চট্টগ্রামে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমিতে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ শেষ করেছিলেন বিসিএস নন-ক্যাডার কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫)। সুসংবাদটি নিয়ে নগরের রাজগঞ্জের পানপট্টি এলাকায় অপেক্ষারত পরিবারটির কাছে ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু গত ২৪ এপ্রিলের সেই অন্ধকার রাতে মহাসড়ক থেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় এক উদীয়মান কর্মকর্তার জীবনপ্রদীপ। দীর্ঘ ও নিবিড় তদন্ত শেষে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ উন্মোচন করেছে কীভাবে চলন্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশায় টাকার লোভে এক কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় অভিযুক্ত পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে এবং আদালত তা গ্রহণ করে বিচারের জন্য জেলা ও দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সামসুল আলম শাহ জানান, গত ২৪ এপ্রিল গভীর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ঝাগুরজুলি এলাকায় বাস থেকে নামেন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। সেখান থেকে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য তিনি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। তবে অটোরিকশাটিতে আগে থেকেই ওত পেতে ছিল সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশে থাকা একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র। চলন্ত অটোরিকশায় তাঁরা বুলেট বৈরাগীর সাথে থাকা নগদ টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় কাস্টমস কর্মকর্তার সাথে ছিনতাইকারীদের প্রচণ্ড ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে ঘাতকরা তাঁকে চলন্ত অটোরিকশা থেকে মহাসড়কে ফেলে দেয়। এতে মাথায় তীব্র আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি।
ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ২৫ এপ্রিল সকালে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বাতাবাড়িয়া এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনের পাশ থেকে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানা-পুলিশ। পরবর্তীতে স্বজনরা থানায় গিয়ে লাশটি বিবির বাজার স্থলবন্দরে কর্মরত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় নিহতের মা লিলিমা বৈরাগী বাদী হয়ে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার পাওয়ার পর ছায়াতদন্তে নামে র্যাব ও ডিবি পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সুনির্দিষ্ট ব্যবহারের মাধ্যমে র্যাব একে একে হত্যাকাণ্ডে জড়িত চক্রের পাঁচ সদস্যকে চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা সবাই আদালতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জেলা গোয়েন্দা শাখা পুলিশ দীর্ঘ তদন্তের সচিত্র ও দাপ্তরিক বিবরণসহ চার্জশিটটি আদালতে পেশ করে। চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন চান্দিনা উপজেলার নাওতলা গ্রামের মো. সোহাগ (৩৪), আদর্শ সদর উপজেলার ধর্মপুর এলাকার ইসমাইল হোসেন জনি (২৮), একই উপজেলার আমড়াতলী গ্রামের এমরান হোসেন ওরফে হৃদয় (৩৪), আড়াইওরা গ্রামের রাহাত হোসেন জুয়েল (২৭) এবং ধর্মপুর এলাকার মো. সুজন (৩২)। তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে যে আসামিদের মধ্যে জনি, জুয়েল ও সুজনের কোনো নির্দিষ্ট স্থায়ী ঠিকানা নেই; ফলে অপরাধ জগতের এই সদস্যদের চার্জশিটে ‘ভাসমান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে অভিযুক্ত এই পাঁচজনই কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের সন্তান বুলেট বৈরাগী বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে মেধার স্বাক্ষর রেখে কাস্টমস বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন। কুমিল্লা নগরের পানপট্টি এলাকায় স্ত্রী, শিশুসন্তান এবং বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। পরিবারের এক মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন স্তব্ধ স্বজনরা। কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া সেল ও আদালত পুলিশ পরিদর্শক মো. সাদেকুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রটি আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছেন। আইনগত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিতের লক্ষ্যে মামলাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়েছে।
আপনার যদি প্রতিবেদনে আরও কোনো পরিবর্তন বা নির্দিষ্ট তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হয়, জানাবেন!
আমাদের মার্তৃভূমি ডেস্ক : 
























