ময়মনসিংহ অঞ্চলে গত তিন বছরে পাঁচ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে নতুন করে সংগঠিত হচ্ছেন সাংবাদিকেরা। একের পর এক হত্যাকাণ্ড, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে সাত দফা প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ।
আগামী ২ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এ আন্দোলন শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে জামালপুর জেলা ও ময়মনসিংহ নগরীতেও কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছেন পাঁচ নিহত সাংবাদিক—নেত্রকোনার দুর্গাপুরের লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির, জামালপুরের বকশীগঞ্জের গোলাম রব্বানী নাদিম, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শেলু আকন্দ, গাজীপুরে নিহত দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার আসাদুজ্জামান তুহিন এবং ময়মনসিংহ নগরীতে নিহত সাংবাদিক স্বপন ভট্টাচার্য।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কী, বিচার কত দূর?
সাংবাদিক হত্যার প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ, হামলাকারীদের পরিচয়, সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারীদের ভূমিকা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
বিশেষ করে অপরাধ ও অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিক হুমকির মুখে পড়েছিলেন কি না, আগে নিরাপত্তা চেয়েছিলেন কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
এ ছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় সাংবাদিকদের করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং হুমকির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে তিনজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৫ দিনের মধ্যে কমিটিকে চার জেলার পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা, দায়ের করা জিডির সংখ্যা এবং হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে থানা-পুলিশের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
নেত্রকোনার সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এসব প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, হত্যার আগে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এবং এর আগে হামলার শিকারও হয়েছিলেন। তাঁর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পূর্ববর্তী হামলা কিংবা সাংবাদিকতার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিচারহীনতার আশঙ্কা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচার বিলম্বিত হলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির মনোভাব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, দুর্নীতি ও অপরাধের সংবাদ প্রকাশ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য উদ্ঘাটনের কাজও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তবে পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের সব কটি মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা, আসামিদের গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র দাখিল কিংবা বিচার শুরুর তথ্য এক নয়। তাই প্রতিটি মামলার সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
তিন জেলায় কর্মসূচি, সাত দফা প্রতিবাদ
সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের ঘোষিত কর্মসূচির প্রথম ধাপ অনুষ্ঠিত হবে ২ নভেম্বর সকাল ১১টায় নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সামনে। অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের সুবিধার্থে সকাল ১০টায় ময়মনসিংহ নগরীর পাটগুদাম ব্রিজ মোড় থেকে দুটি বাস ছাড়ার কথা জানিয়েছে আয়োজকেরা। বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকেও সাংবাদিকেরা নিজস্ব পরিবহনে কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
সংগঠনটির চেয়ারম্যান মো. খায়রুল আলম রফিক বলেন, সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়বে। তাঁদের দাবি, প্রতিহিংসা নয়, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
যে দাবিগুলো সামনে আসছে
আন্দোলন থেকে হত্যাকাণ্ডগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িত ও পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হুমকির অভিযোগ দ্রুত তদন্ত এবং ঝুঁকিতে থাকা গণমাধ্যমকর্মীদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ দল-মত ও সাংগঠনিক বিভেদ ভুলে সব সাংবাদিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকর্মীকে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
পাঁচ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে ঘোষিত এ কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর চাপ তৈরি করতে পারে, তা নির্ভর করবে সাংবাদিক সমাজের ঐক্য, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর প্রকৃত অগ্রগতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।
মো. রাসেল ফকির-ময়মনসিংহ ব্যুরো প্রধান 


















