বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড ছাড়াই স্মার্টফোন কেনার জনপ্রিয় কার্ডলেস ইএমআই (EMI) প্ল্যাটফর্ম ‘টপ পে’ (TOPPAY Services Limited)-এর বিরুদ্ধে গ্রাহকসেবায় চরম গাফিলতি ও আর্থিক ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে অপ্পো (OPPO), রিয়েলমি (realme) এবং ওয়ানপ্লাস (OnePlus) ব্র্যান্ডের ফোনগুলো কিস্তিতে কেনার পর ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন ধরনের কারিগরি ও আর্থিক জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
টাকা পরিশোধের পরও ফোন ‘লক’, বিপাকে গ্রাহক
টপ পে অ্যাপের মাধ্যমে কিস্তি পরিশোধের স্বয়ংক্রিয় নিয়ম থাকলেও অনেক গ্রাহক দাবি করছেন, বিকাশ বা নির্ধারিত মাধ্যমে সঠিক সময়ে কিস্তির টাকা কেটে নেওয়ার পরও তাদের হ্যান্ডসেটগুলো আনলক হচ্ছে না। কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী টাকা পরিশোধের সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টার মধ্যে (অফিস চলাকালীন) ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সচল হওয়ার কথা থাকলেও, অনেক গ্রাহকের হ্যান্ডসেট দিনের পর দিন লক হয়ে থাকছে।
ভুক্তভোগী এক তরুণ ফ্রিল্যান্সার জানান, “আমি বিকাশের মাধ্যমে আমার নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধ করেছি। কিন্তু তিনদিন পার হয়ে গেলেও আমার রিয়েলমি ফোনটি লক হয়ে আছে। ফোন লক থাকায় আমি জরুরি কোনো কাজ বা যোগাযোগ করতে পারছি না।”
অতিরিক্ত চার্জ ও পেনাল্টি আরোপের অভিযোগ
গ্রাহকদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো, ব্যাংকিং বা টেকনিক্যাল ত্রুটির কারণে পেমেন্ট প্রসেস হতে সামান্য দেরি হলে বা অ্যাপে পেমেন্ট আপডেট না হলে গ্রাহকদের ওপর অন্যায্য বিলম্ব ফি বা পেনাল্টি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কিস্তির আসল অঙ্কের চেয়েও বেশি টাকা কেটে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও কাস্টমার কেয়ারের উদাসীনতা
টপ পে-এর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেছেন যে, অ্যাপে কোনো সমস্যা দেখা দিলে বা ভুলবশত অ্যাপ ডিলিট হয়ে গেলে কিস্তি পরিশোধের বিকল্প কোনো সহজ উপায় পাওয়া যায় না। পাশাপাশি, কোম্পানির অফিসিয়াল হটলাইন নম্বরে (09677-688688) কল করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও কোনো কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে গ্রাহকদের দাবি।
একই সঙ্গে, প্রতিষ্ঠানটি তাদের পেজে গ্রাহকদের সতর্ক করে জানিয়েছে যে, অফিসিয়াল অ্যাপ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তিগত নম্বরে কিস্তির টাকা লেনদেন করলে জালিয়াতির শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে গ্রাহকদের পাল্টা দাবি—অফিসিয়াল অ্যাপের ত্রুটি ও কাস্টমার কেয়ারের রেসপন্স না পাওয়ার কারণেই মূলত তারা এই ধরনের ঝুঁকিতে পড়ছেন।
দ্রুত এই কারিগরি ত্রুটি ও গ্রাহক হয়রানির সমাধান করা না হলে ডিজিটাল ফাইন্যান্স ও ইএমআই সেবার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
৩ পেশার মানুষকে কিস্তি সুবিধা দেওয়া নিয়ে বিতর্ক: ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা
এদিকে, টপ পে-এর একটি বিশেষ ব্যবসায়িক পলিসি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি সাংবাদিক, আইনজীবী (উকিল) এবং পুলিশ সদস্যদেরও সহজ কিস্তিতে (EMI) মোবাইল ফোন সুবিধা প্রদান করছে।
তবে সাধারণ গ্রাহক ও ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ এই পলিসি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অ্যাপের কারিগরি ত্রুটি ও হয়রানির শিকার হওয়া একাধিক গ্রাহক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করে বলছেন—”যারা এই তিন প্রভাবশালী পেশার মানুষকে কিস্তিতে ফোন দিচ্ছে, তারাই এখন সাধারণ মানুষের টাকা আটকে রেখে ভোগান্তি তৈরি করছে। তাহলে আসল চোর বা ডাকাত কারা?”
ভুক্তভোগীদের দাবি, সাধারণ মানুষ যখন টাকা পরিশোধ করেও ফোন আনলক করতে পারছে না বা অতিরিক্ত ফি দিতে বাধ্য হচ্ছে, তখন এই প্রভাবশালী পেশার মানুষদের কিস্তি সুবিধা দিয়ে কোম্পানি মূলত নিজেদের এক ধরনের ‘সুরক্ষাবলয়’ তৈরি করার চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সাধারণ জনগণের টাকা নিয়ে এই ধরনের কারিগরি জটিলতা এবং হয়রানি এক ধরনের ‘ডিজিটাল ডাকাতি’র শামিল বলেও অনেকে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















