ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, দপ্তরীয় অনিয়ম এবং ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ব্যবহারের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ শেষে কমিশনের এই পদক্ষেপ প্রশাসনের ভেতরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ নভেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। কমিশনের পরিচালক ঈশিতা রনি স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক চিঠিতে জানানো হয়, মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই শেষে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এ বিষয়ে দুদকের তদন্ত-১ শাখার মহাপরিচালককে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
দুদক সূত্রে জানা যায়, গত কিছুদিন ধরে প্রশাসকের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, উন্নয়ন প্রকল্পে সুবিধাবাদী সিদ্ধান্ত, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব, দপ্তরীয় পরিবর্তন এনে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়াসহ একাধিক অভিযোগ জমা পড়ছিল। এসব অভিযোগ প্রাথমিক যাচাই প্রক্রিয়ায় আংশিকভাবে সত্য প্রমাণিত হওয়ায় কমিশন দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়।
দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘আসা অভিযোগগুলো সাধারণ বা অস্পষ্ট ছিল না—বরং সুনির্দিষ্ট, প্রমাণযোগ্য এবং প্রত্যক্ষভাবে দুর্নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই কমিশন কোনোরকম দেরি না করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খুব শিগগিরই একজন অভিজ্ঞ অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে, যিনি নথিপত্র, দায়-দায়িত্ব, আর্থিক কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।’’
ডিএনসিসির ভেতর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দপ্তরের ভেতরে কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন নজরে আসে, যা আগে স্বাভাবিক ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ফাইল অস্বাভাবিক গতিতে অনুমোদিত হয়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগই দুদকের নজরে আসে।
ডিএনসিসির কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, কিছু প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ, সময়সীমা সম্প্রসারণ এবং বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রশাসক প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করতেন। এসব কাজে বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ভেতরের অনেকেই আপত্তি জানানোর সাহস পাননি। কারণ, তাদের মতে, ‘‘প্রশাসকের নির্দেশ অমান্য করলে নানা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হতো।’’
দুদকের অনুসন্ধান শুরুর খবর ডিএনসিসির কর্মীদের মাঝে বেশ আলোচনার সৃষ্টি করেছে। কেউ মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অভিযোগগুলো তদন্তের মুখোমুখি হওয়ায় সত্য উদঘাটনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আবার অন্যরা বলছেন, এই অনুসন্ধান ডিএনসিসির চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে। কারণ, প্রশাসকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালে কিছু প্রকল্পের অনুমোদন কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া শ্লথ হয়ে যেতে পারে।
এদিকে দুদক সূত্রে আরও জানা গেছে, প্রশাসক এজাজের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও। কিছু ঠিকাদার এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণের তথ্য এসেছে দুদকের হাতে। অভিযোগকারী পক্ষের দেওয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে—একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পে দরপত্র দাখিলের আগেই কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা করা হয়েছিল। এসব তথ্য যাচাই করতেই কমিশন গভীর অনুসন্ধানে নেমেছে।
প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ দায়িত্ব পান এই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি, অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের এক আদেশে। দায়িত্বের মেয়াদ ছিল এক বছর। কিন্তু মাত্র কয়েক মাস পার হতে না হতেই তার বিরুদ্ধে এত বড় অনুসন্ধান শুরু হওয়া প্রশাসনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একজন প্রশাসক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার পরও এত দ্রুত দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা অনেককেই বিস্মিত করেছে।
দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সামনে আরও গতি পাবে। প্রয়োজন হলে ডিএনসিসির নথি জব্দ, ডিজিটাল রেকর্ড পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অভিযোগের স্বপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রশাসকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও হতে পারে। তবে এ সম্পর্কিত কোনো সিদ্ধান্ত কেবল অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পরে নেওয়া হবে।
দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘‘আমরা কোনো ব্যক্তিগত প্রভাব বা রাজনৈতিক চাপে কাজ করি না। আইনের বিধান অনুযায়ী যে-ই হোক না কেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
অনুসন্ধানের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের অনেকেই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, তদন্ত চলমান অবস্থায় মন্তব্য করা অনুচিত। আবার কিছু কর্মকর্তা মনে করছেন, তদন্তের মধ্য দিয়ে প্রশাসকের দায়-দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, যা ভবিষ্যতে সিটি করপোরেশনের প্রশাসনকে আরও জবাবদিহিমূলক করবে।
তবে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়াকে অনেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ‘‘পদমর্যাদা যত বড়ই হোক, দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। এতে প্রশাসনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা পাবে।’’
দুদকের অনুসন্ধান শেষ হতে কত সময় লাগবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্ত যেন দীর্ঘায়িত না হয় সেদিকে দুদক নজর রাখবে।
অভিযোগের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ কিংবা ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে দুদকের এই অনুসন্ধান ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসন ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে যে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করবে—তা এখনই বলা যাচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 

























