ঢাকা ১১:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

৩৬ টাকার নকল লিখেই কোটিপতি সাবরেজিস্ট্রি অফিসের নকলনবিশ আল-আমিন

প্রতি পৃষ্ঠা দলিল নকল করার জন্য পান মাত্র ৩৬ টাকা। কাজ করেন দৈনিক হাজিরাভিত্তিক মাস্টাররোল কর্মচারী হিসেবে। অথচ নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে বিপুল সম্পদের পাহাড়। আল-আমিন খান নামের এই ব্যক্তি গাজীপুরের কালীগঞ্জ সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একজন নকলনবিশ।

জমি কেনাবেচার দলিল, ব্যাংক হিসাব ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আয়কর রিটার্নে তার ঘোষিত আয় ও প্রকৃত আয়ের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল রয়েছে।
২০২১–২০২২ অর্থবছরের আয়কর রিটার্নে আল-আমিন খান নিজের পেশা উল্লেখ করেছেন চাকরি। সেখানে দেখানো হয়েছে, বছরে তার মূল বেতন ২ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা। বাড়িভাড়া বাবদ আয় ১ লাখ ২৪ হাজার ৭০০। চিকিৎসা ভাতা পান ১৪ হাজার ৯০০ টাকা। যাতায়াত ভাতা সাড়ে ১৪ হাজার টাকা। বোনাস পান ৪১ হাজার ৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে বেতন খাতে বছরে আয় দেখানো হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা। এর বাইরে ব্যবসা থেকে আয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা।

রিটার্নে বলা হয়েছে, স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ৪৩ লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের একটি বাড়ি। আসবাবপত্র ৫০ হাজার টাকার এবং ইলেকট্রনিক পণ্য ৮০ হাজার টাকার। কৃষিজমি ও গাড়ি নেই। নগদ ছিল ৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং ব্যাংকে জমা ছিল ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা।

অনুসন্ধানে অবশ্য উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। এতে দেখা যায়, আল-আমিন খানের আয়কর নথিতে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। ঘোষিত আয়ের তুলনায় তার জমি কেনা, ব্যাংক হিসাবে জমা টাকা এবং অন্যান্য সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিক রকমের বেশি।

কালীগঞ্জ উপজেলা সাবরেজিস্ট্রার জাহিদুর রহমান বলেন, আল-আমিন আয়কর রিটার্নে কী উল্লেখ করেছেন তা আমার জানা নেই। তবে তার কোনো চাকরি, বেতন, যাতায়াত, চিকিৎসা ভাতা বা বোনাস নেই। নকলনবিশরা মাস্টাররোল কর্মচারী। রেজিস্ট্রিকৃত দলিল বালাম বইয়ে লিপিবদ্ধ করেন এবং দলিল থেকে দলিল নকল করেন। প্রতি পাতা দলিল লেখার জন্য ফি পান ৩৬ টাকা।

তিনি জানান, ২০২১-২২ সালে আল-আমিন নকল লেখা বাবদ সম্মানী পেয়েছেন ১৩ হাজার ১০৪ টাকা। ২০১৯ সালে পেয়েছেন ৪৮ হাজার ১১৬, ২০২০ সালে ৬৯ হাজার ৪৩২ এবং ২০২৪ সালে পেয়েছেন ৩৯ হাজার ২৪০ টাকা। কাজ না করায় ২০২৩ সালে তিনি কোনো সম্মানী পাননি।

পারিবারিক সূত্রে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে
আল-আমিন খান কালীগঞ্জ পৌর এলাকার মৃত কফিল উদ্দিন খানের ছেলে। পারিবারিক সূত্রে তিনি সাবরেজিস্ট্রি অফিসের সঙ্গে যুক্ত হন। জানা গেছে, তার ফুপু মিনারা বেগম ওই অফিসের অফিস সহকারী ছিলেন। তার হাত ধরে ১৯৯৬ সালে মাস্টাররোল কর্মচারী হিসেবে নকলনবিশ পদে কাজ শুরু করেন আল-আমিন।

২০০৯ সালে তার বড় বোন রায়হানা বেগম প্রথমে ওই অফিসে মোহরার এবং পরে অফিস সহকারী পদে যোগ দেন। স্থানীয়দের দাবি, এরপর থেকে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে তার প্রভাব বাড়তে থাকে।

সাত দলিলে আড়াই কোটি টাকার জমি
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সাতটি দলিলে প্রায় ২ কোটি ৪৬ লাখ ৫ হাজার টাকার জমি কিনেছেন আল-আমিন খান। কেনা হয়েছে তার ছোট ভাই রুহুল আমিনের সঙ্গে যৌথ মালিকানায়। মোট জমির পরিমাণ ২২৩ দশমিক ৫৯৫ শতাংশ, অর্থাৎ পৌনে সাত বিঘারও বেশি।

