ঢাকা ০৫:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পে-ফিক্সেশনের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু সিন্ডিকেট: জিম্মি সাধারণ কর্মচারীরা শিবগঞ্জে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত কোটালীপাড়ায় যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বর্ণাঢ্য র‌্যালি কোটালীপাড়ায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালিত বিএডিসিতে এখনো শক্তিশালী আওয়ামী প্রভাব খাটানো বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক, নেপথ্যে দুই কর্মকর্তা সোনারগাঁয়ে দোকান দখল ও ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ সেলিম সরকারের বিরুদ্ধে পাঁচ সাংবাদিক হত্যার বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন ময়মনসিংহের সাংবাদিকেরা আশুলিয়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের নাচের ভিডিও ভাইরাল দাউদকান্দিতে বন্দুক-কার্তুজ ও গ্রিল কাটারসহ ডাকাতি মামলার আসামি গ্রেপ্তার গুলিস্তান-সদরঘাট সড়কে হকার বসতে দেওয়া হবে না: ডিএসসিসি প্রশাসক
কৃষি প্রণোদনায় বীজ সিন্ডিকেট

বিএডিসিতে এখনো শক্তিশালী আওয়ামী প্রভাব খাটানো বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক, নেপথ্যে দুই কর্মকর্তা

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও থামেনি কৃষি খাতের লুটপাট ও সিন্ডিকেটের রাজত্ব। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে মন্ত্রী, এমপি ও সচিবের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রভাব খাটানো বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক নামের একটি প্রতিষ্ঠান এখনো বহাল তবিয়তে বিএডিসির কোটি কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নিচ্ছে। আর সব অভিযোগ ও কেলেঙ্কারী সত্ত্বে এ প্রতিষ্ঠানটিকে বারবার কাজ পাইয়ে দেওয়ার নেপথ্যে কাজ করছেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) দুই কর্মকর্তা— ধান, গম ও ভুট্টার উন্নততর বীজ উৎপাদন ও উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির এবং যুগ্ম পরিচালক মো. জুলফিকার।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও সাবেক সচিব ওয়াহিদা আক্তারের ঘনিষ্ঠদের সমন্বয়ে তৈরি এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বীজ আমদানির নামে অনিয়ম করে আসছে। সে সময় নড়াইল-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজার আত্মীয় পরিচয়দানকারী কৃষিবিদ জিল্লুর রহমান মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে খামারবাড়ি ও বিএডিসির কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠান ‘বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক’-এর মাধ্যমে ভারত থেকে নিম্নমানের ও ভেজাল ভুট্টা, সূর্যমুখী এবং পেঁয়াজ বীজ (এন-৫০) আমদানি করা হয়। এই নিম্নমানের বীজ বপন করে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হন দেশের সাধারণ কৃষকরা।

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই সিন্ডিকেটটি নিজেদের খোলস পাল্টে রাতারাতি নতুন পরিচয় ধারণ করেছে। ভারতীয় কাবেরী সিড কোম্পানির প্রতিনিধি অমিত দাস এবং বঙ্গ অ্যাগ্রিটেকের ব্যবসায়িক পার্টনারের নেতৃত্বে গঠিত এই চক্রটি বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াতের নাম ভাঙিয়ে কাজ ভাগিয়ে নিচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী শাসনামলে শত শত কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেওয়া বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক গত দুই মাসেও বিএডিসি থেকে প্রায় ৯ থেকে ১০ কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নিয়েছে।

কোম্পানিটির পরিচালক নাজমুল কবির রাসেল নিজেদের বিএনপি সমর্থক বলে দাবি করলেও নথিপত্রে ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল স্মারকলিপিতে (মেমোরেন্ডাম) নাজমুল কবিরের নামের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, বিগত সরকারের আমলে তিনি অন্য একজনের কোম্পানির মালিক সেজে মিথ্যাচারের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বর্তমানেও রাজনৈতিক পরিচয় বদলে তিনি বিএডিসি ও ডিএই-এর বীজ সরবরাহসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের আমদানিকৃত কীটনাশকের গুণগত মান নিয়েও মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পরও বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক সময়মতো কৃষকদের হাতে বীজ পৌঁছে দিতে পারছে না। চলতি মৌসুমে মেহেরপুর ও মুজিবনগর অঞ্চলের চাষীদের জন্য বরাদ্দ করা সাত টন বীজ এখনো কৃষকদের হাতে পৌঁছায়নি। এতে মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। মেহেরপুরের মোনাখালী গ্রামের কৃষক জাকির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সময় পার হয়ে যাওয়ার পর সরকারি বীজ পেয়ে কৃষকদের আর কোনো উপকারে আসছে না। মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সামসুল আলমও মানহীনতার কারণে বীজ ফেরত পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে ক্ষুদ্র পরিসরে বীজ সরাসরি সংগ্রহের সুযোগ নিয়ে এই সিন্ডিকেট স্থানীয় বাজার থেকে নিম্নমানের বীজ কিনে সরবরাহ করছে। এতে ঠিকাদাররা লাভবান হলেও প্রতারিত হচ্ছেন কৃষকরা। জাতীয় দৈনিকে পেঁয়াজ বীজ ক্রয়ে অনিয়মের খবর প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও বিএডিসির প্রকল্প পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির এবং যুগ্ম পরিচালক মো. জুলফিকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক একের পর এক কাজ পাচ্ছে।

কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান জানান, বীজ নিয়ে যেকোনো অনিয়ম রুখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে কৃষিবিদদের মতে, বিএডিসির ভেতরের এই অসাধু কর্মকর্তা ও বঙ্গ অ্যাগ্রিটেকের পরিচালক নাজমুল কবির রাসেলের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা না নিলে প্রণোদনার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে এবং লক্ষ্যমাত্রানুযায়ী ফসল উৎপাদন না হওয়ায় চরম ক্ষতির মুখে পড়বেন দেশের কৃষকরা।

এ বিষয়ে জানতে, কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি)-এর ওই দুই কর্মকর্তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে দুজনই কল রিসিভ করেন নি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পে-ফিক্সেশনের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু সিন্ডিকেট: জিম্মি সাধারণ কর্মচারীরা

কৃষি প্রণোদনায় বীজ সিন্ডিকেট

বিএডিসিতে এখনো শক্তিশালী আওয়ামী প্রভাব খাটানো বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক, নেপথ্যে দুই কর্মকর্তা

আপডেট সময় ০৫:১৩:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও থামেনি কৃষি খাতের লুটপাট ও সিন্ডিকেটের রাজত্ব। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে মন্ত্রী, এমপি ও সচিবের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রভাব খাটানো বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক নামের একটি প্রতিষ্ঠান এখনো বহাল তবিয়তে বিএডিসির কোটি কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নিচ্ছে। আর সব অভিযোগ ও কেলেঙ্কারী সত্ত্বে এ প্রতিষ্ঠানটিকে বারবার কাজ পাইয়ে দেওয়ার নেপথ্যে কাজ করছেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) দুই কর্মকর্তা— ধান, গম ও ভুট্টার উন্নততর বীজ উৎপাদন ও উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির এবং যুগ্ম পরিচালক মো. জুলফিকার।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও সাবেক সচিব ওয়াহিদা আক্তারের ঘনিষ্ঠদের সমন্বয়ে তৈরি এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বীজ আমদানির নামে অনিয়ম করে আসছে। সে সময় নড়াইল-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজার আত্মীয় পরিচয়দানকারী কৃষিবিদ জিল্লুর রহমান মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে খামারবাড়ি ও বিএডিসির কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠান ‘বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক’-এর মাধ্যমে ভারত থেকে নিম্নমানের ও ভেজাল ভুট্টা, সূর্যমুখী এবং পেঁয়াজ বীজ (এন-৫০) আমদানি করা হয়। এই নিম্নমানের বীজ বপন করে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হন দেশের সাধারণ কৃষকরা।

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই সিন্ডিকেটটি নিজেদের খোলস পাল্টে রাতারাতি নতুন পরিচয় ধারণ করেছে। ভারতীয় কাবেরী সিড কোম্পানির প্রতিনিধি অমিত দাস এবং বঙ্গ অ্যাগ্রিটেকের ব্যবসায়িক পার্টনারের নেতৃত্বে গঠিত এই চক্রটি বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াতের নাম ভাঙিয়ে কাজ ভাগিয়ে নিচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী শাসনামলে শত শত কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেওয়া বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক গত দুই মাসেও বিএডিসি থেকে প্রায় ৯ থেকে ১০ কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নিয়েছে।

কোম্পানিটির পরিচালক নাজমুল কবির রাসেল নিজেদের বিএনপি সমর্থক বলে দাবি করলেও নথিপত্রে ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল স্মারকলিপিতে (মেমোরেন্ডাম) নাজমুল কবিরের নামের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, বিগত সরকারের আমলে তিনি অন্য একজনের কোম্পানির মালিক সেজে মিথ্যাচারের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বর্তমানেও রাজনৈতিক পরিচয় বদলে তিনি বিএডিসি ও ডিএই-এর বীজ সরবরাহসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের আমদানিকৃত কীটনাশকের গুণগত মান নিয়েও মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পরও বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক সময়মতো কৃষকদের হাতে বীজ পৌঁছে দিতে পারছে না। চলতি মৌসুমে মেহেরপুর ও মুজিবনগর অঞ্চলের চাষীদের জন্য বরাদ্দ করা সাত টন বীজ এখনো কৃষকদের হাতে পৌঁছায়নি। এতে মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। মেহেরপুরের মোনাখালী গ্রামের কৃষক জাকির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সময় পার হয়ে যাওয়ার পর সরকারি বীজ পেয়ে কৃষকদের আর কোনো উপকারে আসছে না। মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সামসুল আলমও মানহীনতার কারণে বীজ ফেরত পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে ক্ষুদ্র পরিসরে বীজ সরাসরি সংগ্রহের সুযোগ নিয়ে এই সিন্ডিকেট স্থানীয় বাজার থেকে নিম্নমানের বীজ কিনে সরবরাহ করছে। এতে ঠিকাদাররা লাভবান হলেও প্রতারিত হচ্ছেন কৃষকরা। জাতীয় দৈনিকে পেঁয়াজ বীজ ক্রয়ে অনিয়মের খবর প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও বিএডিসির প্রকল্প পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির এবং যুগ্ম পরিচালক মো. জুলফিকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক একের পর এক কাজ পাচ্ছে।

কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান জানান, বীজ নিয়ে যেকোনো অনিয়ম রুখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে কৃষিবিদদের মতে, বিএডিসির ভেতরের এই অসাধু কর্মকর্তা ও বঙ্গ অ্যাগ্রিটেকের পরিচালক নাজমুল কবির রাসেলের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা না নিলে প্রণোদনার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে এবং লক্ষ্যমাত্রানুযায়ী ফসল উৎপাদন না হওয়ায় চরম ক্ষতির মুখে পড়বেন দেশের কৃষকরা।

এ বিষয়ে জানতে, কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি)-এর ওই দুই কর্মকর্তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে দুজনই কল রিসিভ করেন নি।