বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারণের এক বিরাট পরীক্ষা। ২০২৬ সালের সম্ভাব্য দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা, সংশয়, কৌতূহল এবং উদ্বেগ—সব একসাথে কাজ করছে। ক্ষমতাসীনদের জন্য এটি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ, আর বিরোধী দলের জন্য এটি টিকে থাকার সংগ্রাম। তবে আসল প্রশ্ন হলো—এই নির্বাচন জনগণের কি কিছু বদলাবে? আমাদের রাজনীতির ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে নির্বাচন যত ঘন ঘন হয়, ততই ভোটের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাচ্ছে। অথচ নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের প্রাণ, জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। সেই ইচ্ছা যদি বারবার অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিস্তেজ হয়ে যায়, তবে রাষ্ট্রের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
নির্বাচন ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক : গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট নয়, ভোটের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলন। একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা ছাড়া গণতন্ত্র কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বিশ্বাস হারিয়েছে। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় নির্বাচন ছিল কার্যত একদলীয়—বিরোধীদল বর্জন করায় অধিকাংশ আসনেই ভোট হয়নি। ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে ভোট হয়েছিল, কিন্তু অভিযোগ উঠেছিল রাতেই ব্যালট ভর্তি, প্রশাসনের পক্ষপাত এবং ভয়ভীতির পরিবেশ নিয়ে। ফলাফল যা-ই হোক, জনগণের মনে প্রশ্ন থেকে গেছে—“আমাদের ভোটের কি দাম আছে?” এই প্রশ্নই ২০২৬ সালের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণ ভোট দিতে চায়, কিন্তু তারা নিশ্চিত হতে চায়—তাদের ভোট গণনায় যাবে কি না, তাদের মতামত প্রতিফলিত হবে কি না।
রাজনৈতিক আস্থাহীনতার দীর্ঘ ছায়া : আমাদের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিশ্বাসের অভাব। সরকার বিরোধী দলকে দেখে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে, বিরোধী দল সরকারকে দেখে দমনকারী হিসেবে। এর মধ্যে সাধারণ নাগরিক রয়ে গেছে দ্বিধাগ্রস্ত ও হতাশ। বিগত বছরগুলোতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, পুলিশি দমননীতি, দলীয়করণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভোটের মাঠকে শূন্য করে দিয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে দলীয় প্রভাব এত বেশি যে, ভোটাররা প্রায়ই ভোট দিতে যাওয়াকেই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি এক ধরনের নৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই আস্থাহীনতা কাটাতে হলে শুধু আইন নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে সদিচ্ছা এখন বিলাসিতা।
নির্বাচন কমিশনের পরীক্ষা : সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, কিন্তু বাস্তবে তাদের স্বাধীনতা কতটা—এই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষেরও। কমিশন যদি প্রশাসনের ছায়াতলে থাকে, তবে তার কার্যকারিতা হারায়। একদিকে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব, অন্যদিকে বিরোধী দলের অবিশ্বাস—এই দুই চাপে পড়ে কমিশন প্রায়ই পক্ষপাতদুষ্ট বা দুর্বল মনে হয়। একটি বিশ্বাসযোগ্য কমিশন গঠনে আইন আছে, প্রক্রিয়াও আছে; কিন্তু মনোভাবগত স্বাধীনতা সবচেয়ে জরুরি। কমিশন যদি সাহস না দেখায়, তাহলে কোনো আইনি কাঠামোই কাজ দেবে না। জনগণ দেখতে চায়—কমিশন কাকে সন্তুষ্ট করছে না, বরং কাকে ন্যায়বিচার দিচ্ছে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় : আমাদের রাজনীতি আজ আদর্শহীন, মূল্যবোধশূন্য এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক। দলগুলো এখন আর নীতিতে নয়, ব্যক্তিতে বিভক্ত। দলীয় আনুগত্য এখন নৈতিকতার চেয়ে বড় গুণ। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ‘দেশদ্রোহী’ বলা এখন রুটিন। বিরোধী মতামত সহ্য করার ক্ষমতা প্রায় শূন্য। সংসদে গঠনমূলক বিতর্ক নেই, বরং সেখানে চলে কটূক্তি, ব্যঙ্গ এবং চরিত্রহননের প্রতিযোগিতা। গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হলো বিরোধিতাকে স্বীকৃতি দেওয়া। যখন রাষ্ট্রে শুধু প্রশংসা টিকে থাকে, তখন গণতন্ত্র মৃত হয়। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা এখন সেই মৃত গণতন্ত্রের ছায়ায় বেঁচে আছি।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ভোটের মনোবিজ্ঞান : রাজনীতি ও অর্থনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ভোটাররা আজ রাজনৈতিক ভাষণের চেয়ে পেঁয়াজের দামেই বেশি আগ্রহী। মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংক খাতে অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, যুব বেকারত্ব—সব মিলিয়ে জনগণের জীবন এখন কঠিন। এ অবস্থায় সরকার যত উন্নয়ন চিত্রই তুলে ধরুক না কেন, মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। একজন শ্রমজীবী যখন বাজারে গিয়ে দেখে তার দৈনিক আয় দিয়ে তিনবেলা খাওয়া সম্ভব নয়, তখন সে “স্থিতিশীলতা” নয়, “পরিবর্তন” চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি সেই পরিবর্তনের পথ অর্থাৎ নির্বাচনই বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তবে মানুষ তার ক্ষোভ কোথায় প্রকাশ করবে? অর্থনৈতিক চাপ যখন রাজনৈতিক অসন্তোষের সাথে মিশে যায়, তখন সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়। তাই সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক শান্তির নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও পূর্বশর্ত।
আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক বাস্তবতা : আজকের বিশ্বে কোনো দেশের নির্বাচন আর সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নির্বাচনী বৈধতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগ, জাতিসংঘের আহ্বান—সবই দেখাচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে।
সরকার বলছে, তারা সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী; বিদেশি হস্তক্ষেপ চায় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো—যদি নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা—সবকিছুতেই প্রভাব পড়বে। তবে কূটনীতির ভারসাম্যও জরুরি। বিদেশি চাপকে সুযোগ হিসেবে নেওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি তা উপেক্ষা করাও আত্মঘাতী। বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের অংশ হিসেবে দেখা, হুমকি হিসেবে নয়।
তরুণ প্রজন্মের হতাশা ও আশার মিশ্রণ : বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি তরুণ। এই তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু দুঃখের বিষয়-এই প্রজন্ম রাজনীতিতে ক্রমেই অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে। তারা ভোট দেয় না, সভা-সমাবেশে যায় না, কারণ তারা বিশ্বাস করে না তাদের ভোটের কোনো মূল্য আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা সরব, কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে নীরব। এই প্রজন্মকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা জরুরি। তাদের জন্য রাজনীতি হতে হবে আদর্শভিত্তিক, ন্যায্য ও বিশ্বাসযোগ্য। কারণ ভবিষ্যতের গণতন্ত্র গড়বে তারাই। যদি তরুণরা ভোট হারায়, গণতন্ত্রও হারাবে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত—তরুণদের স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করা।
গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও নির্বাচনী পরিবেশ : নির্বাচনের স্বচ্ছতা নির্ভর করে তথ্যের স্বাধীনতার ওপর। গণমাধ্যম যদি নীরব হয়, তাহলে সত্য হারিয়ে যায়। আজ সাংবাদিকতা নানা সংকটে: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ভয়ভীতি, বিজ্ঞাপন বন্ধের হুমকি, চাকরি হারানোর আশঙ্কা। ফলে গণমাধ্যমের বড় অংশ এখন “সেল্ফ সেন্সরশিপে” অভ্যস্ত। যেখানে ভয় আছে, সেখানে সত্য থাকে না; আর যেখানে সত্য নেই, সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। একইভাবে নাগরিক সমাজও চাপে আছে। যারা স্বাধীনভাবে মত দেয়, তাদের ওপর মামলা বা হয়রানির আশঙ্কা থাকে। অথচ গণতন্ত্রের প্রাণ হলো মুক্ত মতামত। একটি নির্বাচনের আগে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের কণ্ঠরোধ মানে পুরো প্রক্রিয়াকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া।
প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নে : বাংলাদেশে প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাবের আওতায়। মাঠ প্রশাসন, পুলিশ, এমনকি নির্বাচনকালীন কর্মকর্তাদের ওপর দলীয় প্রভাবের অভিযোগ বহু পুরনো। একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা থানা ইনচার্জ যদি নিরপেক্ষ না থাকেন, তবে ভোটকেন্দ্রের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় না। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে প্রশাসন, তাই প্রশাসন যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, কমিশনের স্বাধীনতা অর্থহীন। নির্বাচনের সময় প্রশাসনকে অবশ্যই নির্দলীয় চরিত্রে ফিরিয়ে আনা দরকার। এটি করতে না পারলে ফলাফল আগেই অনুমান করা যায়।
অতীতের শিক্ষা, ভবিষ্যতের আহ্বান : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখার মতো অনেক কিছু আছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচন যেমন ছিল ঐক্যমতের ফসল, ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল জনগণের আশার প্রতিফলন। কিন্তু ২০১৪ ও ২০১৮ সালের অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে—বিরোধী অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হয় না। এখন সময় এসেছে সেই ভুলগুলো না করার। সরকার যদি মনে করে শুধু আইনের প্রয়োগেই নির্বাচন বৈধতা পাবে, তবে তা ভুল ধারণা। নির্বাচনের বৈধতা আসে জনগণের বিশ্বাস থেকে।
গণতন্ত্রের পথ কখনো সহজ নয়। কিন্তু এটি অসম্ভবও নয়। বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়, তবে তিনটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে-
১. প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা: ভোটের দিন পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
২. রাজনৈতিক সংলাপ: সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অন্তত ন্যূনতম আস্থা তৈরি করতে হবে। বিরোধীদের রাজনৈতিক অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
৩. ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ: প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদে ভোট দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা ভয়ভীতিহীনভাবে ভোট দিতে পারে। এই তিনটি শর্ত পূরণ হলে এখনও সময় আছে—আসন্ন নির্বাচনকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক বানানোর।
ভোটারদের ভূমিকা : সবশেষে, ভোটাররাও দায়মুক্ত নয়। তারা যদি উদাসীন থাকে, যদি ঘরে বসে থেকে শুধু সমালোচনা করে, তবে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি কখনও বদলাবে না। ভোট দেওয়া শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বও। তাই ভোটারদের উচিত—ভয় না পেয়ে, সুবিধাবাদে না পড়ে, নিজের বিবেক ও দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভোট দেওয়া।
উপসংহার : আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়, এটি রাষ্ট্রের আত্মার পরীক্ষা। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে ক্ষমতা জনগণের, নাকি এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে জনগণ কেবল দর্শক? একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে আমরা আবারও গণতন্ত্রে ফিরে যেতে পারব। আর যদি সেটি ব্যর্থ হয়, তবে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায় যুক্ত হবে। সত্যিকারের উন্নয়ন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার—সবকিছুর মূলে আছে একটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন। তাই এখনই সময় দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে ভাবার- আমরা কি আবারও জনগণের হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত?
লেখক- হাজী মুহাম্মদ মহসীন
উপ-সম্পাদক, দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি
সংবাদ শিরোনাম ::
আগামী নির্বাচন গণতন্ত্রের মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত
-
হাজী মুহাম্মদ মহসীন উপ-সম্পাদক, দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি - আপডেট সময় ০৫:৩৪:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫
- ৬১৬ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

