দলিল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাতটির মধ্যে পাঁচটি দলিলে জমির মূল্য সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দেখানো হয়েছে। এতে রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি, স্থানীয় সরকার কর, উৎস কর ও ভ্যাট বাবদ ১১ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।

২০১৪ সালের ৬ আগস্ট উপজেলার বোয়ালী মৌজার ২০৪ ও ৪০৫ দাগে ৩৫ শতাংশ জমি কেনেন আল-আমিন ও তার ভাই রুহুল আমিন। দলিলে ‘বর্ষা’ শ্রেণির ওই জমির মূল্য লেখা হয়েছে ১১ লাখ ১০ হাজার টাকা। কিন্তু ওই বছর একই শ্রেণির জমির প্রতি শতাংশের সরকারি মূল্য ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৮৪ টাকা। সেই হিসাবে ৩৫ শতাংশ জমির দাম হওয়ার কথা ছিল প্রায় ৪৬ লাখ ৯৯ হাজার ৯৪০ টাকা। এতে ওই দলিলেই প্রায় ৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে ২০১৫ সালের ১২৮ নম্বর দলিলে ৪৯ হাজার ৮৫০ টাকা, ২০১৬ সালের ৮৯৪১ নম্বর দলিলে ৯১ হাজার ১৫৮, ২০২২ সালের ১৪১৪৭ নম্বর দলিলে ৩ লাখ ৪ হাজার এবং ২০২৩ সালের ৩২৭২ নম্বর দলিলে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।

নিজের নামে এখনও বিপুল জমি
সম্প্রতি কয়েকটি জমি বিক্রি করেছেন আল-আমিন। তারপরও তার নিজের নামে বর্তমানে ১৮৩ দশমিক ০৭ শতাংশ জমি রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এসব জমির বাজারমূল্য আনুমানিক দেড় কোটির টাকারও বেশি।

কালীগঞ্জ উপজেলার বোয়ালী-২৯ মৌজার বিভিন্ন দাগে ৭০ শতাংশ, ৪১৭, ৪৭১ ও ৫৭২ দাগে ৪৫ শতাংশ, ৭৫ দাগে ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং ৪৭৮, ৫৬৫, ৫৬৭, ৫৮৭ ও ৬২৯ দাগে ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ জমি রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ ভাদার্ত্তী মৌজায় ২০১ দাগে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ১৬৮ দাগে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ জমি রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, রাজধানীর পূর্বাচলেও আল-আমিনের নামে-বেনামে একাধিক প্লট আছে। যদিও তার আয়কর নথিতে এমন কোনো তথ্যের উল্লেখ নেই।

ব্যাংক হিসাবে লেনদেন
অনুসন্ধানে আল-আমিনের ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। তার নামে পাঁচটি ব্যাংকে পাঁচটি হিসাব রয়েছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী এসব হিসাবে মোট জমা রয়েছে ২৫ লাখ ৪১ হাজার ৪৮৮ টাকা।

এর মধ্যে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে রয়েছে ৯ লাখ ৩৭ হাজার ৩১০ টাকা। পূবালী ব্যাংকে রয়েছে ১৪ লাখ ৬৩ হাজার ৩১৯ টাকা। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে রয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৮৬৩ টাকা। ডাচ-বাংলা ব্যাংকে রয়েছে ২৫ হাজার ৯৯৬ টাকা। এক্সিম ব্যাংকের হিসাবে কোনো টাকা নেই।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ
সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একাধিক নকলনবিশ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে ওই অফিসে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন আল-আমিন। জমি ক্রেতা-বিক্রেতা ও দলিল লেখকদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দলিল লেখক বলেন, শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের শেষের দিকে ক্ষমতায় আসার পর আল-আমিন সখ্যতা গড়ে তোলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির এপিএস সেলিম ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল গণি ভূঁইয়ার সঙ্গে। এরপর তিনি হয়ে ওঠেন ওই অফিসের অলিখিত বস। দিনে দিনে তিনি ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির এপিএস সেলিম ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল গণি ভূঁইয়ার সঙ্গে।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির এপিএস সেলিম ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল গণি ভূঁইয়ার সঙ্গে।

