চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়িতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কুরিয়ার সার্ভিস থেকে তিনটি কার্টনভর্তি পার্সেল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন দুজন। এ সময় কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের হাতকড়া পরিয়ে থানায় নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। পরে তাঁদের একজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন কর্মীরা।
আটক ব্যক্তি কৃষাণ বড়ুয়া (২৭) কুমিল্লা জেলা পুলিশের একজন কনস্টেবল। তাঁর সঙ্গে থাকা নোটন বড়ুয়া নামের আরেক ব্যক্তি পালিয়ে গেছেন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে নগরের নূর আহমদ সড়কে এস এ পরিবহন কুরিয়ার সার্ভিসের কাজীর দেউড়ি শাখায় এ ঘটনা ঘটে। কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেল ব্যবস্থাপক আব্দুল করিম বাচ্চু বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেছেন। মঙ্গলবার দুপুরে কৃষাণ বড়ুয়াকে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মামলার এজাহার ও কুরিয়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রিয়াজউদ্দিন বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী পণ্যগুলো চট্টগ্রামের বাইরে পাঠাতে এস এ পরিবহনে বুকিং দিয়েছিলেন। সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে সেনাবাহিনীর লোগোযুক্ত একটি মোটরসাইকেলে করে দুজন ওই কুরিয়ার কার্যালয়ে যান। তাঁদের একজনের পরনে ছিল ইংরেজিতে ‘পুলিশ’ লেখা নেভি ব্লু রঙের কটি। অন্যজনের পরনে ছিল র্যাবের লোগোযুক্ত কালো পোলো শার্ট।
তাঁরা নিজেদের চান্দগাঁও থানা-পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্য পরিচয় দিয়ে কার্টনগুলোর ভেতরে অবৈধ মালামাল রয়েছে বলে দাবি করেন। সেগুলো জব্দ করে নিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তাঁরা। এ সময় কুরিয়ার কাউন্টারের ব্যবস্থাপকসহ কর্মীদের হাতকড়া পরিয়ে থানায় নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। তাঁদের কথাবার্তা ও আচরণে সন্দেহ হলে কর্মীরা বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চান। একপর্যায়ে দুজন সেখান থেকে চলে যান।
এস এ পরিবহনের কাজীর দেউড়ি শাখার ব্যবস্থাপক মোরশেদ আলম চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রথম দফায় কাউন্টার থেকে ফোন পেয়ে তিনি ভিডিও কলে ওই দুজনের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা নিজেদের চান্দগাঁও থানা-পুলিশের সদস্য বলে পরিচয় দেন। কোতোয়ালি থানার আওতাধীন এলাকায় অন্য থানার পুলিশ সদস্যদের আসার কারণ জানতে চাইলে তাঁরা চলে যান।
মোরশেদ আলম বলেন, রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ লেখা কটি পরা ব্যক্তি আবার কার্টনগুলো নিতে আসেন। তখন তিনি কার্যালয়ে ছিলেন। সন্দেহ হওয়ায় কৌশলে ওই ব্যক্তিকে নিজের কক্ষে নিয়ে দরজা আটকে দেন। পরে কোতোয়ালি থানা-পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ আসতে দেরি হওয়ায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। এরপর পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা এসে ওই ব্যক্তিকে আটক করেন। তাঁর সহযোগী পালিয়ে যান।
কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থাপক আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আটক ব্যক্তি নিজেকে কুমিল্লা জেলা পুলিশের সদস্য বলে পরিচয় দেন। তাঁর সঙ্গে আসা ব্যক্তির নাম নোটন বড়ুয়া বলে জানান এবং তাঁকে সেনাবাহিনীর সদস্য বলে দাবি করেন। তবে নোটন বড়ুয়ার পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কোতোয়ালি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কৃষাণ বড়ুয়াকে আটক করে। তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক ব্যক্তি পালিয়ে গেছেন। কুরিয়ার কর্তৃপক্ষের করা মামলায় কৃষাণ বড়ুয়াকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পলাতক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
পার্সেলগুলোর ভেতরে কী ধরনের পণ্য ছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। অভিযুক্ত ব্যক্তি কার্টনগুলোতে অবৈধ মালামাল রয়েছে বলে দাবি করেছিলেন।
একই শাখা থেকে আগেও পার্সেল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
এস এ পরিবহনের ব্যবস্থাপক মোরশেদ আলম চৌধুরী জানান, গত ২৭ সেপ্টেম্বর একই শাখা থেকে একই কায়দায় তিনটি কার্টন নিয়ে গিয়েছিল একটি প্রতারক চক্র। ওই সময় মোটরসাইকেলে করে আসা কয়েকজন নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে কার্টনগুলো নিয়ে যান। তাঁদের কাছে অস্ত্রও ছিল বলে দাবি করেন তিনি। পরে খোঁজ নিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, ওই ব্যক্তিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছিলেন না।
মোরশেদ আলম বলেন, আগের ঘটনার পর থেকে তাঁরা সতর্ক ছিলেন। এ কারণে সোমবার রাতে আসা দুজনের আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় একজনকে আটকে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। সম্প্রতি তাঁদের কয়েকজন গ্রাহকের কাছ থেকেও র্যাব-পুলিশ পরিচয়ে পণ্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং পথে বাধা দেওয়ার অভিযোগ শুনেছেন তাঁরা।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে রিয়াজউদ্দিন বাজারের শতাধিক ব্যবসায়ী কুরিয়ার কার্যালয়ে জড়ো হন বলে জানান মোরশেদ আলম। তাঁদের বুকিং দেওয়া পণ্য নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো এবং এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান ব্যবসায়ীরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























