ঢাকা ০৯:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

সিসিকে দুর্নীতির মহোৎসব, শত কোটি টাকার লুটপাটে জড়িত ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী!

সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী, সুসংগঠিত ও অসাধু সিন্ডিকেটের নজিরবিহীন জালিয়াতি, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ এবং শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। নগরবাসীর নাগরিক সেবা, স্বস্তি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত কোটি কোটি টাকা এখন গুটিকয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত পকেটে চলে যাচ্ছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বিরামহীনভাবে দিনরাত মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে ঘুরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি যেখানেই কোনো অনিয়ম ও ঘাপলা দেখতে পাচ্ছেন, নিজেই ছুটে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে তা সমাধানের চেষ্টা করছেন। কিন্তু নগর ভবনের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর লুণ্ঠন ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে তাঁর সার্বিক উন্নয়ন প্রয়াসের ষোলো আনার মধ্যে দশ আনাই ব্যর্থ হতে বসেছে। একদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করছেন প্রশাসক, অপরদিকে নিজের ঘরে বসেই পুকুরচুরি করছে কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী।

সম্প্রতি সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৪ জন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর এবার নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সম্প্রতি এই চক্রের বিরুদ্ধে দুদকের ঢাকা অফিসে লিখিত অভিযোগ করেছেন এক ভুক্তভোগী। তিনি তাঁর অভিযোগে সিটি করপোরেশনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের নানা অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছেন। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যমতে, খুব শিগগিরই এসব কর্মকর্তার দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধানে নামছে দুদকের একটি শক্তিশালী টিম। সাধারণ নগরবাসী মনে করেন, সঠিকভাবে তদন্ত হলে সিটি করপোরেশনে যুগের পর যুগ ক্ষমতার অপব্যবহার করে আসা এসব কর্মকর্তার অনেকেই ফেঁসে যেতে পারেন। এমন আতঙ্ক এখন ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজদের মধ্যে বিরাজ করছে।

এর আগে ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদিকুর রহমানসহ একাধিক ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে সিসিকের সুনির্দিষ্ট ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম ও দাপ্তরিক নথিপত্রসহ নিরপেক্ষ তদন্তের আবেদন দাখিল করেছেন। তবে সিসিক কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করায় এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সিসিককে নিজেদের পারিবারিক সম্পত্তি মনে করে যারা দীর্ঘদিন ধরে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের অনৈতিক নেটওয়ার্ক এতটাই গভীরে বিস্তার করেছে যে—বদলি, অবসর কিংবা আত্মগোপনে থেকেও তাঁরা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকায় বসে রিমোট কন্ট্রোলে সিসিকের ব্যাকডেটেড ফাইল কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য ও জালিয়াতির পুরো সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন সিসিক থেকে ঢাকায় বদলিকৃত সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমান এবং বগুড়ায় বদলি হওয়া সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবর। বদলি হয়েও তাঁরা বিপুল অঙ্কের তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে পুনরায় সিসিকে ফিরে আসার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন। এতে স্পষ্ট ফুটে ওঠে যে, সিসিক এই দুর্নীতিবাজদের কাছে যেন এক কালোটাকার খনি।

সিসিকের প্রশাসনিক ও প্রকৌশলসংক্রান্ত ফাইল অনুমোদন, নকশা যাচাইকরণ ও সরকারি পে-অর্ডার জমা দেওয়ার নির্ধারিত দপ্তর থাকলেও, সিলেট নগরীর ঐতিহ্যবাহী সুরমা মার্কেট থেকে সিসিকের সাবেক মেয়র, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সচিব, প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীসহ শীর্ষ পর্যায়ের সব কর্মকর্তার হুবহু নকল সিল তৈরি করানো হয়। সরকারি নথি অনুমোদনে জালিয়াতির প্রতিটি ধাপে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক স্বাক্ষর নিখুঁতভাবে নকল করার কাজ চালানো হতো সুকৌশলে। বিশেষ একটি শোবার ঘরে বসেই রাতারাতি অবৈধ ইমারত নকশা ও ব্যাকডেটেড ফাইলের অনুমোদন তৈরি করা হতো।

এ ছাড়া, সিসিকে কর্মরত প্রায় ২৫৮ জন অস্থায়ী ও দিনমজুর কর্মচারীকে চাকরি স্থায়ী করার ভুয়া আশ্বাস দিয়ে হাইকোর্টের প্রসেসিং ফি বাবদ জনপ্রতি ১০,০০০ টাকা করে মোট ২৫,৫০,০০০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। টাকা ফেরত চাইলে কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হতো।

সিসিকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমান (বর্তমানে ডেপুটেশনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কর্মরত) বিগত দুই দশক ধরে সিসিকের ড্রেনেজ, ছড়া ও নগর উন্নয়ন প্রকল্পের শত শত কোটি টাকার বরাদ্দে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করে রেখেছিলেন। নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ভঙ্গ করে অবৈধ নকশা অনুমোদন দিয়েছেন তিনি। ২০০৭ সালের ১/১১-এর জরুরি অবস্থার সময় যৌথ বাহিনী ঘুষ গ্রহণ ও টেন্ডার জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। শুধু দুর্নীতিই নয়, মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গেও জড়িয়েছে তাঁর নাম। ২০২৩ সালের ২৩ মে সিসিকের নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ওপর থেকে ভারী স্টিলের পাইপ পড়ে ল্যান্স করপোরাল মো. দেলোয়ার হোসেন নামের এক সেনাসদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় (মামলা নং-২৪/১৫০) ১ নম্বর অভিযুক্ত আসামি এই নূর আজিজ। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকালীন ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলা (মামলা নং-০১) এবং সিআর মামলায় (নং-৩৫২) এজাহারভুক্ত আসামি তিনি। বর্তমানে ঢাকায় কর্মরত থাকলেও সিসিকের ব্যাকডেটেড ফাইল প্রস্তুত ও জালিয়াতির পুরো সিন্ডিকেটটি তিনি ঢাকা থেকেই নিয়ন্ত্রণ করছেন।

সদ্য বগুড়া পৌরসভায় বদলিকৃত সিসিকের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবর ২০০৭ সালে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমানের মাধ্যমে নাটোর পৌরসভা থেকে সিসিকে যোগ দেন। দীর্ঘ দুই দশকের কর্মজীবনে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক লুটপাট ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। কদমতলীর নতুন সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পর গঠিত তদন্ত কমিটিতে তাঁর নিজের আপন ভাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প প্রকৌশলী হওয়া সত্ত্বেও আলী আকবরকে সমন্বয়ক করা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার জোরে তিনি এত দিন পদে আসীন ছিলেন।

অন্যদিকে, নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত) মো. রাজিউদ্দিন খানের বিরুদ্ধে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও সেফটি গ্যাপ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ঝালোপাড় এলাকার মাত্র ৩ ফুট রাস্তার ওপর অবৈধ বহুতল ভবন নির্মাণ এবং মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অসংখ্য নকশাবহির্ভূত ভবন অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সিসিক থেকে অঢেল অর্থ আত্মসাৎ করে তিনি নগরীর গোয়াবাড়িতে আনুমানিক এক কোটি টাকা মূল্যের নামফলকহীন বিলাসবহুল বাংলো, ৪৫ লাখ টাকার ব্যক্তিগত গাড়ি এবং একাধিক জমি কিনেছেন। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী কায়সার রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অনিয়মের নথিপত্র প্রকাশ করেন।

এ ছাড়া, সিসিকের উপসহকারী প্রকৌশলী এটিএম সাইদুর রহমান টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ১৫ লাখ টাকার বিলে ১.৫০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ এবং খাদিম এলাকায় সুবিশাল গরুর খামার ও রাজপ্রাসাদোপম বাড়ি গড়ে তুলেছেন। ২১ নম্বর ওয়ার্ডের অতিরিক্ত সহকারী প্রকৌশলী বেলাল আহমেদও আলী আকবরের ডান হাত হিসেবে কাজ করে বেআইনি ভবন অনুমোদনের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন সম্পদের বিশাল পাহাড়।

