সাতক্ষীরা–খুলনা উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রবাহমান নদী কপোতাক্ষে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক জোয়ার–ভাটার তীব্রতা বাড়ায় খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের একাধিক গ্রাম নতুন করে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, চাষের জমি ও গুরুত্বপূর্ণ জনপথ।
গতকাল রাতে হঠাৎ নদীর দিকে শোনা যায় মাটির বড় বড় খণ্ড পানিতে পড়ার শব্দ। সেই শব্দে বেড়ীবাঁধের দিকে ছুটে যান খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের মাটিয়াভাঙ্গা গ্রামের মানুষ। কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রায় ২০০ মিটার বাঁধ নদীতে মিলিয়ে যায়। আতঙ্কে চারদিকে ছোটাছুটি শুরু হয়। মুহূর্তেই খবর ছড়িয়ে পড়ে—মাটিয়াভাঙ্গার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বাঁধ সংস্কার এবং নদী খননে অবহেলার কারণে এ অঞ্চলে ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের ধানচর, শামুকপোতা, কুতুবেরচর, গাবতলা ও খোলপেটুয়া পাড়ের বেশ কয়েকটি এলাকা ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম জানান,
“প্রতিদিনই নদী এগিয়ে আসছে। কয়েক দিনের মধ্যে তিনটি বাড়ি নদীতে চলে গেছে। আমরা রাতেও ঘুমাতে পারি না—কখন যে তলিয়ে যাই!
আজ শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) সকালে মাটিয়াভাঙ্গার বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহ তখনকার ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘চোখের সামনে দিয়ে বাঁধটা নদীতে চইলে গেল। মনে হচ্ছিল, আজই বুঝি সব শেষ, বাড়ি-ঘর সবকিছুই বুঝি তলাই যাবেনে।’
দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. দিদারুল আলম বলেন, সুন্দরবনঘেঁষা আড়পাঙ্গাসিয়া নদী ও কপোতাক্ষ নদের মোহনার পাশে থাকা এ বাঁধটিতে এক মাস আগেই ফাটল দেখা গিয়েছিল। বিষয়টি তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানালেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষায়, ‘অল্প কিছু বস্তা ডাম্পিং করে দায়সারা কাজ করা হয়েছিল তখন। তাই গতরাতে আগের ফাটলটা হঠাৎ বড় রূপ নিয়ে ধসে গেছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘পুনর্বাসন’ প্রকল্পের আওতায় কয়রা উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের দুটি পোল্ডারে (১৪/১ ও ১৩–১৪/২) প্রায় ১,২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। ৩২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধে উচ্চতা–প্রশস্ততা বৃদ্ধি, ঢাল সংরক্ষণ, নদীশাসন ও চরবনায়নের কাজ করা হচ্ছে। মাটিয়াভাঙ্গার ভাঙন এলাকাটিও এই প্রকল্পের অংশ।
পাউবো সাতক্ষীরা–২ বিভাগের উপ সহকারী প্রকৌশলী আলমগীর কবির বলেন, ‘কাজ চলমান অবস্থায়ই গতরাতে বাঁধটি ভেঙে গেছে। কংক্রিট ব্লক নির্মাণের সরঞ্জামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাতেই বিকল্প রিং বাঁধ দিয়ে পানি আটকাতে পারায় এলাকা প্লাবিত হয়নি। সকাল থেকে জোরেসোরে আমাদের বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে।’
তবে এলাকার বহু মানুষের অভিযোগ—কাজের ধীরগতি, অসমাপ্ত মাটি ভরাট, কোথাও সিসি ব্লক না দেওয়া, আবার কোথাও বালুর বস্তা ফেলার বাকি—এসব কারণে বহু স্থানে ধস বেড়েছে এবং তৈরি হয়েছে ভাঙনের ঝুঁকি। দক্ষিণ বেদকাশীর বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, ‘শুধু মাটিয়াভাঙ্গা না, এলাকার অনেক জায়গায় কাজ না করি ফেলাইয়ে রাখা হইছে। রাইতের বিপদ কাটিছে তবে আগামী বর্ষার আগে ঠিকমতো বাঁধের কাম শেষ না হলি বড় বিপদ হবেনে।’
পাউবো সাতক্ষীরা–২ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাশিদুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। তবে জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, বরাদ্দ বিলম্ব, বালু–মাটির সংকট এবং নদীর ভাটার সময়ের ওপর নির্ভর করতে হওয়ায় কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মাটিয়াভাঙ্গার রাতের ধস স্থানীয় মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করলেও দ্রুত রিং বাঁধ নির্মাণে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে। সকাল থেকে ভাঙা অংশে কাজ শুরু হয়েছে। এখন আর তেমন ঝুঁকি নেই।’
সাইফুল ইসলাম, (কয়র), খুলনা 





















