পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না থাকা এবং মাস্টারপ্ল্যানের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মঙ্গলবার দুপুরে কুয়াকাটা পৌরসভা ও কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং নির্মাণস্থলে নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত একটি ব্যানার টাঙিয়ে দেয়। তবে নির্মাণকাজ বন্ধের এই ঘটনা কেবল অনুমোদনের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রকল্পের জমির পরিমাণ, মালিকানা, বায়না দলিল, বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে আগে থেকেই নানা প্রশ্ন ও অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে।

মঙ্গলবার দুপুরে কুয়াকাটা সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান এবং কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার ভূমি মো. ইয়াসীন সাদেকের উপস্থিতিতে এই অভিযান পরিচালিত হয়। পৌরসভার প্রশাসক ইয়াসীন সাদেক জানান, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। তাছাড়া কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যানে ওই জমি রেলওয়ের স্থাপনার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। এসব কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়েছে এবং বর্তমান বিএস জরিপ অনুযায়ী জায়গাটি কুয়াকাটা পৌরসভার আওতাধীন বলে উল্লেখ করা হয়। টাঙিয়ে দেওয়া ব্যানারেও অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির প্রচারণায় ৩০ বিঘা জমির ওপর হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে তোলার কথা বলা হলেও অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথিপত্রে এর সত্যতা নিয়ে ব্যাপক অসংগতি পাওয়া গেছে। হোটেল নির্মাণের জন্য কুয়াকাটা পৌরসভায় জমা দেওয়া তফসিলে জমির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছিল ১ দশমিক ৯২ একর, যা প্রায় ৫ দশমিক ৭৪ বিঘার সমান। গত ৭ জানুয়ারি পৌরসভা থেকে এই সামান্য জমির বিপরীতে প্রাথমিক অনুমোদন নেওয়া হলেও, এর প্রায় ছয় মাস আগেই ৩০ বিঘার বিশাল প্রকল্পের কথা বলে শেয়ার বিক্রি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি তারা ২১ বিঘা জমি কিনেছে এবং বাকি নয় বিঘার বায়না করেছে, তবে এ দাবির সপক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো দলিল বা কাগজপত্র তারা দেখাতে পারেনি।
জমির মালিকানা এবং বায়না সংক্রান্ত প্রক্রিয়াতেও রয়েছে আইনি জটিলতা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডি এম এমদাদুল হক কুয়াকাটায় ১৬ জনের কাছ থেকে ১৭ দশমিক ৫৫৯ বিঘা জমির বায়না দলিল করলেও এসব জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। পটুয়াখালীর খেপুপাড়া সাবরেজিস্ট্রি অফিস বায়না দলিলের ক্ষেত্রে শর্ত দিয়েছে যে, বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে অনুমতি পাওয়ার পরই কেবল জমি হস্তান্তর করা যাবে। ফলে বায়না করা জমিকে নিশ্চিত মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে উপস্থাপন করে শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, জমির প্রকৃত মালিকানা দাবি করে একাধিক পক্ষ সোচ্চার হয়েছে। স্থানীয় চার বাসিন্দা উত্তরাধিকারসূত্রে জমির অধিকার দাবি করে পটুয়াখালীর যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা করেছেন। এছাড়া কুয়াকাটার বালিয়াতলীর হাড়িপাড়া রাখাইন পল্লির বাসিন্দারাও সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছেন যে, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সিএস, আরএস ও এসএ খতিয়ানের জমির ওপর প্রভাবশালীরা সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করছেন। রাখাইন সম্প্রদায়ের পক্ষে বোচান ২০২৪ সালের নভেম্বরে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন, যেখানে আব্দুল জব্বার হাওলাদারসহ ৮৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে হোটেল কর্তৃপক্ষ রাখাইন সম্প্রদায়ের এই দাবি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে।
এই আইনি বিরোধ ও অনুমোদনের বিষয়টি সুরাহা হওয়ার আগেই আগ্রাসীভাবে শেয়ার ও প্যাকেজ বিক্রির বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো হয়েছে। প্রকল্পটিকে ৪৩ হাজার শেয়ারে ভাগ করে ২৬ হাজার প্যাকেজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, প্রায় ১০ হাজার প্যাকেজে অন্তত ২২ হাজার শেয়ার ইতিমধ্যে বিক্রি হয়েছে। ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হলে সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজার মো. রাকিবুল ইসলাম এবং সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান তুহিন জানান যে, বিনিয়োগকারীরা পূর্ণাঙ্গ দলিলপত্র বা অনুমোদন দেখতে চান না, বরং প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে ও পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর নাম ও বক্তব্যে বিশ্বাস রেখেই মানুষ বিনিয়োগ করছেন। উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে মাসুদ সাঈদীকে চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং একে ‘হালাল ট্যুরিজম’ প্রকল্প হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুয়াকাটার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে বড় বিনিয়োগের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনগত অনুমোদন, জমির মালিকানা এবং বিনিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে প্রশাসনের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা মেনে যথাযথ অনুমোদন অর্জন, জমির বিরোধের আইনি নিষ্পত্তি এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার ওপর।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