ওই দলিল লেখক জানান, আল-আমিন আগে বাস করতেন টিনের ঘরে। দিন বদলানোর পর সেটি ভেঙে কয়েক কোটি টাকায় গড়ে তোলেন আলিশান বিলাসবহুল তিনতলা বাড়ি। বাড়ির সব ফিটিংস দেশের বাইরে থেকে আনা। বাসা থেকে সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দূরত্ব এক কিলোমিটারের কম হলেও যাতায়াত করতেন ৬০ লাখ টাকায় কেনা প্রাইভেট কারে (ঢাকা মেট্রো-ঘ-২০-০৯২৬)।

বদলি হলেও অফিসে অনুপস্থিত
সাবরেজিস্ট্রি অফিসের এক কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগে আল-আমিনের বিরুদ্ধে কালীগঞ্জ থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা হয়। ওই ঘটনার পর গত মে মাসে তাকে কালিয়াকৈর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বদলি হলেও তিনি নিয়মিত অফিসে যান না।

কালিয়াকৈর সাবরেজিস্ট্রার অফিসের কর্মচারী ফরিদা বলেন, আমি এই অফিসে তার কিছুদিন পরে যোগদান করি। কিন্তু তাকে কখনো অফিসে আসতে দেখিনি। তিনি আসেন না।

অভিযোগ অস্বীকার আল-আমিনের
রাজস্ব ফাঁকি, আয়কর নথিতে তথ্য গোপনসহ বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আল-আমিন খান বলেন, মানুষ অনেক ধরনের শত্রুতা করে। হয়তো আমার বিরুদ্ধেও কেউ শত্রুতা করে এসব করছে। আপনারা তদন্ত করে বের করেন। আমি কোনো দুর্নীতি করিনি।

কালিয়াকৈর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে যোগ দেওয়ার পরও কেন সেখানে নিয়মিত যাচ্ছেন না? এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, অফিসসংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিবেদককে জানাতে তিনি রাজি নন।

প্রশাসনের বক্তব্য
গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান বলেন, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আমার অফিসের স্থায়ী কোনো সদস্য না। তার কাজ চুক্তিভিত্তিক। তার বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি৷ তবে মৌখিক ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানতে পেরে বদলি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সাবরেজিস্ট্রি অফিসের কাজ করতে গিয়ে আল-আমিন দুর্নীতি করেছেন—এমন প্রমাণসহ যদি কেউ লিখিত অভিযোগ দেন এবং তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হয়, তাহলে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

৩৬ টাকার নকল লিখেই কোটিপতি সাবরেজিস্ট্রি অফিসের নকলনবিশ আল-আমিন

আপডেট সময় ০৮:৩৭:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

প্রতি পৃষ্ঠা দলিল নকল করার জন্য পান মাত্র ৩৬ টাকা। কাজ করেন দৈনিক হাজিরাভিত্তিক মাস্টাররোল কর্মচারী হিসেবে। অথচ নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে বিপুল সম্পদের পাহাড়। আল-আমিন খান নামের এই ব্যক্তি গাজীপুরের কালীগঞ্জ সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একজন নকলনবিশ।

জমি কেনাবেচার দলিল, ব্যাংক হিসাব ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আয়কর রিটার্নে তার ঘোষিত আয় ও প্রকৃত আয়ের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল রয়েছে।
২০২১–২০২২ অর্থবছরের আয়কর রিটার্নে আল-আমিন খান নিজের পেশা উল্লেখ করেছেন চাকরি। সেখানে দেখানো হয়েছে, বছরে তার মূল বেতন ২ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা। বাড়িভাড়া বাবদ আয় ১ লাখ ২৪ হাজার ৭০০। চিকিৎসা ভাতা পান ১৪ হাজার ৯০০ টাকা। যাতায়াত ভাতা সাড়ে ১৪ হাজার টাকা। বোনাস পান ৪১ হাজার ৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে বেতন খাতে বছরে আয় দেখানো হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা। এর বাইরে ব্যবসা থেকে আয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা।

রিটার্নে বলা হয়েছে, স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ৪৩ লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের একটি বাড়ি। আসবাবপত্র ৫০ হাজার টাকার এবং ইলেকট্রনিক পণ্য ৮০ হাজার টাকার। কৃষিজমি ও গাড়ি নেই। নগদ ছিল ৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং ব্যাংকে জমা ছিল ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা।

অনুসন্ধানে অবশ্য উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। এতে দেখা যায়, আল-আমিন খানের আয়কর নথিতে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। ঘোষিত আয়ের তুলনায় তার জমি কেনা, ব্যাংক হিসাবে জমা টাকা এবং অন্যান্য সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিক রকমের বেশি।

