রাজত্ব চালায়।
ইউপি সদস্যর কাছে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর জমাকৃত অভিযোগ পত্রের কপি চাইলে- তিনি সাংবাদিকদেরকে ১টি কপি দিয়ে থাকেন।আবেদনে ইউপি সদস্যরা উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক কর্মকর্তা যাদব কুমার দও ইউনিয়ন পরিষদের মাসিক সভা ও নির্বাচিত সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে একক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করে আসছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে,তিনি নিয়মিত অফিস করেন না,অফিস সময়ে ইউনিয়ন পরিষদে অনুপস্থিত থেকে তিনি ব্যক্তিগত ব্যবসা ও নিজের কাজে অধিক সময় ব্যয় করছেন। ফলে ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে আসা সাধারণ জনগণ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
ইউপি সদস্যদের লিখিত অভিযোগে দেখা যায় তিনি ভিজিডি কার্ড প্রদানের নামে অসহায় নারী ও দরিদ্র জনগণের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ,জন্মনিবন্ধন সনদ প্রদান ও সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত অর্থ আদায় সহ মাতৃত্বকালীন ভাতা ও অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির নামে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব খাতের অর্থের সঠিক হিসাব প্রদান না করা এবং আর্থিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় না রাখার অভিযোগ করে, নিয়মিত মাসিক সভা আহ্বান না করে,পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সকল বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহ নির্বাচিত ইউপি সদস্যদের অবমূল্যায়ন ও মতামত উপেক্ষা করার কথাও আবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও সদস্যদের না জানিয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কমিটিতে নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
আবেদনে তাঁরা প্রশাসনিক কর্মকর্তার এই সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ন্যায়বিচার,স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রশাসনিক কর্মকর্তা যাদব কুমারের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে তাকে দ্রুত লেবুখালী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অপসারণসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জোর দাবি জানান তাঁরা।
অভিযোগের ভিত্তিতে সাবেক দুমকী উপজেলা প্রশাসন তদন্ত ভার দেয়, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা সৈয়দ ফারুক হোসেনের কাছে- সাংবাদিকরা তার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান,
এই বিষয়ে একটি তদন্ত হয়েছিল,তখন সচিব ও মেম্বারকে ইউওনো অফিসে ডাকা হয়েছে,তখন মেম্বার সাহেব বলছে সচিবের কাছে কিছু টাকা জমা রয়েছে সেগুলো ইউনিয়ন পরিষদের একাউন্টে জমা দিলে আর কোনো সমস্যা নাই, পরবর্তীতে কিছু টাকা পরিষদের একাউন্টে জমা দেয়া হয়েছে, মেম্বার সাহেব বলেছেন আর কোনো সমস্যা নেই।
সাংবাদিকরা অভিযোগ পত্র সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইলে- তিনি না জানার অযুহাতে বলেন সচিব তার টাকা পরিষদে জমা দিয়ে দিবেন, মেম্বার সাহেব তার অভিযোগ উঠিয়ে নিবেন বলে দায়সারা বক্তব্য প্রধান করেন।
পুনরায় তদন্ত রিপোর্টের বিষয়ে ইউপি সদস্য ইউনুস ফরাজি বলেন এই বিষয়ে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার সাথে তাঁর কোনো কথা হয়নি। যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ফারুক হোসেন সচিবের সাথে কথা বলে ও মাঝে মাঝে এসে দেখা করে চলে যায়। কারো সাথে কোনো আলোচনা করেননি তিনি। এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা: ফরিদা সুলতানাকে অফিসে না পেয়ে মুঠো ফোনে কল করলে তিনি জানান পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের হলরুমে জরুরি মিটিংয়ে রয়েছেন, সাংবাদিকরা, যাদব কুমারের বিরুদ্ধে ইউপি সদস্যদের আনিত অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, দুমকী উপজেলা প্রশাসন হিসাবে তিনি সদ্য যোগদান করায় বিষয়টি অবগত না,তবে ইউপি সদস্যদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে জেলা প্রশাসক স্যারের নির্দেশক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্টাফ রিপোর্টার 























