আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের রাজনৈতিক দমনপীড়ন, বিরোধী মতের ওপর চড়াও হওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক গুরুতর অভিযোগ মাথায় নিয়েও পুলিশ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ একটি থানায় দিব্যি বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার পালাবদলের পরেও তার এমন প্রভাব বিস্তার এবং বহাল তবিয়তে টিকে থাকা নিয়ে ইতিমধ্যে স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ ও চরম নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন, গায়েবি মামলার বিস্তার ঘটানো, ঢালাও গ্রেফতার বাণিজ্য এবং চাঁদাবাজির মতো নানা অপকর্মে সহায়তার যে কালো ইতিহাস তার বিরুদ্ধে রয়েছে, তা বর্তমান প্রশাসনের সংস্কারমূলক কার্যক্রমের মুখে এক বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পৌরসভার সংরক্ষিত সরকারি নথিপত্রের গভীরে প্রবেশ করে এবং স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই করে এই পুলিশ কর্মকর্তার নামে গড়ে ওঠা বিপুল সম্পদের এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। সুনামগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাসননগর এলাকার শান্তিবাগ আবাসিক এলাকায় স্বচক্ষে নজর কাড়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে একটি চোখ ধাঁধানো পাঁচতলা বিলাসবহুল ভবন। পৌরসভার দাপ্তরিক নথিতে ষোলঘর মৌজার এই বিলাসবহুল বাড়িটির মালিক হিসেবে মোহাঙ্গ আমিনুল ইসলামের নাম স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে, যেখানে তার পিতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে সিদ্দিকুর রহমান হিসেবে। ‘এ.আর.এস. মহল’ নামে নামকরণ করা এই সুউচ্চ কাঠামোর হোল্ডিং নম্বরটি হলো ১৮১। শুধু নথিপত্রেই এর অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ নয়, বরং পৌরসভার কর পরিশোধের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে বর্তমান ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত টানা পাঁচ বছরের পৌরকরের পুরো অর্থ নিয়মিত পরিশোধ করা হয়েছে। সর্বশেষ চলতি অর্থবছরের পৌরকরবাবদ ৭ হাজার ৯১৪ টাকা পরিশোধের দাপ্তরিক রসিদে চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারির তারিখ এবং জে.বি-২৮/৯/২৬ নম্বরটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার প্রমাণ মিলেছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রায় আট শতক জমির ওপরে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এই সুবিশাল অবকাঠামোটির আনুমানিক বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় সাত কোটি টাকার কাছাকাছি। শান্তিবাগ এলাকার বর্তমান রিয়েল এস্টেট বাজারদর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রতি শতক জমির সর্বনিম্ন বাজারমূল্য ১৩ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করে। তবে মূল সড়কের অত্যন্ত কাছাকাছি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম সুবিধাজনক অবস্থানে এই জমিটি অবস্থিত হওয়ায় এর প্রকৃত বাণিজ্যিক মূল্য আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছেন রিয়েল এস্টেট বিশেষজ্ঞরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অত্যন্ত সংক্ষুব্ধ কণ্ঠে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও পুলিশি ক্ষমতার ভয়ে ক্যামেরার সামনে বা সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চরম অনীহা প্রকাশ করেছেন। অনুসন্ধানী তথ্যে আরও উঠে এসেছে যে, কেবল এই একটিমাত্র পাঁচতলা রাজকীয় ভবনই নয়, বরং এর বাইরেও সুনামগঞ্জ জেলা ও বিভাগীয় শহর সিলেটের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে এই পুলিশ কর্মকর্তার নামে এবং বেনামে আরও একাধিক স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, যা নিয়ে বর্তমানে খোদ পুলিশ বিভাগের ভেতরেও নানা গুঞ্জন ও সমালোচনার ঝড় বইছে।
জনগণের অধিকার সুরক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে নিয়োজিত একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা এমন পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সুনামগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক সাঈদ। তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মন্তব্য করেছেন যে, বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ভিন্নমতের মানুষের টুঁটি চেপে ধরতে যেসকল পুলিশ কর্মকর্তা অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করে নিজেদের আখের গুছিয়েছিলেন, তাদের তালিকার প্রথম সারিতেই অবস্থান করছেন এই আমিনুল ইসলাম। বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ধরনের বিতর্কিত ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের হাতে জনসেবা ও সুশাসন কতটুকু নিরাপদ থাকতে পারে, তা নিয়ে তিনি নিজের চরম সংশয় ও আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেন। সুযোগ পেলেই এই কর্মকর্তা পুনরায় স্বৈরাচারী শক্তির পক্ষ নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে গভীর ও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি অবিলম্বে সরকারের উচ্চ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মতো এমন স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ পদে তাকে কোনোভাবেই বহাল রাখা উচিত নয় মন্তব্য করে, তার বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ ও কঠোর বিচারিক তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন সুজন সম্পাদক।
অন্যদিকে, নিজের বিরুদ্ধে আনীত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন, বিরোধী মতপীড়ন ও দুর্নীতির সমস্ত অভিযোগ একবাক্যে নাকচ করে দিয়েছেন অভিযুক্ত দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম। সংবাদমাধ্যমের সাথে আলাপকালে তিনি দাবি করেছেন যে, মূলত তার পেশাগত দায়িত্ব কঠোরভাবে পালন করার কারণে যারা ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন, কেবল তারাই তার বিরুদ্ধে এমন ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছেন। শান্তিবাগের বহুতল পাঁচতলা বাড়িটির মালিকানার সত্যতা অস্বীকার না করে তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, এই ভবনটি তৈরির পেছনে কোনো অনিয়ম বা অবৈধ আয়ের সংযোগ নেই। বরং একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ বা লোন গ্রহণ করেই তিনি বাড়িটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেছেন এবং সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধের প্রক্রিয়াটি বর্তমানেও চলমান রয়েছে বলে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