কালীগঞ্জ উপজেলা সাবরেজিস্ট্রার জাহিদুর রহমান বলেন, আল-আমিন আয়কর রিটার্নে কী উল্লেখ করেছেন তা আমার জানা নেই। তবে তার কোনো চাকরি, বেতন, যাতায়াত, চিকিৎসা ভাতা বা বোনাস নেই। নকলনবিশরা মাস্টাররোল কর্মচারী। রেজিস্ট্রিকৃত দলিল বালাম বইয়ে লিপিবদ্ধ করেন এবং দলিল থেকে দলিল নকল করেন। প্রতি পাতা দলিল লেখার জন্য ফি পান ৩৬ টাকা।

তিনি জানান, ২০২১-২২ সালে আল-আমিন নকল লেখা বাবদ সম্মানী পেয়েছেন ১৩ হাজার ১০৪ টাকা। ২০১৯ সালে পেয়েছেন ৪৮ হাজার ১১৬, ২০২০ সালে ৬৯ হাজার ৪৩২ এবং ২০২৪ সালে পেয়েছেন ৩৯ হাজার ২৪০ টাকা। কাজ না করায় ২০২৩ সালে তিনি কোনো সম্মানী পাননি।

পারিবারিক সূত্রে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে
আল-আমিন খান কালীগঞ্জ পৌর এলাকার মৃত কফিল উদ্দিন খানের ছেলে। পারিবারিক সূত্রে তিনি সাবরেজিস্ট্রি অফিসের সঙ্গে যুক্ত হন। জানা গেছে, তার ফুপু মিনারা বেগম ওই অফিসের অফিস সহকারী ছিলেন। তার হাত ধরে ১৯৯৬ সালে মাস্টাররোল কর্মচারী হিসেবে নকলনবিশ পদে কাজ শুরু করেন আল-আমিন।

২০০৯ সালে তার বড় বোন রায়হানা বেগম প্রথমে ওই অফিসে মোহরার এবং পরে অফিস সহকারী পদে যোগ দেন। স্থানীয়দের দাবি, এরপর থেকে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে তার প্রভাব বাড়তে থাকে।

সাত দলিলে আড়াই কোটি টাকার জমি
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সাতটি দলিলে প্রায় ২ কোটি ৪৬ লাখ ৫ হাজার টাকার জমি কিনেছেন আল-আমিন খান। কেনা হয়েছে তার ছোট ভাই রুহুল আমিনের সঙ্গে যৌথ মালিকানায়। মোট জমির পরিমাণ ২২৩ দশমিক ৫৯৫ শতাংশ, অর্থাৎ পৌনে সাত বিঘারও বেশি।

দলিল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাতটির মধ্যে পাঁচটি দলিলে জমির মূল্য সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দেখানো হয়েছে। এতে রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি, স্থানীয় সরকার কর, উৎস কর ও ভ্যাট বাবদ ১১ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।

২০১৪ সালের ৬ আগস্ট উপজেলার বোয়ালী মৌজার ২০৪ ও ৪০৫ দাগে ৩৫ শতাংশ জমি কেনেন আল-আমিন ও তার ভাই রুহুল আমিন। দলিলে ‘বর্ষা’ শ্রেণির ওই জমির মূল্য লেখা হয়েছে ১১ লাখ ১০ হাজার টাকা। কিন্তু ওই বছর একই শ্রেণির জমির প্রতি শতাংশের সরকারি মূল্য ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৮৪ টাকা। সেই হিসাবে ৩৫ শতাংশ জমির দাম হওয়ার কথা ছিল প্রায় ৪৬ লাখ ৯৯ হাজার ৯৪০ টাকা। এতে ওই দলিলেই প্রায় ৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে ২০১৫ সালের ১২৮ নম্বর দলিলে ৪৯ হাজার ৮৫০ টাকা, ২০১৬ সালের ৮৯৪১ নম্বর দলিলে ৯১ হাজার ১৫৮, ২০২২ সালের ১৪১৪৭ নম্বর দলিলে ৩ লাখ ৪ হাজার এবং ২০২৩ সালের ৩২৭২ নম্বর দলিলে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।

নিজের নামে এখনও বিপুল জমি
সম্প্রতি কয়েকটি জমি বিক্রি করেছেন আল-আমিন। তারপরও তার নিজের নামে বর্তমানে ১৮৩ দশমিক ০৭ শতাংশ জমি রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এসব জমির বাজারমূল্য আনুমানিক দেড় কোটির টাকারও বেশি।

