দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়িত টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। তবে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলায় এসব প্রকল্প ঘিরে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, তাতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মিশকাতুর রহমান। বরাদ্দ, অনুমোদন, খাদ্যশস্য উত্তোলন থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কাজের মান—প্রায় প্রতিটি ধাপেই অনিয়মের অভিযোগে তার নাম জড়িয়েছে বলে দাবি করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, টিআর–কাবিখা–কাবিটা প্রকল্পের লক্ষ্য হলো গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দুর্যোগঝুঁকি কমানো। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন, ইউপি চেয়ারম্যান–সদস্য ও প্রকল্প সভাপতিদের যৌথ দায়িত্ব থাকে। জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নিয়ে ইউএনও ও পিআইওর স্বাক্ষরে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগোয়। কিন্তু সোনাইমুড়ীতে বাস্তব চিত্র এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সোনাইমুড়ী উপজেলায় টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চাল ও গমের বাজারমূল্যসহ প্রায় ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বিপুল বরাদ্দের একটি বড় অংশ প্রকৃত কাজের পরিবর্তে কমিশন, ভাগবাঁটোয়ারা ও নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে অপচয় হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতিটি প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে গড়ে প্রায় ১৭ শতাংশ কমিশন আদায় করা হয়েছে, যা না দিলে প্রকল্প অনুমোদন কিংবা খাদ্যশস্য উত্তোলনের ফাইলে স্বাক্ষর পাওয়া যেত না।
একাধিক প্রকল্প সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর তা অনুমোদনের প্রতিটি ধাপে অনানুষ্ঠানিক অর্থের দাবি ছিল। কমিশনের হার নির্ধারিত থাকলেও প্রকল্পের ধরন ও বরাদ্দের পরিমাণ অনুযায়ী কখনো কখনো তা বাড়ত। তাদের দাবি, এসব অর্থ মূলত পিআইওকে কেন্দ্র করেই সংগ্রহ করা হতো এবং তিনি না চাইলে কোনো ফাইলই এগোত না।
অভিযোগ রয়েছে, কমিশন আদায়ের পাশাপাশি নামে–বেনামে প্রকল্প অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প সভাপতি হিসেবে যাদের নাম দেখানো হয়েছে, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তারা কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কোথাও কোথাও আত্মীয়স্বজন কিংবা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠদের নাম ব্যবহার করে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ভেঙে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নে কাবিখা ও টিআর প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা অনেক প্রকল্প সভাপতি, ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই বরাদ্দকৃত খাদ্যশস্য উত্তোলন করেছেন। কাজের তদারকি ছাড়াই খাদ্যশস্য উত্তোলনের ফাইলে পিআইও স্বাক্ষর করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে কি না, মাঠে আদৌ কোনো কাজ হয়েছে কি না—এসব যাচাই না করেই ফাইল ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
কাবিখা কর্মসূচির বাস্তবায়ন নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে শ্রমিক নিয়োগ, উপস্থিতি রেজিস্টার সংরক্ষণ, কাজের অগ্রগতি যাচাই ও মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু সোনাইমুড়ীর অধিকাংশ প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগের কোনো প্রমাণ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, যেসব প্রকল্পের নামে চাল–গম উত্তোলন করা হয়েছে, সেখানে শ্রমিক তো দূরের কথা, অনেক সময় প্রকল্প এলাকাতেই কোনো কাজ হয়নি।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের কাবিখা কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে ২৮ মেট্রিক টন চাল ও ২৮ মেট্রিক টন গম এবং দ্বিতীয় পর্যায়েও একই পরিমাণ খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দকৃত খাদ্যশস্য খোলা বাজারে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি মেট্রিক টনে প্রায় ১০ হাজার টাকা কম দামে বিক্রি করা হয়েছে। এতে একদিকে সরকারি সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে দরিদ্র শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য কাজ ও খাদ্যশস্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
সরেজমিনে একাধিক প্রকল্প এলাকায় গিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের। জয়াগ ইউনিয়নের জৈনুদপুর কলিমুদ্দিন মুন্সিবাড়ি থেকে ইমাম উদ্দিন ব্যাপারীবাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সলিং ও মাটি ভরাট প্রকল্পে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ থাকলেও কাজের মান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের ইট ও অপ্রতুল উপকরণ ব্যবহার করে দায়সারা কাজ করা হয়েছে, যা কয়েক মাসের মধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে।
নদনা ইউনিয়নের দক্ষিণ শাকতলা রওশন আলী হাজি বাড়ির পুকুরপাড়ে মাটি ভরাট ও গাইড ওয়াল নির্মাণ প্রকল্পে ৬ মেট্রিক টন বরাদ্দ থাকলেও প্রকল্প এলাকায় উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ। স্থানীয়রা জানান, প্রকল্পের নামে বরাদ্দ তুলে পাশের একটি খালে নামমাত্র গাইড ওয়াল নির্মাণ করে দায় সারা হয়েছে। এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে।
আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কেরানিবাড়ি রাস্তা মাটি ভরাট ও সিসিকরণ প্রকল্পে ৩ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ থাকলেও পূর্ণাঙ্গ কাজ না করেই অর্থ ও খাদ্যশস্য উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, প্রকল্পের কাগজে কাজ শেষ দেখানো হলেও বাস্তবে রাস্তার একটি অংশও সঠিকভাবে সংস্কার হয়নি।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তারা বলছেন, টিআর–কাবিখা প্রকল্প দরিদ্র মানুষের জন্য হলেও বাস্তবে তা কিছু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্তরা যদি এভাবে কমিশন ও ভাগবাঁটোয়ারায় ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির লক্ষ্য কীভাবে পূরণ হবে—এ প্রশ্ন তুলছেন তারা।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসরিন আক্তারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে জানা গেছে। তবে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ত্রাণ–১) মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেন বলেন, পিআইও মিশকাতুর রহমানের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক তদন্ত ও প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। তিনি জানান, অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিশকাতুর রহমান বলেন, তার বিরুদ্ধে বহু লেখালেখি হয়েছে এবং তিনি এসব বিষয়ে কিছু মনে করেন না। তার দাবি অনুযায়ী, বিষয়গুলো তিনি ঊর্ধ্বতন মহল পর্যন্ত ‘ম্যানেজ’ করে চলেন। তবে তার এই বক্তব্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সুশাসন ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে সচেতন মহল মনে করছে, টিআর–কাবিখা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ শুধু একজন কর্মকর্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাই তুলে ধরছে। তারা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি, স্বাধীন অডিট এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের দুর্নীতি বন্ধ হবে না।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং সত্য উদ্ঘাটিত হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত প্রকল্প যেন আর কারও কমিশন বাণিজ্যের হাতিয়ারে পরিণত না হয়—সে নিশ্চয়তা দেবে প্রশাসন।
আমাদের মাতৃভূমি প্রতিবেদক 



















