বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত এক নাম—নুরুল হক নূর, ডাকসুর সাবেক ভিপি এবং গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি। যাঁর নেতৃত্বে ছাত্র, যুব, শ্রমজীবী ও নিম্নবিত্ত জনগণের অধিকারের প্রশ্নটি রাজপথে স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নূর ছিলেন এক প্রতীক—স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে একক প্রতিরোধের প্রতিমূর্তি।
সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর উপর সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সমন্বিত হামলার খবর আমাদের সামনে যে ভয়ানক বার্তাটি দেয়, তা হলো—রাষ্ট্র আজ নিজ নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ভীতিকরভাবে দমন করছে। এটি কি শুধুই একটি ব্যক্তির উপর নির্যাতন? নাকি গণতন্ত্রের সর্বনাশের ঘণ্টা?
একক প্রতিবাদীর প্রতিরোধ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া
নুরুল হক নূর রাজপথে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা কখনো ছিলো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, কখনো রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, কখনোবা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে। কিন্তু বারবার লক্ষ্য করা গেছে, তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রশাসনিক হয়রানি, হামলা, এমনকি জীবননাশের হুমকির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এই ধরনের রাষ্ট্রীয় সহিংসতা কি কোনোভাবেই রাষ্ট্রের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে? নূরের মত একজন গণতান্ত্রিক নেতা যখন বারবার টার্গেট হন, তখন জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি ভয়ের পরিবর্তে ক্ষোভই বাড়ে। মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—একজন নিরস্ত্র ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর শক্তি ব্যবহার কতটা যুক্তিসঙ্গত?
রাষ্ট্রযন্ত্রের সহিংসতা ও গণতান্ত্রিক অবক্ষয়
যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সহ্য করতে পারে না, সে রাষ্ট্র কখনো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হতে পারে না। সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের কণ্ঠরোধ করা নয়। নূরের উপর হামলা সেই মৌলিক দায়িত্ব পালনের চরম ব্যর্থতার প্রতীক।
এ ধরনের হামলা কেবল রাজনৈতিক শিষ্টাচারকেই ভেঙে দেয় না, তা জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রবিরোধী ক্ষোভ ও রাজনৈতিক মেরুকরণকে বাড়িয়ে তোলে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন রাষ্ট্র তার ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করে, তখনই সমাজে উগ্রপন্থা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশ আজ এক বিশ্বায়িত সমাজের অংশ। আন্তর্জাতিক মহল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে কোন রাষ্ট্র কতটা মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করছে। ভিপি নুরের মতো জনপ্রিয় ছাত্রনেতার উপর সেনা ও প্রশাসনের হামলা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় যেভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, তা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হতে বাধ্য। স্বৈরতন্ত্রের পথে হাঁটা কোনো রাষ্ট্রের জন্য টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়—তা ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে।
উপসংহার: মুক্ত কণ্ঠস্বরের উপর আঘাত রাষ্ট্রের উপরই প্রতিঘাত আনে
ভিপি নুরের উপর হামলা কেবল একজন ব্যক্তির উপর নয়, তা ছিল গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এবং মানবাধিকারের উপর সরাসরি আঘাত। রাষ্ট্র যদি আজ এই প্রশ্নে আত্মসমালোচনায় না যায়, তবে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পতিত হওয়া অবধারিত।
একজন নূরের কণ্ঠরোধ করা যেতে পারে, কিন্তু তাঁর চিন্তা, তাঁর সাহস, তাঁর আদর্শ—তা কোনো সেনাবাহিনীর বুটের নিচে চাপা পড়বে না। বরং তা ছড়িয়ে পড়বে আরও বিস্তৃতভাবে, আরও জোরালোভাবে।
রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে স্থিতিশীলতা চায়, তবে গণতন্ত্রকে হত্যা না করে, তাকে সজীব ও প্রাণবন্ত রাখার দিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত।
সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
শহীদুল ইসলাম 

























