সারা দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে থাকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। ১৬ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে এনজিও হিসেবে কাজ শুরু করলেও ২০২৩ সালের জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আইনের মাধ্যমে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি রাজধানীর মিরপুর ১৪ নাম্বারে অবস্থিত। এই প্রতিষ্ঠানে ২০০১ সালের জনাব মোহাম্মদ মফিজুল ইসলাম উচ্চমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে ও তার স্ত্রী জিয়াসমিন আক্তার সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে যোগদান করেন। এরপর ধাপেধাপে পদোন্নতি পেয়ে মফিজুল ইসলাম হয়েছেন সহকারি পরিচালক (প্রশাসন) এবং জিয়াসমিন আক্তার হয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানের একই কার্যালয়ে দুই স্বামী-স্ত্রী কাজ করার সুবাদে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা সহ সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করাও ভুলে গেছেন তারা।
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) বিজয় কৃষ্ণ দেবনাথ নিজেও ২০২৪ সালের অক্টোবর মাস থেকে এই প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। জানাগেছে বিজয় কৃষ্ণ দেবনাথ সচিবালয়ে তার নিজ দায়িত্ব পালনের পরে মাঝে মধ্যে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে অফিস করেন আর এই সুযোগে অত্র প্রতিষ্ঠানকে মফিজুল ইসলাম ও জিয়াসমিন আক্তার (স্বামী-স্ত্রী) নিজেদের খেয়াল খুশি মতো চালাচ্ছেন।
যদি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মত গুরুত্বপূর্ণ একটা পদ দীর্ঘদিনের শূন্য রেখে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাঝে মাঝে অফিসে যাওয়ার মাধ্যমে ফাউন্ডেশন পরিচালনা সম্ভব হয় তাহলে এই পদের গুরুত্ব কোথায়?
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জিয়াসমিন আক্তার ও মফিজুল ইসলাম এর কর্মকান্ডের বেশকিছু তথ্য দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির কাছে আসে। অনুসন্ধানের প্রথমেই জানা গেছে জিয়াসমিন আক্তার ১০ম গ্রেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার পদে থাকলেও তিনি ০৮ম গ্রেডের সহকারী পরিচালক (শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এই দায়িত্ব পালন করছেন ০৩ নভেম্বর ২০২২ সাল থেকে। ২ বছর আট মাস যাবৎ বিধি বহির্ভূত ভাবে এই দায়িত্বে আছেন তিনি।
চাকরির বিধানাবলীর চলতি দায়িত্ব ও অতিরিক্ত দায়িত্ব সংক্রান্ত নিয়মাবলীতে উল্লেখ আছে , জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শাখা (বিধি-১) এর ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ তারিখের স্মারক নং সম(বিধি-১)/এস-১১/৯২-৩০(১৫০) এর মাধ্যমে চলতি দায়িত্ব/অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত সর্বশেষ যে নিয়মাবলী জারি করা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে উক্ত বিধি মোতাবেক মন্ত্রণালয়/বিভাগ সাধারণত শূন্য পদে যথাক্রমে সমপদধারীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং নিম্ন পদধারীকে চলতি দায়িত্ব প্রদান করিয়া থাকেন। চলতি দায়িত্ব ও অতিরিক্ত দায়িত্ব সংক্রান্ত ১৮ এপ্রিল ২০২৩ তারিখের প্রজ্ঞাপনেও একই কথা বলা হয়েছে। তাহলে এই বিধান অনুযাযী ১০ম গ্রেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা জিয়াসমিন আখতার সহকারী পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন কিভাবে?
এই বিষয়ে জিয়াসমিন আক্তার বলেন ফাউন্ডেশন এর জনবলের স্বল্পতা ও দক্ষ জনবল আর না থাকায় তাকে এই দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন আসে এই দপ্তরে কি এতই দক্ষ জনবলের অভাব যে দশম গ্রেডের কর্মকর্তাকে অষ্টম গেটের দায়িত্ব পালন করতে হয়! নবম গ্রেডের কর্মকর্তাকে রেখে অষ্টম গেটের কর্মকর্তা কিভাবে জ্যেষ্ঠ হন?
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের কর্মচারী চাকুরী বিধিমালা ৫ মে ২০১৬ তে প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটে উল্লেখ আছে কোন প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালকের ক্ষেত্রে সরাসরি নিয়োগ প্রাপ্ত হবেন ৫০ শতাংশ কর্মকর্তা এবং পদোন্নতির মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন ৫০ শতাংশ কর্মকর্তা। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে পদোন্নতির ভিত্তিতে তিনজন সহকারী পরিচালক থাকলেও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জিয়াসমিন আক্তার ০৭ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে সহকারী পরিচালক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেছেন যা সম্পূর্ণ বিধি বহির্ভূত। বিধি বহির্ভূত আবেদন করেই ক্ষান্ত থাকেননি তিনি। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের কর্মচারী চাকুরী বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আনিসুজ্জামান কোন অদৃশ্য কারণে এই ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জিয়াসমিন আক্তারকে সহকারী পরিচালক (শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ) এর অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়েছেন?
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখের অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে বলা আছে অতিরিক্ত দায়িত্ব দায়িত্বের স্থায়িত্ব ৬ মাসের অধিক হলে ৬ মাস অতিক্রমের পূর্বে অর্থ বিভাগে সম্মতির জন্য প্রেরণ করতে হবে। কিন্তু জিয়াসমিন আক্তার ০২ বছর ৮ মাস অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এখনো দায়িত্বে থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগকে অবহিত করেননি। তাহলে তিনি কি অর্থ মন্ত্রণালয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করছেন?
