মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চিৎলা পাটবীজ খামারে চলছে সরকারি সম্পদের খোলামেলা লুটপাট। অভিযোগ উঠেছে, যুগ্ম পরিচালক (জেডি) মোর্শেদুল ইসলাম খামারটি ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছেন। সরকারি গাছপালা, যানবাহন, অবকাঠামো, কৃষি-উৎপাদন ও শ্রমিক ব্যবস্থাপনাসহ সব কিছুতেই রয়েছে তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং চরম অনিয়ম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেডি মোর্শেদুল ইসলাম খামারে নিয়মিত অফিস না করে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে চুয়াডাঙ্গার শ্বশুরবাড়িতে যাতায়াত করেন। যখন ইচ্ছে তখন খামারে আসেন। আবার মন না চাইলে আসেন না। তিনি নিজের পছন্দের লোকদের দিয়ে বিভিন্ন টেন্ডারে অংশগ্রহণ করিয়ে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। পরে টেন্ডারের দরপত্রে কাটাছেঁড়া করে নতুন দর তৈরি করা হয়—ফলে প্রকৃত দরদাতারা বঞ্চিত হন।
খামারের ১৫০টি আমগাছের মধ্যে মাত্র ৮৯টি গাছ নিলামে তোলা হলেও বাকি গাছগুলো নিয়ে কোনো টেন্ডার হয়নি। প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকার কাঁঠাল মাত্র ৫ হাজার টাকায় লেবার সর্দার বকুল-সহ আরো কয়েকজন সর্দারকে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। লিচু গাছের সঠিক সংখ্যা জানানো হয়নি। এ ছাড়া ১৫-২০টি মূল্যবান গাছ গোপনে কেটে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, খামারের পুরনো ভবন বিক্রির সর্বোচ্চ দর উঠেছিল ৬৫ লাখ টাকা। অথচ মাত্র ২৮ লাখ টাকায় তা বিক্রি করে দেন জেডি মোর্শেদুল। সরকারি কোষাগার মাত্র ১৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জমা করে বাকি টাকা পকেটস্থ করেছেন। এছাড়া মাটির নিচে থাকা ৮ ও ৬ ইঞ্চি সাইজের প্রায় ২০০টি লোহার পাইপও কোনো টেন্ডার ছাড়াই বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
একটি সূত্র জানায়, একরপ্রতি ২৪ জন শ্রমিক বরাদ্দ থাকলেও কাজ করানো হয় মাত্র ১৬ জন দিয়ে। বাকি ৮ জনের নামে ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। মৌসুমভিত্তিক মাস্টাররোলেও রয়েছে জালিয়াতির অভিযোগ। জানা যায়, জেডি মোর্শেদুল বাইরের জেলা থেকে নিয়ে এসে নাজিম নামের একজনকে খামারে অঘোষিত জেডি নিয়োগ দিয়েছেন। তার মাধ্যমে খামারে বিভিন্ন অনিয়ম সংঘটিত হয়। শ্রমিকের ভুয়া তালিকাও সে তৈরী করে।
স্থানীয় ঠিকাদার ও বিএনপি নেতা নুর ইসলাম বলেন, “আমি কয়েকটি টেন্ডারে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে নিয়মিত টেন্ডার দুর্নীতি চলে। সবচেয়ে বেশি দরদাতা নির্বাচনের পর জেডি নিজে দাম কমিয়ে দিয়ে নতুনভাবে টেন্ডার তৈরি করেন।”
চিৎলা পাটবীজ খামারের শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা এবং ধানখোলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিউল রহমান ট্রমা বলেন, “এই জেডি মনে করে এখনো শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন, এখনো আওয়ামীলীই ক্ষমতায় আছে। সে নিজের পরিচয় দিত গোপালগঞ্জে নাকি তার বাড়ি, এমনকি শেখ হাসিনার ক্লাসফ্রেন্ড। আবার চুয়াডাঙ্গার সেলুন জোয়ার্দারের জামাই বলেও পরিচয় দেয় সবসময়।” তিনি আরও বলেন, “জেডির কাছে পিস্তল আছে বলেও শোনা যায়। আমলাতে যখন চাকরি করতেন, তখন একটি ঘটনায় পিস্তল দেখিয়েছিলেন। স্থানীয়রা তাকে তেড়ে বের করে দিয়েছিলো সেই সময়। এখন এখানে এসে আবার একইভাবে আধিপত্য বিস্তার করছে। জেডি বিভিন্ন অনিয়মের পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গায় গরুর খামার পরিচালনার জন্য এই খামারের ধানের বিচালি সরকারি গাড়িতে করে কোন টেন্ডার ছাড়া চুয়াডাঙ্গায় নিয়ে যান। কেউ কিছু বলার নেই, কেউ কিছু দেখার নেই। এমনকি হেড অফিসকেও সে নাকি ‘ঘুমের ভাগ’ দেয়, তাই তার বিরুদ্ধে কেউ ব্যবস্থা নেয় না।”
এবিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাংনীর দুইজন সিনিয়র বিএনপি নেতা বলেন, জেডি লোক সুবিধার না। সে এক সময় আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় চলতো। শুনেছি সে নাকি চুয়াডাঙ্গা থেকে যখন ইচ্ছা অফিসে আসে, আবার যখন ইচ্ছা যায়। সে আগেও কাউকে পাত্তা দিত না এখনো দেয়। যা অপকর্ম আছে লেখেন।
এবিষয়ে চিৎলা পাটবীজ খামারের জেডি মোর্শেদুল, পাটবীজ বিভাগের জিএম দেবদাস সাহা এবং বিএডিসির চেয়ারম্যানের সাথে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
জেডির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ প্রকাশ পেয়েছে গণমাধ্যমে। এমনকি তদন্তও হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “একজন কর্মকর্তা এত অনিয়ম করার পরেও কিভাবে বহাল তবিয়তে দায়িত্বে থাকেন—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।” তারা এই অনিয়মের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও জেডির অপসারণের দাবি জানিয়েছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