সিসিকের প্রশাসনিক ও সেবামূলক প্রায় প্রতিটি শাখাই দুর্নীতির করাল গ্রাসে বন্দি। সিসিকের প্রধান অ্যাসেসর মো. আব্দুল বাতিত মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে নগরীর বাণিজ্যিক ভবন, বহুতল আবাসিক ভবন ও অভিজাত মার্কেটগুলোর গৃহকর প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে অস্বাভাবিক কম নির্ধারণ করে সিসিকের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করছেন। প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন বর্জ্য শাখা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রতি মাসে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। লাইসেন্স প্রধান রুবেল আহমেদ তাঁর নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স ও নতুন লাইসেন্সের অজুহাতে প্রতিদিন প্রায় লক্ষাধিক টাকা অবৈধ ঘুষ আদায় করছেন।

সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রেজাই রাফিন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হলেও প্রতিটি বিভাগের প্রশাসনিক তদারকিতে চরম অবহেলা প্রদর্শন করেছেন এবং জালিয়াতির সিন্ডিকেটের পেছনে তাঁর পরোক্ষ মদদ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সবচেয়ে অভিনব দুর্নীতি দেখা যাচ্ছে সিসিকের প্রকল্প ও জ্বালানি খাতে। বিভিন্ন প্রকল্পের নাম দিয়ে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে পরবর্তীতে কোনো কারণ দেখিয়ে বা কাজ না করেই প্রকল্প বাতিল করে অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। অথচ বাতিল বা ভুয়া প্রকল্পের নামে এখনো সিসিকের সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে ভাউচার বানিয়ে বিভিন্ন পাম্প থেকে তেল কম তুলে বাইরে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা পকেটে ভরছেন কতিপয় কর্মকর্তা। অনুসন্ধান চালাতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর নেমে আসে নানা হুমকি-ধমকি।

সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সার্বিক উন্নয়ন তৎপরতাকে সচল রাখতে এবং নগরবাসীর নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটকে সিসিক থেকে চিরতরে অপসারণ, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ এবং দুদকের নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নেতানিয়াহুর বদলে ‘কম ক্ষতিকর’ প্রধানমন্ত্রী চান গাজাবাসী

সিসিকে দুর্নীতির মহোৎসব, শত কোটি টাকার লুটপাটে জড়িত ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী!

আপডেট সময় ০৭:১৫:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী, সুসংগঠিত ও অসাধু সিন্ডিকেটের নজিরবিহীন জালিয়াতি, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ এবং শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। নগরবাসীর নাগরিক সেবা, স্বস্তি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত কোটি কোটি টাকা এখন গুটিকয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত পকেটে চলে যাচ্ছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বিরামহীনভাবে দিনরাত মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে ঘুরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি যেখানেই কোনো অনিয়ম ও ঘাপলা দেখতে পাচ্ছেন, নিজেই ছুটে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে তা সমাধানের চেষ্টা করছেন। কিন্তু নগর ভবনের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর লুণ্ঠন ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে তাঁর সার্বিক উন্নয়ন প্রয়াসের ষোলো আনার মধ্যে দশ আনাই ব্যর্থ হতে বসেছে। একদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করছেন প্রশাসক, অপরদিকে নিজের ঘরে বসেই পুকুরচুরি করছে কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী।

সম্প্রতি সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৪ জন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর এবার নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সম্প্রতি এই চক্রের বিরুদ্ধে দুদকের ঢাকা অফিসে লিখিত অভিযোগ করেছেন এক ভুক্তভোগী। তিনি তাঁর অভিযোগে সিটি করপোরেশনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের নানা অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছেন। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যমতে, খুব শিগগিরই এসব কর্মকর্তার দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধানে নামছে দুদকের একটি শক্তিশালী টিম। সাধারণ নগরবাসী মনে করেন, সঠিকভাবে তদন্ত হলে সিটি করপোরেশনে যুগের পর যুগ ক্ষমতার অপব্যবহার করে আসা এসব কর্মকর্তার অনেকেই ফেঁসে যেতে পারেন। এমন আতঙ্ক এখন ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজদের মধ্যে বিরাজ করছে।

এর আগে ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদিকুর রহমানসহ একাধিক ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে সিসিকের সুনির্দিষ্ট ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম ও দাপ্তরিক নথিপত্রসহ নিরপেক্ষ তদন্তের আবেদন দাখিল করেছেন। তবে সিসিক কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করায় এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সিসিককে নিজেদের পারিবারিক সম্পত্তি মনে করে যারা দীর্ঘদিন ধরে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের অনৈতিক নেটওয়ার্ক এতটাই গভীরে বিস্তার করেছে যে—বদলি, অবসর কিংবা আত্মগোপনে থেকেও তাঁরা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকায় বসে রিমোট কন্ট্রোলে সিসিকের ব্যাকডেটেড ফাইল কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য ও জালিয়াতির পুরো সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন সিসিক থেকে ঢাকায় বদলিকৃত সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমান এবং বগুড়ায় বদলি হওয়া সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবর। বদলি হয়েও তাঁরা বিপুল অঙ্কের তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে পুনরায় সিসিকে ফিরে আসার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন। এতে স্পষ্ট ফুটে ওঠে যে, সিসিক এই দুর্নীতিবাজদের কাছে যেন এক কালোটাকার খনি।

সিসিকের প্রশাসনিক ও প্রকৌশলসংক্রান্ত ফাইল অনুমোদন, নকশা যাচাইকরণ ও সরকারি পে-অর্ডার জমা দেওয়ার নির্ধারিত দপ্তর থাকলেও, সিলেট নগরীর ঐতিহ্যবাহী সুরমা মার্কেট থেকে সিসিকের সাবেক মেয়র, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সচিব, প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীসহ শীর্ষ পর্যায়ের সব কর্মকর্তার হুবহু নকল সিল তৈরি করানো হয়। সরকারি নথি অনুমোদনে জালিয়াতির প্রতিটি ধাপে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক স্বাক্ষর নিখুঁতভাবে নকল করার কাজ চালানো হতো সুকৌশলে। বিশেষ একটি শোবার ঘরে বসেই রাতারাতি অবৈধ ইমারত নকশা ও ব্যাকডেটেড ফাইলের অনুমোদন তৈরি করা হতো।

এ ছাড়া, সিসিকে কর্মরত প্রায় ২৫৮ জন অস্থায়ী ও দিনমজুর কর্মচারীকে চাকরি স্থায়ী করার ভুয়া আশ্বাস দিয়ে হাইকোর্টের প্রসেসিং ফি বাবদ জনপ্রতি ১০,০০০ টাকা করে মোট ২৫,৫০,০০০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। টাকা ফেরত চাইলে কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হতো।

সিসিকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমান (বর্তমানে ডেপুটেশনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কর্মরত) বিগত দুই দশক ধরে সিসিকের ড্রেনেজ, ছড়া ও নগর উন্নয়ন প্রকল্পের শত শত কোটি টাকার বরাদ্দে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করে রেখেছিলেন। নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ভঙ্গ করে অবৈধ নকশা অনুমোদন দিয়েছেন তিনি। ২০০৭ সালের ১/১১-এর জরুরি অবস্থার সময় যৌথ বাহিনী ঘুষ গ্রহণ ও টেন্ডার জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। শুধু দুর্নীতিই নয়, মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গেও জড়িয়েছে তাঁর নাম। ২০২৩ সালের ২৩ মে সিসিকের নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ওপর থেকে ভারী স্টিলের পাইপ পড়ে ল্যান্স করপোরাল মো. দেলোয়ার হোসেন নামের এক সেনাসদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় (মামলা নং-২৪/১৫০) ১ নম্বর অভিযুক্ত আসামি এই নূর আজিজ। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকালীন ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলা (মামলা নং-০১) এবং সিআর মামলায় (নং-৩৫২) এজাহারভুক্ত আসামি তিনি। বর্তমানে ঢাকায় কর্মরত থাকলেও সিসিকের ব্যাকডেটেড ফাইল প্রস্তুত ও জালিয়াতির পুরো সিন্ডিকেটটি তিনি ঢাকা থেকেই নিয়ন্ত্রণ করছেন।

সদ্য বগুড়া পৌরসভায় বদলিকৃত সিসিকের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবর ২০০৭ সালে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমানের মাধ্যমে নাটোর পৌরসভা থেকে সিসিকে যোগ দেন। দীর্ঘ দুই দশকের কর্মজীবনে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক লুটপাট ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। কদমতলীর নতুন সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পর গঠিত তদন্ত কমিটিতে তাঁর নিজের আপন ভাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প প্রকৌশলী হওয়া সত্ত্বেও আলী আকবরকে সমন্বয়ক করা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার জোরে তিনি এত দিন পদে আসীন ছিলেন।

অন্যদিকে, নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত) মো. রাজিউদ্দিন খানের বিরুদ্ধে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও সেফটি গ্যাপ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ঝালোপাড় এলাকার মাত্র ৩ ফুট রাস্তার ওপর অবৈধ বহুতল ভবন নির্মাণ এবং মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অসংখ্য নকশাবহির্ভূত ভবন অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সিসিক থেকে অঢেল অর্থ আত্মসাৎ করে তিনি নগরীর গোয়াবাড়িতে আনুমানিক এক কোটি টাকা মূল্যের নামফলকহীন বিলাসবহুল বাংলো, ৪৫ লাখ টাকার ব্যক্তিগত গাড়ি এবং একাধিক জমি কিনেছেন। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী কায়সার রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অনিয়মের নথিপত্র প্রকাশ করেন।

এ ছাড়া, সিসিকের উপসহকারী প্রকৌশলী এটিএম সাইদুর রহমান টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ১৫ লাখ টাকার বিলে ১.৫০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ এবং খাদিম এলাকায় সুবিশাল গরুর খামার ও রাজপ্রাসাদোপম বাড়ি গড়ে তুলেছেন। ২১ নম্বর ওয়ার্ডের অতিরিক্ত সহকারী প্রকৌশলী বেলাল আহমেদও আলী আকবরের ডান হাত হিসেবে কাজ করে বেআইনি ভবন অনুমোদনের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন সম্পদের বিশাল পাহাড়।

সিসিকের প্রশাসনিক ও সেবামূলক প্রায় প্রতিটি শাখাই দুর্নীতির করাল গ্রাসে বন্দি। সিসিকের প্রধান অ্যাসেসর মো. আব্দুল বাতিত মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে নগরীর বাণিজ্যিক ভবন, বহুতল আবাসিক ভবন ও অভিজাত মার্কেটগুলোর গৃহকর প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে অস্বাভাবিক কম নির্ধারণ করে সিসিকের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করছেন। প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন বর্জ্য শাখা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রতি মাসে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। লাইসেন্স প্রধান রুবেল আহমেদ তাঁর নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স ও নতুন লাইসেন্সের অজুহাতে প্রতিদিন প্রায় লক্ষাধিক টাকা অবৈধ ঘুষ আদায় করছেন।

সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রেজাই রাফিন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হলেও প্রতিটি বিভাগের প্রশাসনিক তদারকিতে চরম অবহেলা প্রদর্শন করেছেন এবং জালিয়াতির সিন্ডিকেটের পেছনে তাঁর পরোক্ষ মদদ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সবচেয়ে অভিনব দুর্নীতি দেখা যাচ্ছে সিসিকের প্রকল্প ও জ্বালানি খাতে। বিভিন্ন প্রকল্পের নাম দিয়ে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে পরবর্তীতে কোনো কারণ দেখিয়ে বা কাজ না করেই প্রকল্প বাতিল করে অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। অথচ বাতিল বা ভুয়া প্রকল্পের নামে এখনো সিসিকের সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে ভাউচার বানিয়ে বিভিন্ন পাম্প থেকে তেল কম তুলে বাইরে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা পকেটে ভরছেন কতিপয় কর্মকর্তা। অনুসন্ধান চালাতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর নেমে আসে নানা হুমকি-ধমকি।

সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সার্বিক উন্নয়ন তৎপরতাকে সচল রাখতে এবং নগরবাসীর নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটকে সিসিক থেকে চিরতরে অপসারণ, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ এবং দুদকের নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।