বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুমোদিত নিজস্ব চাকরিবিধি ছাড়াই নিয়োগের ঘটনায় বিধির ব্যত্যয় তুলে ধরেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অডিট দল। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ক্যামেলিয়া এলিজা নীলা ও অফিস সহায়ক মো. শহিদুল ইসলামের বয়সসংক্রান্ত বিষয়েও আপত্তি তুলেছে অডিট দল। ২০২৬ সালের ১৫ জুনের অডিট-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ক্যামেলিয়া এলিজা নীলার জন্মতারিখ ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬। তিনি ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। সে হিসাবে যোগদানের সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৯ বছর ৭ মাস ২৬ দিন। নিয়োগের সময় এলিজা নীলার বয়স সম্পর্কে অবগত ছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, নিয়োগের সময় প্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত তাঁর কাছে ছিল এবং তিনি তাঁর বয়স সম্পর্কে জানতেন। আর্থিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম সচল রাখতে অভিজ্ঞ জনবলের প্রয়োজন বিবেচনায় ছয় মাসের চুক্তিতে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
জানা গেছে, ১৫ জুন ২০২৬ তারিখের অডিট-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব চাকরিবিধি না থাকায় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ক্যামেলিয়া এলিজা নীলা ও অফিস সহায়ক মো. শহিদুল ইসলামের বয়স ৩২ বছরের বেশি হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অডিটের পর্যবেক্ষণে এ নিয়োগকে সরকারি চাকরির বিধিবিধানের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও জানা গেছে, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব চাকরিবিধি প্রণয়ন অথবা সরকারি বিধি অনুসারে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য অডিট প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। এদিকে ইউজিসির আপত্তির পরেও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তরা বর্তমান কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানান, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার নিয়োগ পুনরায় নবায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বা স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণে ২০২৪ সালে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ-সংক্রান্ত আইনও প্রণীত হয়। আইনটিতে সাধারণভাবে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান ও ব্যতিক্রম রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. কুদরত-ই-জাহান জানান, নতুন আইন কার্যকর হওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার সময় নানা জটিলতা ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের মোট সদস্য ১৭ জন হলেও তখন পর্যন্ত ছয়জনের নাম পাওয়া গিয়েছিল। প্রয়োজনীয় সদস্যসংখ্যা না থাকায় সিন্ডিকেটের সভা করা সম্ভব হয়নি। ফলে নিয়মিত নিয়োগ বোর্ডও গঠন করা যায়নি।
উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুমোদিত পদ ছিল ১৮টি। ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার ও পরিচালক (অর্থ) পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা না থাকায় আর্থিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞ জনবলের প্রয়োজন ছিল। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শুভাকাঙ্ক্ষীর সুপারিশে ক্যামেলিয়া এলিজা নীলার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে ছয় মাসের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।
উপাচার্যের দাবি, নিয়মিত নিয়োগ বোর্ড গঠন করা সম্ভব না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
উপাচার্য আরও জানান, ইউজিসির অডিট দল বয়সসংক্রান্ত আপত্তি তুলেছে এবং এ বিষয়ে তিনি চিঠিও পেয়েছেন। প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান পর্যালোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
স্থায়ী নিয়োগের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে নিয়োগ বোর্ডের মুখোমুখি হতে হবে। এরপর নিয়োগ বোর্ডের সুপারিশ ও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্যামেলিয়া এলিজা নীলার কাছে নিয়োগের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার সঙ্গে কথা না বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দপ্তরে যোগাযোগ করেন।’
বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়েছে। নতুন আইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তৃপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই আইনে ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার ও পরিচালক (অর্থ ও হিসাব)-সহ বিভিন্ন কর্মকর্তার পদও নির্ধারণ করা হয়েছে।
বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে জনবলসংকট ও সিন্ডিকেট গঠনের জটিলতার কথা জানিয়েছেন উপাচার্য। তবে প্রশাসনিক প্রয়োজনের যুক্তিতে নেওয়া নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, বয়সসীমা, অনুমোদিত পদ এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই এবং ইউজিসির অডিট আপত্তির নিষ্পত্তি ও নিয়োগ-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে বিষয়টির আইনগত অবস্থান স্পষ্ট হওয়া দরকার বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