কালীগঞ্জ উপজেলার বোয়ালী-২৯ মৌজার বিভিন্ন দাগে ৭০ শতাংশ, ৪১৭, ৪৭১ ও ৫৭২ দাগে ৪৫ শতাংশ, ৭৫ দাগে ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং ৪৭৮, ৫৬৫, ৫৬৭, ৫৮৭ ও ৬২৯ দাগে ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ জমি রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ ভাদার্ত্তী মৌজায় ২০১ দাগে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ১৬৮ দাগে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ জমি রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, রাজধানীর পূর্বাচলেও আল-আমিনের নামে-বেনামে একাধিক প্লট আছে। যদিও তার আয়কর নথিতে এমন কোনো তথ্যের উল্লেখ নেই।

ব্যাংক হিসাবে লেনদেন
অনুসন্ধানে আল-আমিনের ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। তার নামে পাঁচটি ব্যাংকে পাঁচটি হিসাব রয়েছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী এসব হিসাবে মোট জমা রয়েছে ২৫ লাখ ৪১ হাজার ৪৮৮ টাকা।

এর মধ্যে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে রয়েছে ৯ লাখ ৩৭ হাজার ৩১০ টাকা। পূবালী ব্যাংকে রয়েছে ১৪ লাখ ৬৩ হাজার ৩১৯ টাকা। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে রয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৮৬৩ টাকা। ডাচ-বাংলা ব্যাংকে রয়েছে ২৫ হাজার ৯৯৬ টাকা। এক্সিম ব্যাংকের হিসাবে কোনো টাকা নেই।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ
সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একাধিক নকলনবিশ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে ওই অফিসে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন আল-আমিন। জমি ক্রেতা-বিক্রেতা ও দলিল লেখকদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দলিল লেখক বলেন, শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের শেষের দিকে ক্ষমতায় আসার পর আল-আমিন সখ্যতা গড়ে তোলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির এপিএস সেলিম ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল গণি ভূঁইয়ার সঙ্গে। এরপর তিনি হয়ে ওঠেন ওই অফিসের অলিখিত বস। দিনে দিনে তিনি ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির এপিএস সেলিম ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল গণি ভূঁইয়ার সঙ্গে।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির এপিএস সেলিম ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল গণি ভূঁইয়ার সঙ্গে।

ওই দলিল লেখক জানান, আল-আমিন আগে বাস করতেন টিনের ঘরে। দিন বদলানোর পর সেটি ভেঙে কয়েক কোটি টাকায় গড়ে তোলেন আলিশান বিলাসবহুল তিনতলা বাড়ি। বাড়ির সব ফিটিংস দেশের বাইরে থেকে আনা। বাসা থেকে সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দূরত্ব এক কিলোমিটারের কম হলেও যাতায়াত করতেন ৬০ লাখ টাকায় কেনা প্রাইভেট কারে (ঢাকা মেট্রো-ঘ-২০-০৯২৬)।

বদলি হলেও অফিসে অনুপস্থিত
সাবরেজিস্ট্রি অফিসের এক কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগে আল-আমিনের বিরুদ্ধে কালীগঞ্জ থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা হয়। ওই ঘটনার পর গত মে মাসে তাকে কালিয়াকৈর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বদলি হলেও তিনি নিয়মিত অফিসে যান না।

কালিয়াকৈর সাবরেজিস্ট্রার অফিসের কর্মচারী ফরিদা বলেন, আমি এই অফিসে তার কিছুদিন পরে যোগদান করি। কিন্তু তাকে কখনো অফিসে আসতে দেখিনি। তিনি আসেন না।

অভিযোগ অস্বীকার আল-আমিনের
রাজস্ব ফাঁকি, আয়কর নথিতে তথ্য গোপনসহ বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আল-আমিন খান বলেন, মানুষ অনেক ধরনের শত্রুতা করে। হয়তো আমার বিরুদ্ধেও কেউ শত্রুতা করে এসব করছে। আপনারা তদন্ত করে বের করেন। আমি কোনো দুর্নীতি করিনি।

কালিয়াকৈর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে যোগ দেওয়ার পরও কেন সেখানে নিয়মিত যাচ্ছেন না? এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, অফিসসংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিবেদককে জানাতে তিনি রাজি নন।

প্রশাসনের বক্তব্য
গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান বলেন, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আমার অফিসের স্থায়ী কোনো সদস্য না। তার কাজ চুক্তিভিত্তিক। তার বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি৷ তবে মৌখিক ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানতে পেরে বদলি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সাবরেজিস্ট্রি অফিসের কাজ করতে গিয়ে আল-আমিন দুর্নীতি করেছেন—এমন প্রমাণসহ যদি কেউ লিখিত অভিযোগ দেন এবং তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হয়, তাহলে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।