এই বিষয়ে জিয়াসমিন আক্তার বলেন, অর্থ বিভাগকে অবহিতকরণের বিষয়টি আমার নিজ দায়িত্ব নয়। তাহলে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করাকার দায়িত্ব এবং যার দায়িত্ব তিনি কি দায়িত্বের অবহেলা করেছেন?
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে যে জনবল নিয়োগ প্রদান করা হয় সেই নিয়োগ প্রক্রিয়াও নিয়ন্ত্রণ করেন মফিজুল ইসলাম ও জিয়াসমিন আক্তার (স্বামী-স্ত্রী)। এছাড়াও এই দপ্তরের বদলি বাণিজ্যও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের সকল বদলি অর্থের বিনিময় করেন এই দুই কর্মকর্তা। একই দপ্তরে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকায় এটা যেন তাদের ঘর বাড়ি হয়ে উঠেছে যখন যা খুশি তা করতে তারা মোটেও দ্বিধান্বিত হন না। সরকারি অ্যাম্বুলেন্স বাসায় যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করেন এই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জিয়াসমিন আক্তার।
অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের বিষয়ে জিয়াসমিন আক্তার বলেন, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয় আমাদের একটি মাইক্রোবাসের মাধ্যমে সকলকে পৌঁছে দেয়া সম্ভব না হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের জন্য বলেছিলেন। যেই অ্যাম্বুলেন্স রোগী পরিবহনের জন্য সেই অ্যাম্বুলেন্স কি কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে বহনের কাজে ব্যবহার হতে পারে? এছাড়াও জানাগেছে গত কুরবানিতে গরুর হাটে যাওয়ার জন্যও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করেছিলেন এই দম্পতি।
মফিজুল ইসলাম ও জিয়াসমিন আক্তার বলেন, আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে জনবল নিয়োগ/সরবরাহের সকল নথি ও বদলি সংক্রান্ত নথি প্রশাসনিক কর্মকর্তা কর্তৃক উপস্থাপিত হয়ে সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) এর মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট পেশ করা হয়।
সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) এর দায়িত্বে রয়েছেন মোঃ মফিজুল ইসলাম যার মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট নথি পেশ হয়, এবং এই সহকারী পরিচালকের স্ত্রী জিয়াসমিন আক্তার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। সুতরাং ফাইল তৈরি ও সর্বোচ্চ টেবিল পর্যন্ত উপস্থাপন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদের এখানে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রয়েছে। এ যেন স্বামী-স্ত্রীর এক মজবুত শিকল।
এই সকল অপকর্মের মাধ্যমে মফিজুল ইসলাম ও জিয়াসমিন আক্তার (স্বামী-স্ত্রী) হাতিয়েছেন মোটা অংকের অর্থ যা দিয়ে তারা রাজধানীর বুকে কিনেছেন ফ্লাট। অনুসন্ধানে জানা গেছে মিরপুরের ইব্রাহিমপুর পর্বতা ঈদগাহ রোডে খান মঞ্জিল নামে একটি ভবনের আট তলায় তাদের নিজস্ব ফ্ল্যাট রয়েছে (হোল্ডিং নং-৯২৭/১)। স্বামী সহকারি পরিচালক(প্রশাসন), স্ত্রী ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এখন আবার বিধি বহির্ভূত ভাবে রয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালকের দায়িত্বেও। সব মিলিয়ে এই স্বামী স্ত্রীর হাতেই জিম্মি জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন।
এই ফাউন্ডেশনের কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে চাইলে প্রথমে তারা কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তাদের যখন নিশ্চয়তা প্রদান করা হয় কখনোই কোনভাবে তাদের নাম প্রকাশ করা হবেনা তখন তারা এই মফিজুল ইসলাম ও জিয়াসমিন আক্তারের বিষয়ে এই প্রতিবেদনে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা সত্য এবং এমন অনিয়ম দীর্ঘদিন যাবৎ চলে আসছে বলে স্বীকার করেন। এবং আরও বলেন সাংবাদিকের কাছে কে বলেছি তা যদি তারা জানতে পারে তাহলে আমার ক্ষতি হবে। প্রতিবেদককে জোড় অনুরোধ করে বলেন, ভাই আমি আপনাকে সত্যি বলেছি দেখবেন আমার যেন ক্ষতি না হয়।
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বে) বিজয় কৃষ্ণ দেবনাথ এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমি ওখানে মাঝে মাঝে দুই একদিন যাই । প্রতিবেদনে উল্লেখিত এই সকল বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন আমি কয়েকদিন পর্যন্ত ওখানে যাইনি ওখানে গিয়ে আপনি যে মেইল পাঠিয়েছেন তা দেখে উত্তর দিতে পারব কিন্তু পরবর্তীতে তার সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও কথা বলার সুযোগ হয়নি।
সম্প্রতি কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাকে মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে পদোন্নতি নেয়ার চেষ্টা করছেন এই জিয়াসমিন আক্তার। কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতার যে তালিকা করা হয়েছে তাও লঙ্ঘিত হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানে।
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের টাকা ভাগবাটোয়ারা করে খাচ্ছে মফিজ-জিয়াসমিন দম্পতি
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৮:০৯:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ অগাস্ট ২০২৫
- ৭৬৫ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ























