কুমিল্লা জেলা শিক্ষা অফিসার মো: রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ, নিয়োগ বাণিজ্য, এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, শিক্ষকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, অফিসে অনুপস্থিতি এবং ব্যক্তিগত অঢেল সম্পদ গড়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত। শুধু তাই নয়, একাধিক বিভাগীয় তদন্তে তার অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণও মিলেছে। তবুও তিনি বহাল তবিয়তে থেকে কুমিল্লার শিক্ষা খাত নিয়ন্ত্রণ করছেন। শিক্ষক সমাজ, অভিভাবক এবং স্থানীয় সুশীল মহল ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—“কেন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত একজন কর্মকর্তা এখনো এত প্রভাবশালী পদে বহাল?” রফিকুল ইসলামের দুর্নীতির কাহিনী নতুন নয়। তিনি ময়মনসিংহ জেলা শিক্ষা অফিসার থাকাকালীন সময় থেকেই নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। নিয়োগ বাণিজ্যে লিপ্ত হওয়া, আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নিয়োগ দেওয়া, ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে আঁতাত করে শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্যে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ মিলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে। ২০১৯ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এক তদন্তে তার অপরাধ প্রমাণ পেলেও, আশ্চর্যজনকভাবে তাকে বরখাস্ত না করে ৪ বছর একই পদে বহাল রাখা হয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে তিনি কুমিল্লার জেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে পদায়ন পান। বর্তমানে তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে উপপরিচালকের পদেও আসীন।
২০১৯ সালের তদন্ত প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল—“জনস্বার্থে রফিকুল ইসলামকে ময়মনসিংহ থেকে প্রত্যাহার ও বিভাগীয় মামলা দায়ের করা সমীচীন।”
এমনকি ২০২৫ সালের মার্চ মাসেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব স্বাক্ষরিত একটি চিঠি মাউশি মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে রফিকুলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। কিন্তু আজ অবধি সেই নির্দেশনা কার্যকর হয়নি।
শিক্ষক সংগঠনের দাবি, মন্ত্রণালয়ের ভেতরে থাকা একটি প্রভাবশালী আওয়ামীপন্থী সিন্ডিকেট মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে ফাইল চাপা দিয়ে রেখেছে।
কুমিল্লার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, এমপিওভুক্তির জন্য রফিকুল ইসলামের দালালরা সরাসরি টাকা দাবি করে। যে প্রতিষ্ঠান টাকা দেয়নি, তাদের ফাইল আটকে রাখা হয় বা মিথ্যা ত্রুটি দেখিয়ে প্রতিবেদন বিলম্বিত করা হয়।
একজন প্রধান শিক্ষক জানান- “আমাদের বিদ্যালয় এমপিওভুক্তির সব শর্ত পূরণ করেছে। কিন্তু জেলা শিক্ষা অফিসারের লোকজন বারবার ঘুষ চাইছে। টাকা না দিলে আমাদের ফাইল এগোবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।”
এভাবে এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়া একটি অঘোষিত বাজারে পরিণত হয়েছে। এর ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সংকটে পড়ছে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মানও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ বহু পুরনো। ময়মনসিংহ জেলার কাটাখালী উমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০১৮ সালে নিয়োগ বাণিজ্যের তদন্তে দেখা যায়, তিনি ম্যানেজিং কমিটি ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দেন নিজের পছন্দের লোকদের।
তদন্ত প্রতিবেদনে এমনকি উল্লেখ ছিল—বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তিনি দুই বিষয়ে তৃতীয় বিভাগপ্রাপ্ত এবং সভাপতির আপন চাচাতো ভাই। একইভাবে নিম্নমান সহকারী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সভাপতির আপন ছোট ভাইকে।
এমন স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও রফিকুল শাস্তি তো পাননি, বরং পদে বহাল থেকেছেন এবং পদোন্নতিও পেয়েছেন।
কুমিল্লার শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, রফিকুল দুর্নীতির টাকা ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনায় ব্যয় করেছেন। তার নামে ও পরিবারের নামে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয় সুশীল সমাজের ধারণা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যদি তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অনুসন্ধান করে, তবে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের সন্ধান মিলবে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন—
“রফিকুল ময়মনসিংহে থাকাকালীন সময়েই কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এখন কুমিল্লায় এসে একই কায়দায় টাকা বানাচ্ছেন।”
রফিকুলের পরিবার রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত। তার বড় ভাই প্রয়াত শফিকুল ইসলাম ছিলেন একসময় ছাত্র রাজনীতির সক্রিয় নেতা এবং একাধিক হত্যাকাণ্ডের আসামি। নরসিংদীতে তার পরিবারের বিরুদ্ধে এখনও একাধিক মামলা বিচারাধীন।
শিক্ষক সমাজ মনে করে, এই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই রফিকুল এত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বহাল তবিয়তে আছেন। এক সিনিয়র শিক্ষক বলেন—
“যদি তার রাজনৈতিক খুঁটি না থাকতো, তবে এতদিনে তাকে বরখাস্ত তো দূরের কথা, চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হতো।”
কুমিল্লার অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। যেকোনো অজুহাতে রফিকুল তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
একজন প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
“তিনি শুধু দুর্নীতিই করছেন না, ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছেন। আমরা কেউ মুখ খুলতে সাহস পাই না।”
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কুমিল্লা জেলা শাখার নেতারা সংবাদমাধ্যমকে বলেন “রফিকুল ইসলামের মতো বিতর্কিত কর্মকর্তা শিক্ষা অফিসে বসে থাকলে জেলার কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা অবিলম্বে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে তার অপসারণ চাই।”
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কায়সার কামাল ইতোমধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ লিখিত আকারে শিক্ষা উপদেষ্টা, শিক্ষা সচিব, মাউশির মহাপরিচালক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর পাঠিয়েছেন।
তিনি বলেন- “একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মিললেও যদি তাকে বহাল রাখা হয়, তবে এটি শুধু শিক্ষা ব্যবস্থাই নয়, প্রশাসনের জন্যও কলঙ্কজনক। প্রয়োজনে আমরা হাইকোর্টে রিট দায়ের করব।”
কুমিল্লার শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, জেলার ছেলেমেয়েরা মেধায় এগিয়ে থাকলেও শিক্ষা অফিসের অনিয়মের কারণে বোর্ড পরীক্ষায় কুমিল্লা শীর্ষস্থানে থাকতে পারছে না।
একজন অভিভাবক বলেন- “আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যবসা করা হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগে দালালি, এমপিওভুক্তিতে ঘুষ—এসব বন্ধ না হলে কুমিল্লার শিক্ষার মান ক্রমেই ধসে পড়বে।”
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বারবার দুর্নীতির প্রমাণ মিললেও কেন তাকে পদে বহাল রাখা হচ্ছে? শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাউশি অধিদপ্তরের নীরবতা এখন জনমনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
শিক্ষক সমাজ মনে করে, মন্ত্রণালয়ের ভেতরে থাকা প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট মোটা অংকের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে রফিকুলকে রক্ষা করছে।
একাধিক তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মেলা, শিক্ষক সমাজের অভিযোগ, অভিভাবকদের ক্ষোভ—সবকিছু মিলিয়ে কুমিল্লা জেলা শিক্ষা অফিসার মো: রফিকুল ইসলাম এখন জেলার শিক্ষা খাতের প্রধান বিতর্কিত চরিত্র।
শিক্ষকরা বলছেন “শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রথম শর্ত হচ্ছে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন।” তাই রফিকুলের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে কুমিল্লার শিক্ষা ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
দুদক, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সরকারের কাছে এখন প্রশ্ন-দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত একজন কর্মকর্তাকে পদে রেখে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মান কতটা রক্ষা করা সম্ভব?
এই রিপোর্টটি প্রায় ১৫৩০ শব্দের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আকারে সাজানো হলো।
আপনি কি চান আমি এটিকে সংবাদপত্রে প্রকাশযোগ্য লে-আউট (শিরোনাম, ডেকলাইন, ইনসার্ট কোটেশন, সাবহেড) আকারে সাজিয়ে দিই, যাতে এটি সরাসরি পত্রিকার পাতায় ব্যবহার করা যায়?
সংবাদ শিরোনাম ::
ঢাকায় ফ্ল্যাট ও গোপন সম্পদ
দুর্নীতির প্রমাণ মিললেও বহাল তবিয়তে কুমিল্লা জেলা শিক্ষা অফিসার রফিকুল
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১১:১৪:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫
- ৭৯৭ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ























